রাজধানী ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত মাত্র ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনের ১৭ কিলোমিটার নির্মাণ করতেই এক যুগ পার করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। যা প্রকল্প ভৌত কাঠামোর মাত্র ৫৭.২০ শতাংশ। আর এ কাজে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়েছে চার দফা। ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে দ্বিগুণ। প্রকল্পটির সর্বশেষ সময়সীমা চলতি বছরের জুনেই শেষ হওয়ার কথা।
এর মধ্যে নতুন আবদার নিয়ে বসেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রস্তাব দিয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ যেন আরও দু‘বছর বাড়ানো হয়। তবে পরিস্থিতি বুঝে ব্যয় বাড়ানোর কথা প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়নি। মোট ব্যয় অপরিবর্তিত রেখে বিভিন্ন খাতে ব্যয় সমন্বয় এবং আরও দু‘বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত সময় চেয়ে দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় রেলওয়ে।
এভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম ধীরগতি ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উঠেছে নানামুখী প্রশ্ন। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান দেশের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে এই দীর্ঘসূত্রিতাকে এক ধরনের নেতিবাচক ‘সংস্কৃতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘প্রকল্প নেওয়ার সময় ফিজিবিলিটি স্টাডিতে (সমীক্ষা) অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার নানা উজ্জ্বল দিক তুলে ধরা হলেও বাস্তবে গিয়ে দেখা যায় বছরের পর বছর আটকে থাকে প্রকল্প। তাহলে ফিজিবিলিটি স্টাডি কি কেবলই কাগজি আনুষ্ঠানিকতা? প্রশ্ন তুলেন হাদিউজ্জামান।
তিনি আরও বলেন, এই করিডোরে কমিউটার রেলের সংখ্যা বাড়ানো গেলে তা যানজট নিরসনে ‘মহৌষধ’ হতে পারত, কিন্তু দীর্ঘসূত্রিতার কারণে উল্টো ট্রেন চলাচল কমে যাচ্ছে। এই সংকট এড়াতে রেললাইনের আশপাশে কাজ করার ক্ষেত্রে শুরুতে একটি আলাদা ‘সাপোর্ট প্রজেক্ট’ নেওয়া কার্যকর সমাধান।
প্রকল্প সূত্র জানায়, ঢাকার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের যোগাযোগ সহজ করা, যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন এবং ভারী পণ্য পরিবহনের লক্ষ্য নিয়ে ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরালে একটি ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ’ প্রকল্পটি মূলত ডিআরজিএ-সিএফের অনুদান সহায়তায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
শুরুতে মোট ৩৭৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০১৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত ছিল। ২০১৫ সালের ২০ জানুয়ারি একনেক সভায় এটি অনুমোদন পায়, যার মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ছিল ১২৯ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং ডিআরজিএ-সিএফের অনুদান ছিল ২৪৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
পরে চার দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। এরপর বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনটিকেও ডুয়েলগেজে রূপান্তরের নতুন সিদ্ধান্ত যুক্ত করে প্রথম সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ৬৫৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০২৩ সালের ১৮ এপৃল একনেক সভায় ২০১৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে প্রকল্পটির সংশোধিত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, নানা প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে এই প্রকল্পে দুই দফায় দরপত্র আহ্বান করতে হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর ২০১৭ সালে কাজ পায় চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘চায়না পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন’। তবে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প এলাকা বুঝিয়ে না দেওয়ার অভিযোগ তুলে, কাজ শেষ না করেই ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ প্রকল্প ছেড়ে চলে যায় চীনা প্রতিষ্ঠানটি। তখন পর্যন্ত তারা মাত্র ৪৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেছিল।
এরপর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৭ এপৃল ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘জিপিটি ইনফ্রাপ্রজেক্ট লিমিটেড’ এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান ‘স্ট্যান্ডার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’-এর যৌথ উদ্যোগে নতুন চুক্তি সই হয়। এই জিপিটি-স্ট্যান্ডার্ড যৌথ উদ্যোগ ২০২৫ সালের ১৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করে। নতুন ঠিকাদার দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজের গতি কিছুটা বেড়ে বর্তমান অগ্রগতি ৫৭.২০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
