চট্টগ্রামে ক্রমেই বাড়ছে ওরশ বিরিয়ানির কদর। আর ঐতিহ্য হারাচ্ছে মেজবানি। গত দুই-তিন বছর ধরে মেজবানির মাংসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে ‘ওরশ বিরিয়ানি’। চাহিদার প্রয়োজনে বন্দরনগরীর এখন এমন কোনো এলাকা নেই, যেখানে ওরশের বিরিয়ানির দোকান নেই। কেন এমন হল যে হঠাৎ করেই ওরশ বিরিয়ানির কদর এত বেড়ে গেল। এমন প্রশ্নের উত্তরে ভোজনরসিকরা বলেন, সহজে পাওয়া যায়। দামও তুলনামূলক কম। খাওয়ারও ঝক্কিঝামেলা নেই। মেজবানির মাংস খেতে লাগবে সাদা ভাত। ওরশের বিরিয়ানির ভেতরেই মাংস। একপ্লেটে খাবার সারা। ভোজনরসিকদের মতে, নগরীর যেকোনো দোকানে এক জনের মেজবানির মাংস, সাদা ভাতা খেতে লাগে ৩০০ টাকা। ওরশের বিরিয়ানিতে লাগে ১৫০ টাকা। অপূর্ব স্বাদ এই বিরিয়ানির। দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়ার এটাও একটা কারণ। চট্টগ্রাম মহানগরীর বহদ্দারহাট এলাকার ভোজনরসিক আবদুল খালেকের মতে, চট্টগ্রামে অসংখ্য পীর আউলিয়াদের মাজার রয়েছে। যেখানে প্রতিবছর ওরশ হয়। সেখানে তৈরী বিরিয়ানি অত্যন্ত সুস্বাদু। সেই ওরশ থেকে ওরশ বিরিয়ানির কদর বেড়েছে। তিনি বলেন, মেজবান ও ওরশ বিরিয়ানি খাওয়া কোনো প্রতিযোগীতা নয়, বরং চট্টগ্রামের সমৃদ্ধ খাদ্য সংস্কৃতির এক সুন্দর বিবর্তন। কালক্রমে মেজবানি জৌলুস হারালেও চট্টগ্রামের ঐতিহ্য আর অহংকার হিসেবে টিকে থাকবে। একইভাবে ওরশ বিরিয়ানিও তার নিজস্ব স্বাদে জয় করে নিবে আধুনিক চট্টগ্রামকে।ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মেজবান চট্টগ্রামের প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো সামাজিক আতিথেয়তার প্রতীক। ১৬শ শতাব্দীর বিখ্যাত কবি সৈয়দ সুলতানের ‘নবীবংশ’ কাব্যেও এর লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায়। ফারসি শব্দ ‘মেজবান’ যার অর্থ অতিথি আপ্যায়নকারী, তা থেকেই এই উৎসবের নাম। ধনী-গরিবের বৈষম্য ভুলে সবাই একসাথে বসে খাওয়ার এই সামাজিক মেলবন্ধন থেকেই জন্ম আজকের বিখ্যাত চট্টগ্রামের ‘মেজবান’।অন্যদিকে, ওরশ বিরিয়ানির ইতিহাস মূলত মাজারের আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। আরবি ‘উরুস’ থেকে আসা ওরশ উপলক্ষে সুফি সাধকদের ওফাত দিবসে ভক্তদের যে ‘তবারক’ দেওয়া হতো, তা থেকেই এর জন্ম। প্রায় এক শতাব্দী আগে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের আধুনিক রূপের শুরু। ৫০ বছর আগে লাখ লাখ ভক্তের খাবার দ্রুত তৈরি করতে বাবুর্চিরা চাল ও মাংস একসাথে বড় ডেকসিতে দমে রান্না শুরু করেন।চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার ওরশ বিরিয়ানি দোকানের বাবুর্চি হাফিজুর রহমান জানালেন, ওরশ বিরিয়ানির রান্নার ধরণ আলাদা। মাংস আর চাল একসাথে দমে এমনভাবে বসানো হয়। মসলা চালের ভেতরে ঢুকে যায়। মেজবানের মতো আলাদা ঝোল বা ডালের প্রয়োজন হয় না। এক ডেকসিতেই খাবারের জাদু।’কিন্তু কেন মেজবানকে টেক্কা দিচ্ছে ওরশ বিরিয়ানি? প্রশ্ন করা হলে বাবুর্চি হাফিজুর রহমান বলেন, মেজবানি মাংস খেতে হলে সাদা ভাত, চনার ডাল আর নলার ঝোলের আয়োজন লাগে। কিন্তু ওরশ বিরিয়ানি এক প্লেটেই পেট ভরে ও স্বাদে মন ভরে।ওই দোকানের মালিক কফিল উদ্দিন বললেন, মেজবানি ফুল প্যাকেজের তুলনায় ওরশ বিরিয়ানি বেশ সাশ্রয়ী। তাই মধ্যবিত্ত ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘স্ট্রিট ফুড’ হিসেবে প্রথম পছন্দ এ বিরিয়ানি। সন্ধ্যার পর এর বিক্রি মেজবানের চেয়েও বেশি।