ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির (ইবিএল) সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্য চট্টগ্রামের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরী ওরফে ডিসকো শওকত।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী একক ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও শওকত আলী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাংকটির ২০ দশমিক ৪৮ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণে আছেন—যা একপর্যায়ে ২১ দশমিক ১০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছিল।
এক্ষেত্রে প্রক্সি শেয়ার, বেনামি প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও কর্মচারীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ব্যাংকটির ওপর দীর্ঘদিনের একক কর্তৃত্ব বজায় রাখেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগের একটি বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি বছরের ১৩ এপৃল বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর-৩-এর অনুমোদনক্রমে পরিচালিত এই তদন্তে ব্যাংক সরবরাহকৃত নথি, শেয়ারহোল্ডিং রিপোর্ট, ব্যালেন্স শিট, আয়কর নথি এবং যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) নথি বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করা হয়।
তবে তদন্তে জালিয়াতির এমন প্রমাণ মিললেও অজ্ঞাত কারণে দৃশ্যমান আইনি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ইবিএল কর্তৃপক্ষ। আর এই সুযোগে তদন্ত চলাকালেই হাতবদল হয়ে গেছে বিপুল পরিমাণ প্রক্সি শেয়ার।
প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে ‘ডামি কোম্পানি’র চমকপ্রদ অর্থনীতি। যেখানে বলা হয়, ২০০১ সালে মাত্র ১ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনে নিবন্ধিত হয় মেসার্স আরুসা অ্যান্ড কোং। নিবন্ধনের এক বছরের মাথায়, ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠানটি ৭ কোটি ৯১ লাখ টাকায় ইবিএলের ৭ লাখ ১৮ হাজার ৮০টি শেয়ার কেনে।
এরপর দীর্ঘ ২৪ বছরে একটি শেয়ারও বিক্রি না করে কেবল বোনাস ও স্টক ডিভিডেন্ড তুলে নিয়ে শেয়ার সংখ্যা দাঁড় করায় ১৫ কোটি ৯১ লাখ ৫৩ হাজার ২৯২টিতে—যা প্রাথমিক সংখ্যার প্রায় ২২২ গুণ।
কেবল বোনাস শেয়ারের সৌজন্যেই যুক্ত হয়েছে ১৫ কোটি ৮৪ লাখের বেশি শেয়ার। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে এই শেয়ারের ফেসভ্যালুই দাঁড়ায় ১৫৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা, যার বাজারমূল্য ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ছিল প্রায় ৩০০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
অর্থাৎ প্রাথমিক বিনিয়োগের প্রায় ৩৮ গুণ এবং নিবন্ধিত মূলধনের প্রায় ৩০ হাজার গুণ মুনাফা এসেছে এই একটি মাধ্যম থেকে। বোনাস শেয়ারের কারণে প্রতিটি শেয়ারের প্রকৃত ক্রয়মূল্য যেখানে মাত্র ৫০ পয়সায় নেমে এসেছে, সেখানে বাজারদর ছিল ১৯ টাকা ৩৩ পয়সা।
নগদ লভ্যাংশের চিত্রটি আরও ভয়াবহ। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার বছরে আরুসা অ্যান্ড কোং ব্যাংকটি থেকে নগদ লভ্যাংশ হিসেবে তুলে নিয়েছে যথাক্রমে ১৫.৩৫ কোটি, ১৭.২৭ কোটি, ১৯.৪৩ কোটি এবং ২৭.৮৫ কোটি টাকা—সব মিলিয়ে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। এটি ২০০২ সালে তাদের মূল বিনিয়োগের ১০ গুণেরও বেশি। ২০২৫ সালের লভ্যাংশ যুক্ত হলে এক বছরেই তাদের পকেটে ঢুকবে আরও প্রায় ৩৯.৭৯ কোটি টাকা।
সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় ছিলেন স্বয়ং শওকত আলী চৌধুরী ওরফে ডিসকো শওকত। ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে লভ্যাংশের হার নির্ধারণের মূল টেবিলে বসেছেন তিনি। আবার পরোক্ষ সুবিধাভোগী (Ultimate Beneficial Owner) হিসেবে কোটি কোটি টাকার লভ্যাংশ জমা হয়েছে তাঁরই স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, আরুসা অ্যান্ড কোং প্রতিষ্ঠাকালে শওকত আলীর শ্যালিকা আনিকা তেহজীব ও নইমুল হক পরিচালনায় ছিলেন। পরবর্তীতে শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০১৪ সালে শওকত আলীর কন্যা জারা নামরীনের নামে ৫ হাজার শেয়ার দেওয়া হয়, যা ২০১৭ সালে পুনর্হস্তান্তর করা হয় নইমুল হকের নামে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দলের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ ২০১৭ সালের ২০ জুলাই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি শওকত আলী চৌধুরীর পরিবারের প্রত্যক্ষ মালিকানাধীন ছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আরুসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নইমুল হকের আয়কর বিবরণীতে মাত্র ৯৫০টি শেয়ারের তথ্য দেখানো হয়েছে, যেখানে তাঁর নামে ছিল ৫,৯৫০টি শেয়ার।
