জাতীয় রাজস্ব (এনবিআর) বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৩০ জুন। দুই বছর চেয়ারম্যান থাকার পর তার মেয়াদ বাড়ানোর কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কারণ নতুন রাজনৈতিক সরকারের নীতি-কৌশলের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছেন না তিনি। তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও শোনা যায়— তিনি কারও কোনো পরামর্শ শোনেন না। তাহলে প্রশ্ন আসে কে হচ্ছেন এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান। এ প্রশ্নের উত্তরে জানা গেছে, এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান হতে রেস বা প্রতিযোগীতা শুরু করেছেন ৭ জন। এরা হলেন, রাজস্ব বোর্ডের সদস্য কর প্রশাসন আহসান হাবিব। তার বাড়ি বরিশাল। সরকারঘনিষ্ঠ দুজনের মাধ্যমে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভ্যাট-অডিট ও নিরীক্ষা সদস্য সৈয়দ মুশফিকুর রহমান। বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের মাধ্যমেই চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য তদবির করছেন তিনি। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুর, আবার শ্বশুরবাড়ি বরিশাল। তিনি একসময় বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংক এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকে (বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড) চাকরি করতেন। রেসে আছেন শুল্ক প্রশাসনের সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন। তার বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিলে। বুয়েটে দুবছর পড়ার পর বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে যোগ দেন সরকারি চাকরিতে। ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে পড়ার সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ব্যাচমেট ছিলেন বলে শোনা যায়। এছাড়া রয়েছেন রাজস্ব বোর্ডের করনীতির সদস্য মোতাসিম বিল্লাহ ফারুকী। বাড়ি জামালপুরে। তার সম্ভাবনা বেশি বলে তিনি নিজেই ঘনিষ্ঠজনদের বলছেন বলে জানা গেছে। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ পুরনো।সৈয়দ আবু দাউদ রাজস্ব বোর্ডের অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান। চট্টগ্রামের কানেকশনে তিনি এ পদের জন্য আগ্রহী। সরকারের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ীও তার বিষয়ে লবিং করছেন বিভিন্ন মহলে।ভূমি অ্যাপিলেট বোর্ডের চেয়ারম্যান হলেন আবদুল্লা হিল বাকী। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর ছোট ভাই।সমাজকল্যাণ সচিব আবু ইউসুফের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে। পরিশ্রম করতে পারেন। উদ্যমী হয়ে কাজ করার মানসিকতা রয়েছে তার। তার চ্যানেলে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নীরবে তিনিও।জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন উইংয়ে কর্মরত বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও ব্যবসা-শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে। তবে ভবিষ্যতে রোষাণলে পড়তে পারেন অথবা নিজের ক্ষতি হতে পারে এই ভয়ে তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। কারণ রাজস্ব বোর্ড এমন শক্তিশালী সরকারি সংস্থা চাইলে যখন-তখন যে কারোর ওপর চড়াও হতে পারে। বিষয়টি জানার জন্য ভ্যাট-অডিট ও নিরীক্ষা সদস্য সৈয়দ মুশফিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। বলছেন, ‘এসব নিয়ে অহেতুক মিথ্যা ট্রল হয়। এ নিয়ে আমরা খুবই বিব্রত।’তবে একই পদমর্যাদার আরেকজন জানালেন, কেউ চেয়ারম্যানের দৌড়ে আছেন এ খবর এলেই তো ৩০০/৪০০ কোটি টাকা খরচের ট্রল শুরু হয়ে যায়। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব প্রশ্ন করতে থাকে, সত্যি আমরা এ নিয়ে বিব্রত হই। কারও যদি এতো টাকা থেকেই থাকে, তাহলে সে পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দ্বীপরাষ্ট্র বাহামা গিয়ে অবকাশযাপন না করে কেন সাধারণ মানুষের গালি শুনবে, মন্ত্রীর ঝাড়ি খাবে।শুল্ক প্রশাসনের সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন জানালেন, ‘চেয়ারম্যান হতে চাই না। এ নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে।’ চাকরির মেয়াদ আছে আর ৬ মাস।আরেক কর্মকর্তা বললেন, ‘পদটা একটা ‘হাবিয়া দোজখ। ঢাকা-চট্টগ্রামে যেসব খনিতে যে সময়ে চাকরি করেছি, তখন টাকার দাম ছিল বেশি, জমির দাম ছিল কম। এখন জমির দাম অনেক বেশি। কিন্তু সে পথে হাঁটিনি কখনো।’রাজস্ব বোর্ডের অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু দাউদ জানালেন ভিন্ন কথা, ‘চাকরির মেয়াদ আছে আরও ১১ মাস। একটু শান্তিতে থাকতে চাই।’অন্য একজন কর্মকর্তা নিজের পরিচয় গোপন করে জানালেন, এই রেস থেকে ৩ মাস আগেই সরে এসেছি। এ পদে যারা কাজ করছেন বা করেছিলেন তাদের অনেকেই এখন ঝামেলায় আছেন। এ পদ এখন একটি বিরাট বোঝা মনে হয়। বুদ্ধিমানদের কেউই এ পথে হাঁটবেন না। সূত্রমতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে শীর্ষ পর্যায়ে কারা কোন পদ পাবেন এ নিয়ে বৃহত্তর নোয়াখালী ও বরিশালের মধ্যে প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিনের। এসব এলাকার অন্তত ৭ জন নতুন চেয়ারম্যান হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। নানা উপায়ে চেষ্টা-তদবিরও করছেন তারা। যদিও এদের অনেকে তা অস্বীকার করছেন। এদিকে বর্তমান রাজনৈতিক সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান কাকে বানাবেন সে বিষয়ে খুবই সতর্ক ও সংবেদনশীল। বোর্ড প্রধানের ওপর নির্ভর করে রাজস্ব আহরণের গতি ও সাফল্য। আগামী অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে অন্তত ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ঘোষিত বাজেটে।