বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই বদলে যায় বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের আবেগের ভাষা। রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে বড় বড় শপিং মার্কেট— সবখানেই তখন ছড়িয়ে পড়ে জার্সির উন্মাদনা। এ সুযোগে দামও বেড়ে হয় আগুন। ব্যতিক্রম নয় এবারও। এর মধ্যে বরাবরের মতো বেচা-কেনার শীর্ষে রয়েছে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সি।
মেসি, নেইমার কিংবা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের নাম লেখা জার্সিই যেন তরুণদের আবেগ, পরিচয় আর সমর্থনের প্রতীক। কিন্তু সেই আবেগের বাজারে এসব জার্সিতে বইছে এখন অস্বাভাবিক দামের ঝড়। অভিযোগ উঠেছে, চাহিদাকে পুঁজি করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে একটি শক্তিশালী ব্যবসায়ী চক্র, যার চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ ক্রেতাদের পকেটে।
ক্রেতাদের মতে, দেশের বাজার জুড়ে বিশাল সমাহার আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির। দোকানের শোকেস থেকে ফুটপাত— সবখানেই সাজানো বিভিন্ন মান ও দামের জার্সি। তবে আনন্দের চেয়ে হতাশাই বেশি ক্রেতাদের চোখে। কারণ, কয়েক দিনের ব্যবধানে জার্সির দাম বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে।
সানোয়ার করিম নামে এক ব্যবসায়ীর ভাষ্য, ‘যে জার্সি তিন দিন আগেও আমরা পাইকারিতে ১৮০ টাকায় কিনেছি, এখন সেটিই ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। আগে নিয়মিত সরবরাহ থাকলেও এখন চাহিদার তুলনায় অনেক কম মাল পাওয়া যাচ্ছে।’
কাপড় ও মানভেদে বর্তমানে জার্সির দাম একেকরকম উল্লেখ করে তিনি জানালেন, জার্সির দাম উঠেছে ৩০০ থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ক্রেতারা, যারা কিনতে চান সাধারণ মানের জার্সিই।
ব্যবসায়ীদের দাবি, টুর্নামেন্ট ঘিরে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চাপ তৈরি হয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থায়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম বৃদ্ধি, শিপিং খরচ এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ার প্রভাবও পড়েছে স্থানীয় বাজারে।
তবে খুচরা বিক্রেতাদের একাংশের মতে, পাইকারি পর্যায়েই দাম বাড়ানো হচ্ছে অস্বাভাবিকভাবে, যা কৃত্রিম সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে বাজারে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে ২০২৬ সালে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের বিভিন্ন ধরনের জার্সির দামে। সাধারণ লোকাল বা সাবলিমেশন জার্সির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও প্রিমিয়াম ফ্যান এডিশনের বেড়েছে প্রায় ১১ থেকে ৪০ শতাংশ।
প্লেয়ার এডিশন কিটে দাম বেড়েছে ৭ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। আর সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে অফিসিয়াল আন্তর্জাতিক জার্সিতে, যেখানে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৫০ থেকে ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বৈশ্বিক বাজারে ডলার সংকট, ব্র্যান্ড প্রিমিয়াম এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই মূল্যবৃদ্ধি হলেও তা আরও তীব্রভাবে প্রভাব ফেলছে স্থানীয় বাজারে।
দামের এই অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন তরুণ ও শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইফ হোসেন আজাদ আক্ষেপ করলেন, ‘আমি ব্রাজিলের জার্সি ৪৫০ টাকায় কিনেছি। তিন দিন আগে এলে হয়তো আরও কম দামে পেতাম। এখন এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরেও ৭০০ টাকার নিচে কিছু পাওয়া যাচ্ছে না।’
ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে প্রায় সব দোকানেই রাখা হচ্ছে একই ধরনের দাম। ফলে কমে গেছে দরদাম করার সুযোগও। ফুটপাতের বাজারেও দেখা গেছে একই চিত্র। ফুটপাতের ব্যবসায়ী এমরুল কায়েশ তুলে ধরলেন বাজারদর।
তিনি জানান, শিশুদের জার্সি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকায়, সাধারণ মানের হাফহাতা জার্সি ৩০০ এবং তুলনামূলক ভালো মানের জার্সি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। তবে বাড়তি চাহিদার কারণে তারাও দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন দাবি তার।
তিন দিনের ব্যবধানে জার্সির পাইকারি দাম প্রায় দ্বিগুণ উল্লেখ করে এই বিক্রেতা জানিয়েছেন, প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ পিস পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে জার্সি।
চাঁদপুরের মতলব থেকে চট্টগ্রামে চিকিৎসা নিতে আসা নাছির উদ্দীনও জার্সি কিনেছেন ছেলেমেয়ের জন্য। তার ভাষ্য, গতকাল মেয়ের জন্য জার্সি কিনেছি, আজ ছেলের জন্য কিনলাম। এক দিনের ব্যবধানে ৫০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। সব দোকানে একই কথা— নিলে নেন, না নিলে নাই।
তবে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ অস্বীকার করেছে সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ। নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা সরাসরি কারখানা থেকে জার্সি আনি। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন কম পড়ছে। হাত বদলের কারণে দাম বাড়ছে, এখানে কোনো সিন্ডিকেট নেই।’
যদিও খুচরা ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিনের দাবি, পাইকারি পর্যায়ে হঠাৎ করেই জার্সির দাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ায় পুরো বাজারে পড়েছে এর প্রভাব। তার আশঙ্কা, আগামী সপ্তাহে আরও বাড়তে পারে দাম।
তবে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে জানিয়ে আশ্বস্ত করেছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযোগ ও তদন্ত বিভাগের পরিচালক মো. মাসুম আরেফিন। তিনি বলেন, জার্সির দাম বৃদ্ধি বা সিন্ডিকেট নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইনের মতে, চাহিদাকে পুঁজি করে অতিরিক্ত মুনাফা করা অনৈতিক। বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয়পক্ষেরই দায়িত্বশীল আচরণ।
তিনি বলেন, ফুটবলপ্রেমীদের আবেগ ঘিরে প্রতি বড় টুর্নামেন্টেই জমে ওঠে জার্সির বাজার। কিন্তু সেই আবেগ যখন পরিণত হয় অসাধু মুনাফার খেলায়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ ক্রেতারা।