চট্টগ্রামের রাজপথে হঠাৎ শক্তি দেখাতে শুরু করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ। করছে একের পর এক ঝটিকা মিছিল। এ নিয়ে কপালে ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে পুলিশের। সরব হয়ে উঠেছে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারাও।
এ চাপে বিশেষ অভিযানে নেমেছে পুলিশ। ছাত্রলীগের পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের করছে গ্রেপ্তার।
বুধবার (৩ জুন) সকালে গ্রেপ্তার হওয়া নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ৭০ জনকে আদালতে প্রেরণ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে দুটি মামলা করা হয়েছে।
এমনটাই জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ। তিনি জানান, নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিলের ঘটনায় চট্টগ্রাম নগরীতে মাঠপর্যায়ে পুলিশকে সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকার বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ সংগঠনকে আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। মাঠপর্যায়ে পুলিশকে অ্যালার্ট করা হয়েছে। এখন থেকে তারা সবসময় সতর্ক থাকবে। নিষিদ্ধ সংগঠন যাতে কিছু করতে না পারে।
নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়েছে বলে জানালেন সিএমপির উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল হক। তিনি বলেন, মিছিলটা হয়েছে পাঁচলাইশ থানা এলাকায়। এজন্য পাঁচলাইশে একটা মামলা হয়েছে। খুলশীতে আগের একটি ঘটনা নিয়ে মামলা হয়েছে। দুটিই সন্ত্রাস দমন আইনে। পাঁচলাইশে মিছিলের ঘটনায় খুলশী থানায় ১৩ ও পাঁচলাইশে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযান চলছে।
সূত্র জানায়, গত সোমবার সকালে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ থানার সানমার ওশান সিটি শপিং কমপ্লেক্সের সামনে থেকে মিছিল বের হয় নগরীর ওমরগণি এমইএস কলেজ ছাত্রলীগ/ছাত্র সংসদের ব্যানারে। মিছিলে ১০০-১৫০ জন অংশ নেন। গত ২২ মাসে চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের এত বড় মিছিল আর হয়নি।
মিছিলের ব্যানারে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের পাশাপাশি ওই কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা আরশেদুল আলম বাচ্চুর ছবি দেখা যায়। পরে ওই মিছিলের ভিডিও নওফেল ফেসবুকে নিজের টাইমলাইনে পোস্টও করেন।
মিছিলের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর সরব হন চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা। নগরীর পাঁচলাইশ ও খুলশী থানার ওসিকে দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন নগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আহমেদ উল আলম চৌধুরী রাসেল।
নগর যুবদলের সাবেক সহসভাপতি সাহেদ আকবর ফেসবুকে দেওয়া একাধিক পোস্টের মধ্যে একটিতে উল্লেখ করেন, যে থানায় ফ্যাসিস্টদের মিছিল হবে ওই থানার ওসিকে প্রত্যাহার করতে হবে। থানায় ফ্যাসিস্টদের জন্য বিএনপির যে নেতা তদবির করবেন, তাকেও গ্রেপ্তার করতে হবে।
ফেসবুকে প্রতিক্রিয়ার মুখে কমিশনার দ্রুত বিশেষ অভিযান শুরুর নির্দেশ দেন বলে জানালেন সিএমপির এক কর্মকর্তা। এরপর রাত থেকে ১৬ থানা জুড়ে অভিযান চলছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে এখন থেকে নিষিদ্ধ সংগঠন মিছিল করলেই সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা করা হবে। এতদিন তারা ছয়-সাতজন মিলে মিছিল করত। এজন্য সিএমপি অতটা গুরুত্ব দেয়নি। এখন মামলা দেওয়া শুরু হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ অক্টোবর ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২০২৫ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগ ও সব সহযোগী সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম সাময়িক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকারের এসব আদেশের আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
তবে নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও ছাত্রলীগ চট্টগ্রাম নগরীতে ২০২৫ সালের শুরু থেকে গত ১৭ মাসে অর্ধশতাধিক ঝটিকা মিছিল করেছে। শুরুতে মিছিলে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা হাতেগোনা ছিল। তবে ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর থেকে মিছিলে অংশগ্রহণকারী বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি হয়েছে দৃশ্যমান।
প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, গত মাসে চট্টগ্রাম মহানগরীর সিআরবি ও ডিসি হিলে দুটি মিছিল হয়েছে। যেখানে প্রায় অধর্শত নেতাকর্মী ছিলেন। এরপর এমইএস কলেজের মিছিলটি হয়েছে আরও বড় আকারে।

চট্টগ্রাম মহানগরের ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল। ছবি- দৈনিক ঈশান
এদিকে গুপ্তলীগের মিছিল প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদল। ষড়যন্ত্রকারীদের দিন শেষ, সবার আগে বাংলাদেশ এই স্লোগান নিয়ে নগরীর লালখান বাজার মোড় থেকে বুধবার (৩ জুন) সকালে মিছিলটি বের করা হয়।
মিছিলে ছাত্রদলের প্রায় হাজারখানেক নেতাকর্মী অংশ নেন। নেতাকর্মীরা ওয়াসা, জিইসি, ষোলশহর দুই নম্বর গেইট, মুরাদপুর হয়ে বহদ্দারহাট পর্যন্ত মিছিল নিয়ে যান। মিছিলে যুবদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদেরও দেখা গেছে। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছাত্রলীগকে গুপ্তলীগ আখ্যা দিয়ে সংগঠনটির গুপ্ত মিছিল প্রতিহত করতে নগরবাসী ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
মিছিলের ব্যানারে চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, খুলশী ও হালিশহর) আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানের ছবি ছিল। মিছিলে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান মিঠু ও সদস্য কামরুল হাসান আকাশ। তবে মিছিল থেকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের তৎপরতার বিরুদ্ধে কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি।
শুধুমাত্র সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানের নির্দেশে একটি বিক্ষোভ মিছিল করা হয়েছে বলে জানালেন ছাত্রদল নেতা আরিফুর রহমান মিঠু। তার মতে, ছাত্রলীগ এখন গুপ্তলীগে পরিণত হয়েছে। গুপ্ত সংগঠনের মতো গুপ্ত মিছিল বের করে। কিন্তু নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের কোনো ক্ষমা নেই। তাদের যে কৃতকর্ম, হাজার শিক্ষার্থীকে তারা হত্যা করেছে, সেজন্য তাদের জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। তখন জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে ক্ষমা করে তাদের আবার রাজনীতি করার সুযোগ দেবে কী না।
নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের জন্য প্রশাসনের দৃষ্টিও আকর্ষণ করলেন তিনি। জানালেন, গুপ্তলীগ মিছিল করছে। আমরা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। চব্বিশের পরাজিত আওয়ামী লীগের এদেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার থাকতে পারে না বলে মনে করি। নিষিদ্ধ সংগঠন মাঠে নামলেই তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। বিচারের কাঠগড়ায় তুলতে হবে। কোনো সন্ত্রাসী, গুপ্ত সংগঠনের কর্মকান্ড আমরা চাই না।