বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল শুধু দুই দলের লড়াই নয়, এটা অনেক মানুষের কাছে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থানেরও প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। নিউ জার্সিতে এবারের ফাইনালে স্পেন ও আর্জেন্টিনা শিরোপাও যেন তেমন হয়ে উঠেছে। হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও স্পেনের পক্ষে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানুষের উল্লাস শুনতে পাচ্ছে বিশ্ব।
তাদের এই সমর্থনের কারণ শুধু ফুটবল নয়, ফিলিস্তিনের প্রতি স্পেনের অবস্থানের ফলে বিশ্বকাপের ফাইনালকে ঘিরে গাজায় ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে। সেখানে অনেক ফিলিস্তিনি সমর্থক স্পেনের জয়ের প্রত্যাশা করছেন। তাদের মতে, ফিলিস্তিনের প্রতি স্পেন সরকারের রাজনৈতিক ও মানবিক অবস্থান তাদের এই সমর্থনের অন্যতম কারণ।
গাজার প্রতিবন্ধী ফুটবল দল ‘গাজা আল ইরাদা’র প্রধান কোচ হাতেম আল মাগরিবি বলেন, পুরো ফিলিস্তিনি জনগণ চান স্পেন শিরোপা জিতুক। তার ভাষায়, যেসব মানুষ যুদ্ধের কারণে হাত-পা হারিয়েছেন, তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শক্তি হারাননি। যারা ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান জানাতেই তারা স্পেনকে সমর্থন করছেন।
তিনি বিশ্বকাপ চলাকালে ফিলিস্তিনিদের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানানোর জন্য মিসরের কোচ হোসাম হাসানকেও ধন্যবাদ জানান। তবে যুদ্ধের কারণে গাজায় বিশ্বকাপের ম্যাচ উপভোগ করাও কঠিন হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের সংঘাত, বিদ্যুতের সংকট এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে অনেক পরিবার নিয়মিত খেলা দেখতে পারছেন না।
সাবেক ফুটবলার ও স্টেডিয়াম ব্যবস্থাপক আদনান আল আফিফি বলেন, বিদ্যুৎ থাকলেই কেবল খেলা দেখা সম্ভব হয়। কিন্তু জ্বালানির অভাবে জেনারেটর চালানোও অনেকের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
এই পরিস্থিতির মধ্যেও ফুটবলের আনন্দ ফিরিয়ে আনতে গাজা সিটির প্যালেস্টাইন স্পোর্টস ক্লাবে বিশ্বকাপ উপলক্ষে দুটি প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করা হয়। বর্তমানে এটিই গাজার একমাত্র সচল ফুটবল ক্লাব, যেখানে খেলোয়াড়রা অনুশীলনের সুযোগ পাচ্ছেন।
প্রদর্শনী ম্যাচে ফিলিস্তিন ও স্পেনের প্রতিনিধিত্বকারী দুটি দল অংশ নেয়। আন্তর্জাতিক ম্যাচের আবহ তৈরি করতে রেফারির পাশাপাশি প্রতীকী ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থাও রাখা হয়। আল আফিফির মতে, পুরো আয়োজন ছিল আবেগ, আনন্দ ও স্পেনের প্রতি সমর্থনের এক অনন্য প্রকাশ।
অন্যদিকে ৩৩ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি আহমেদ আল বোজম বলেন, তিনি স্পেনের পক্ষেই রয়েছেন। তার মতে, স্পেন ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে বলেই তিনি তাদের সমর্থন করছেন। গাজার অনেক মানুষের মধ্যেই একই ধরনের অনুভূতি কাজ করছে।
এদিকে ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরাইলে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে তিনি আর্জেন্টিনা দলের জন্য শুভকামনা জানান। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু উল্লেখ করে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন।
ফলে বিশ্বকাপের এই মহারণ শুধু মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না। স্পেন ও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক অবস্থান, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং মানুষের আবেগও এবারের ফাইনালকে দিয়েছে ভিন্ন এক মাত্রা।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের মে মাসে স্পেন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। সে সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছিলেন, এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য ছিল দুই রাষ্ট্রভিত্তিক শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথকে এগিয়ে নেওয়া, গাজার মানবিক সংকট মোকাবিলায় ভূমিকা রাখা এবং যুদ্ধবিরতি ও ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করা।
শুধু সরকার নয়, স্পেন জাতীয় দলের কয়েকজন খেলোয়াড় ও কোচও গাজার মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল এবং কোচ পেপ গার্দিওলার বক্তব্যও ফিলিস্তিনিদের কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।