বাংলাদেশের রাজনীতিতে চিরাচরিত নিয়ম ভেঙে বিস্ময়কর উদাহরণ সৃষ্টি করলেন সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি ২৯৯ আসনে দীপেন দেওয়ানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী পহেল চাকমা ও আবুল বাশার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রাজনীতি করা পহেল চাকমা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এবং গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী হিসেবে এম এ আবুল বাশার অংশ নেন। এদের মধ্যে পহেলা চাকমাই ছিলেন দীপেন দেওয়ানের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী।
আর এই দুই প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে পদত্যাগ করা দীপেন দেওয়ানকে স্বপদে পুনর্বহাল করে, তারই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালকে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন। তাও আবার গোপনে বা কোনো বিবৃতি দিয়ে নয়, প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করেই এই দাবি জানিয়েছেন তারা!
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকালে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি শহরের একটি রেস্টুরেন্টে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই ঘটনায় বিস্মিত হন শহরবাসী। আলোচনার জন্ম দিয়েছে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনেও। প্রশ্ন উঠেছে, দীপেন দেওয়ান কি মীর হেলালের অন্তঃকোন্দলের কারণেই পদত্যাগ করেছেন।
এই প্রশ্নের জবাবে এখনো মুখ খুলেননি দীপেন দেওয়ান। তবে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠে পহেল চাকমা বলেন, পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টি হয়। সেই মোতাবেক পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দীপেন দেওয়ানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পাহাড়ের মানুষ ছিল আনন্দিত। তবে একই সঙ্গে ছিল হতাশাও। কারণ পার্বত্য এলাকার বাইরে থেকে একজনকে প্রতিমন্ত্রী দেওয়ার কারণে। এটি ছিল পার্বত্য চুক্তি ও আইনের পরিপন্থি। এ নিয়ে অন্তঃকোন্দলের জেরে দীপেন দেওয়ানকে চাপ প্রয়োগ করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।
তাকে পুনরায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার জোর দাবি করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। একই সঙ্গে চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বিধি-বহির্ভূতভাবে নিযুক্ত প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে অবিলম্বে প্রত্যাহারের জোর দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি কামনা করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন, পার্বত্য অঞ্চলের স্থায়ী শাসনব্যবস্থা কার্যকরকরণ এবং অঞ্চলের সামগ্রিক শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বৃহস্পতিবার এই সংবাদ সম্মেলন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পক্ষে আহ্বান করার কথা জানানো হলেও বাস্তবিক অর্থে বাকি চার প্রার্থী উপস্থিত ছিলেন না। ছিলেন শুধু পহেল ও বাশারই।
এ প্রসঙ্গে পহেল চাকমা বললেন, ‘সবারই আসার কথা ছিল, কিন্তু আবু বকর হজ্ব করতে সৌদি, চন্দনাইশ গেছেন অশোক তালুকদার, জুঁই চাকমা আসবেন বলে আসেন নাই। আর জসীম ভাই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও আসেননি।’
দীপেন দেওয়ানের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে পহেল চাকমা জানান, দীপেন দেওয়ান আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও তিনি একজন নিপাট ভদ্রলোক। তার পদত্যাগে রাঙামাটি তথা পার্বত্যবাসীর ক্ষতি হলো। রাঙামাটির একজন সন্তান হিসেবে তার দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো কর্তব্য মনে করেছি। সবখানে তো আর রাজনীতি চলে না। আমরা দেশের প্রচলিত রাজনীতির বাইরে এসে ভিন্ন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি।
প্রসঙ্গত, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি আসনে মোট সাতজন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ধানের শীষ প্রতীকে দীপেন দেওয়ান ২ লাখ ১ হাজার ৮৪৪ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে বড় ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিজয় নিশ্চিত করেন।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা পেয়েছেন ৩১ হাজার ১৪২ ভোট। ট্রাক প্রতীকে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী আবুল বাশার পেয়েছিলেন ৪৪৯ ভোট।