পরিদর্শন দল ব্যাংকে যোগাযোগ করলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, বিপুল শেয়ারের মালিক হওয়া সত্ত্বেও ইবিএলে আরুসার কোনো প্রতিনিধি নেই এবং নইমুল হক বা এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোনো তথ্য ব্যাংকে সংরক্ষিত নেই। এমনকি ইবিএলের শেয়ার ধারণ করা ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানির পোর্টফোলিও বা মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রমও নেই আরুসার।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, আরুসা থেকে শওকত আলী চৌধুরীকে জমির বায়না বাবদ ৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল, যা এক দশকেও জমি হিসেবে বা নগদ ফেরত হিসেবে সমন্বয় করা হয়নি। পাশাপাশি তাঁর মালিকানাধীন এস এন কর্পোরেশনকে ২৭ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ন্যাশনাল টি কোম্পানিতে (এনটিসি) ১০ কোটি ৭১ লাখ টাকা স্থানান্তরের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, আনিকা শেয়ার্সের ৯৮ শতাংশের মালিক মো. জসিম উদ্দিন হলেও বাকি ২ শতাংশের মালিক ডিসকো শওকতের শ্যালিকা আনিকা তাহজীব। আরজেএসসিতে দেওয়া নথিতে আনিকা তাহজীবের যে ঠিকানা (২৮, সুরসন রোড, চট্টগ্রাম) দেওয়া হয়েছে, তা ডিসকো শওকতের পারিবারিক ঠিকানার সঙ্গে হুবহু মিল রয়েছে।
প্রতিবেদন তৈরি ও জমা দেওয়ার মধ্যবর্তী সময়েই রহস্যজনকভাবে শেয়ার নগদায়ন শুরু করে এই ডামি প্রতিষ্ঠানগুলো। তথ্যানুসারে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে আনিকা শেয়ারসের হাতে ইবিএলের ১.১৪ শতাংশ শেয়ার থাকলেও মার্চ ২০২৬-এর রিপোর্টে তা নেমে এসেছে মাত্র ০.০৫ শতাংশে।
একইভাবে আরুসা অ্যান্ড কোংয়ের ৯.৯৮ শতাংশ হোল্ডিং কমে প্রায় ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ তদন্ত চলাকালেই অর্ধেকের বেশি বেনামি শেয়ার বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। গত ১৯ আগস্ট গভর্নর বরাবর দেওয়া এক আবেদনে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তদন্ত প্রতিবেদন ফাইলবন্দি থাকার সুবাদে মূল অবৈধ শেয়ার নগদায়ন করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
বিএফআইইউ অতীতে দুবার সংশ্লিষ্ট হিসাব অবরুদ্ধ করলেও কোনো চূড়ান্ত ব্যবস্থা না নিয়ে গোপনে তা মুক্ত করে দেয়, যার খেসারত রাষ্ট্রকে ২৫ মিলিয়ন ডলার দিয়ে মেটাতে হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত)-এর ধারা ১৪(ক) অনুযায়ী, ১০ শতাংশের অতিরিক্ত শেয়ার নির্ধারিত সময়ে বিক্রি না করলে তা সরকারের বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে ন্যস্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শওকত আলী ১৯৯২ সাল থেকেই এই বিধান লঙ্ঘন করে আসছেন।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, শওকত আলী চৌধুরী ওরফে ডিসকো শওকত, তাঁর স্ত্রী তাসমিয়া আম্বারিন, দুই কন্যা জারা নামরীন ও সাবাহ সামরিন, পুত্র জারান আলী চৌধুরী এবং তাঁদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান নামরীন এন্টারপ্রাইজ ও জেড এন এন্টারপ্রাইজের নামে ব্যাংকের ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ প্রত্যক্ষ শেয়ার রয়েছে।
বাকি ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ পরোক্ষ শেয়ারের মূল কেন্দ্রে রয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠান—মেসার্স আরুসা অ্যান্ড কোং (প্রাইভেট) লিমিটেড এবং আনিকা শেয়ারস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেড।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) শওকত আলী চৌধুরীর বিদেশে সম্পত্তি (সিঙ্গাপুরে ৩২ লাখ ডলারের সম্পদ), সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের দ্বৈত নাগরিকত্ব, পুত্র জারান আলী চৌধুরীর অফ ডক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা প্রদান এবং শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা মার্সিডিজ-বেঞ্জ গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহারের বিষয়টি অধিকতর অনুসন্ধানের পরামর্শ দিয়েছে।
আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করতে এবং আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখতে ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘনের এই অভূতপূর্ব ঘটনার পেছনে দায়ীদের দ্রুত চিহ্নিত করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় আনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা বা তদারকির অগ্রগতির বিষয়ে জানতে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. হাসানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। এ কারণে তার বক্তব্য উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।