এনবিআর চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে পেশাদার, ব্যবসাবান্ধব ও সৎ কর্মকর্তা নিয়োগ করতে না পারলে পদে পদে অর্থনীতি হোঁচট খাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ চেয়ারম্যানের দক্ষতা ও সৃজনশীলতার ওপর নির্ভর করে রাজস্ব আয়ে সফলতা-ব্যর্থতা। কোনো কারণে রাজস্ব আদায়ের ১ শতাংশও হেরফের হলে ৬ হাজার ৪০ কোটি টাকা কম আদায়ের আশঙ্কা থেকে যায়।নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কমকর্তা জানান, এনবিআর চেয়ারম্যানের কোনো পদক্ষেপে ভুল করা যাবে না। তাকে রাজস্ব আদায়ে মনোযোগী একই সঙ্গে উদ্যোগী হতে হয়। যাদের কাছ থেকে কর আদায় হয়, তাদেরকে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ না করে নতুনভাবে বিস্তৃত করতে হবে কর জাল। অর্থাৎ খুঁজে বের করতে হবে নতুন করদাতা।প্রায় ২০ বছর পর বিএনপি সরকার এবারের বাজেট ঘোষণা করেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীরও এটি প্রথম বাজেট। বিশ্বের টালমাটাল অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ সরকারের জন্য অর্থনীতি সচল রাখা ও উজ্জীবিত করা বিরাট চ্যালেঞ্জ। এরকম পটভূমিতে কাকে করা হবে বা কে হতে যাচ্ছেন এনবিআরের চেয়ারম্যান? এটা এমন গুরুত্বপূর্ণ পদ যাকে বলা হয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারের প্রধান রক্ষক।
৩ মাস ২৯ দিন আগে
কক্সবাজারের ইনানি সৈকতে সাগরের নীল জলরাশির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিলাসবহুল ‘সি পার্ল বিচ রিসোর্ট’। বাইরের চাকচিক্য আর রমরমা ব্যবসার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার জগত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-কে রীতিমতো ‘ফাঁদে’ ফেলে ৬০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য ফাঁস হয়েছে এই রিসোর্টটির কর্ণধারের বিরুদ্ধে। সি পার্লের এই ‘বন্ড জালিয়াতি’ কেবল একটি কোম্পানির দুর্নীতি নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় অর্থ লুণ্ঠনের এক সুপরিকল্পিত মহোৎসব বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খোদ আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদও। তাঁর প্রশ্ন কক্সবাজারের এই রিসোর্টটিতে বছরজুড়েই পর্যটকদের ভিড় এবং রমরমা ব্যবসা থাকে। তাহলে কেন তারা নিয়মিত কিস্তি দিচ্ছে না?আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ জানান, সি পার্ল বিচ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার তাগাদা দিয়েও কোনো ফল হচ্ছে না। রাজনৈতিক প্রভাবে তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। এই বিশাল অঙ্কের টাকা আটকে থাকায় এখন চরম অর্থসংকটে ভুগছে খোদ আইসিবি।আইসিবি সূত্র জানায়, এই বন্ড জালিয়াতির মূল হোতা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতা ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ইকরামুল হক টিটু। সি পার্ল রিসোর্টের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য তিনি। ২০১৭ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার করে আইসিবি-কে ৩২৫ কোটি টাকার বন্ডে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করেন। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া সেই ৮ বছর মেয়াদী বিনিয়োগই আজ আইসিবির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ১০ শতাংশ সুদে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ষান্মাসিক ভিত্তিতে কিস্তি পরিশোধের কথা থাকলেও সি পার্ল কর্তৃপক্ষ তা থোড়াই কেয়ার করেছে। নিয়মিত কিস্তি না দেওয়ায় ৩২৫ কোটি টাকার মূল বিনিয়োগ সুদে-আসলে এখন ঠেকেছে ৫৯৭ কোটি ৯৪ লাখ ২৬ হাজার ৭৬৬ টাকায়! অর্থাৎ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা এখন এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা আইসিবির।কেবল কিস্তি ফাঁকি নয়, সি পার্ল কর্তৃপক্ষ বন্ডের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ভঙ্গ করেছে। ২০ শতাংশ শেয়ারে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি। ঋণের বিপরীতে সম্পদের ওপর প্রথম চার্জ সৃষ্টি বা বন্ধকীকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়নি, ফলে বিনিয়োগের কোনো নিরাপত্তা নেই। কিস্তি পরিশোধে বিলম্বের জন্য নির্ধারিত অতিরিক্ত সুদের শর্তও তারা কৌশলে এড়িয়ে গেছে।আর সি পার্ল বিচের মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে এটিই প্রথম অভিযোগ নয়। এর আগে আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি ‘বেঙ্গল ফাইন সিরামিক্স লিমিটেড’-এর কারখানা জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় নেতাদের প্রভাব খাটিয়ে কয়েকশ সন্ত্রাসী নিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর করে সেই কারখানা দখল করা হয়েছিল বলে জানা যায়।অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আগে থেকেই দখলবাজির অভিযোগ রয়েছে, তাদের কেন এত বড় অঙ্কের রাষ্ট্রীয় অর্থ বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হলো? রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে কি তবে দেশের আর্থিক খাত পুরোপুরি জিম্মি?এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলেও খুঁজে পাওয়া যায়নি ইকরামুল হক টিটুকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পলায়নের পর গা ঢাকা দিয়েছেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবং সি পার্ল বিচ রিসোর্টের কর্ণধার ইকরামুল হক টিটু।
৫ মাস ২ দিন আগে