এর মধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত সময় চেয়ে দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় রেলওয়ে। প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী নিয়ে গত ২০ এপৃল পরিকল্পনা কমিশনে একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভার দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান সিঙ্গেল রেললাইনটি ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদার তুলনায় বর্তমানে নিতান্তই অপ্রতুল। সড়কপথের তীব্র যানজট ও জনদুর্ভোগ কমাতে এই ডুয়েলগেজ রেললাইনটি নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ডুয়েলগেজ লাইনে মিটারগেজ ট্রেনের পাশাপাশি অধিক যাত্রী ও ভারী মালামাল বহনে সক্ষম ব্রডগেজ ট্রেনও চলাচল করতে পারবে।
প্রকল্পের আওতায় জুরাইন লেভেল ক্রসিং গেট থেকে নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশন পর্যন্ত ২৯ দশমিক ৯১ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া ২২টি মাইনর সেতু, ৫টি স্টেশন ভবন, ১১টি প্লাটফর্ম ও ১১টি প্লাটফর্ম শেড নির্মাণের কাজ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, চাষাঢ়া, ফতুল্লা, পাগলা ও শ্যামপুর স্টেশন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি ১১টি লেভেল ক্রসিং গেট, নারায়ণগঞ্জ স্টেশনে একটি ওয়াশপিট, একটি ফুটওভার ব্রিজ এবং কম্পিউটারভিত্তিক ইন্টারলকড সিগন্যালিং সিস্টেম স্থাপনের কাজও প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত বলে আলোচনা হয়েছে বৈঠকে।
সেই সভায় প্রকল্পের অগ্রগতি হিসেবে বলা হয়েছে, এমব্যাংকমেন্ট নির্মাণের আওতায় সাবগ্রেড, সাব-ব্যালাস্ট, ক্লিয়ারিং অ্যান্ড গ্রাবিং এবং মাটি পুনঃসংকোচনসহ বিভিন্ন কাজের অগ্রগতি হয়েছে। রেল ট্র্যাক লিংকিংয়ের আওতায় জুরাইন থেকে ফতুল্লা সেকশনে মোট ৪ দশমিক ২৯৯ কিলোমিটার প্রাথমিক ট্র্যাক লিংকিং কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া দুটি সুইচ এক্সপানশন জয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে। ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণের মধ্যে ফতুল্লা স্টেশন ইয়ার্ডে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, ডাইক নির্মাণ, ব্রিজ নম্বর-৫ এর অবশিষ্ট আরসিসি কাজ এবং ব্রিজ নম্বর-৭ এর ডিজাইন ও শিট পাইল ড্রাইভিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে।
স্টেশন ও ভবন নির্মাণের অগ্রগতির মধ্যে নারায়ণগঞ্জ স্টেশন ভবনের সামনের প্লাটফর্ম কাস্টিং, ডরমিটরি ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার স্ল্যাব কাস্টিং এবং ইটের কাজের প্রায় ৯৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৫৭ দশমিক ২০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৩৮ শতাংশ।
প্রকল্প সংশোধনের কারণ ব্যাখ্যায় বৈঠকে বলা হয়, প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে সিগন্যালিং, ট্র্যাক, ব্রিজ ও ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে মোট ৫৭৪ কোটি ১৮ লাখ ৭১ হাজার টাকার সংস্থান ছিল। প্রস্তাবিত দ্বিতীয় সংশোধনীতে এসব কম্পোনেন্ট পুনর্বিন্যাস করে রেলওয়ে ইনস্টলেশন (সিগন্যালিং) ও রেলওয়ে ইনস্টলেশন (সিভিল) খাতে মোট ৫৮২ কোটি ৫৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ব্যয় বেড়েছে ৮ কোটি ৩৭ লাখ ২৩ হাজার টাকা।
আরও বলা হয়, কাজ শেষ হওয়ার পর ত্রুটি শনাক্ত ও ঠিকাদার দিয়ে তা সংশোধনের জন্য পরামর্শক প্যাকেজে ছয় মাসের ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড রাখা হয়েছে। এ সময়ে টিম লিডার, সিগন্যাল ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী, এমব্যাংকমেন্ট প্রকৌশলী, বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী এবং ট্র্যাক প্রকৌশলীসহ সীমিত জনবল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কাজের দীর্ঘসূত্রতা ও বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রকল্প পরিচালক মো. সেলিম রউফ বলেন, ‘যদিও ১২ বছর দীর্ঘ সময় লেগেছে, তবে এর পেছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে। প্রথমে এখানে কেবল একটি নতুন লাইন করার পরিকল্পনা ছিল। পরে ২০২৩ সালে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বর্তমান মিটারগেজ লাইনটাকেও ব্রডগেজ করার সংশোধনী আসে। এরপর আমাদের আবার নতুন টেন্ডার করতে হয়েছে, যার চুক্তি সই হয় ২০২৫ সালের এপ্রিলে। নতুন ঠিকাদার কাজ শুরু করতে না করতেই বর্ষা মৌসুম চলে আসায় কাজে কিছুটা স্থবিরতা আসে। ওদের কাজের সময় ১৮ মাস। এটি আগামী নভেম্বর মাসে শেষ হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান লাইনে তো ট্রেন চলে। ফলে একটি লাইনের কাজ শেষ হলে ওই লাইনের কাজটি শুরু হবে। মাঝে আমরা এক-দেড় মাস পিছিয়ে গিয়েছি তেল সংকটের কারণে। তেলের জন্য আমাদের ইকুইপমেন্টগুলো চালাতে পারিনি। আমরা খুবই আশাবাদী, ২০২৮ সালের মধ্যে কাজটি শেষ করতে পারব এবং ২০২৯ সাল নাগাদ ট্রেন চলতে পারে।’