পবিত্র ঈদুল আজহার পরদিন চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, ফয়জ লেকসহ দর্শনীয় স্থানগুলোতে প্রকৃতিপ্রেমিদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে নগর ও আশপাশের বিনোদনকেন্দ্রে ঘুরতে বের হন প্রকৃতিপ্রেমি হাজারো মানুষ।
শুক্রবার (২৯ মে) সকাল থেকেই পতেঙ্গা, ফয়জ লেক, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা, পারকি সমুদ্র সৈকত, গুলিয়াখালী সী বিচ ও ভাটিয়ারি সানসেট পয়েন্টে পর্যটকদের উপস্থিতি দেখা যায়। নগরীর বাইরে থেকেও অনেক মানুষ ঈদের ছুটিতে এসব স্থানে বেড়াতে আসেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে শিশু-কিশোরদের আনন্দ উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ ঘোড়ার গাড়িতে চড়ছেন, কেউ সাগরের গা ভাসিয়েছেন, কেউ ঢেউয়ের সঙ্গে ছবি তুলতে ব্যস্ত। একইভাবে ফয়জ লেকে নৌকাভ্রমণ ও বিভিন্ন রাইডে ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়।
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায় প্রবেশপথে। অন্যদিকে আনোয়ারার পারকি সমুদ্রসৈকত ও সীতাকুন্ডের গুলিয়াখালী সী বিচেও ছিল পর্যটকদের সরব উপস্থিতি। বিকেলের দিকে ভাটিয়ারি সানসেট পয়েন্টে সূর্যাস্ত উপভোগ করতে জড়ো হন অসংখ্য তরুণ-তরুণী।
বিনোদন কেন্দ্রে বেড়াতে আসা লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগত লোকজনের বেশির ভাগই চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার। যাদের ঘুরে বেড়ানোর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হচ্ছে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত।
তাদের মতে, পাশে কর্ণফুলী টানেল থাকায় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত নিয়ে মানুষের আকর্ষণ বেড়েছে। ভ্রমণপ্রিয় মানুষ পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের পাশাপাশি নদীর তলদেশে দেশের প্রথম যোগাযোগপথও ঘুরে যাচ্ছেন।
জাফর আহমেদ নামে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এক কর্মচারী পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়াতে আসেন পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে। তিনি বলেন, সাগর পাড়ে এলে মন ভালো হয়ে যায়। বিশুদ্ধ বাতাস মনে প্রশান্তি আনে। চট্টগ্রামে এখন প্রচন্ড গরম অনুভুত হচ্ছে। এ অবস্থায় সৈকতের বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে।
পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটক আরমান হোসেন নামে একজন জানান, ঈদের পরদিন পরিবার নিয়ে এখানে ঘুরতে এসেছি। অনেকদিন পর সবাই একসঙ্গে সময় কাটাতে পেরে ভালো লাগছে। পরিবেশও বেশ আনন্দমুখর।
পতেঙ্গা সমূদ্র সৈকতের পূর্বে কর্ণফুলী নদীর মোহনা ঘিরে গড়ে উঠা আনোয়ারা পারকি সমুদ্র সৈকতেও মানুষের প্রচন্ড ভিড় জমে। সেখানেও সকাল থেকে তরুণ-তরুণী, শিশু ও বয়স্করা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সৈকত এলাকায় দায়িত্বরত ট্যুরিস্ট পুলিশের কর্মকর্তার এ তথ্য জানিয়েছেন।
পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে আরেক বিনোদনকেন্দ্র ফয়জ লেক কনকর্ড অ্যামিউজমেন্ট ওয়ার্ল্ডে। এখানে বেড়াতে আসা মানুষদের কেউ সি-ওয়ার্ল্ডে আনন্দে মেতেছেন। ঈদের দিনে এখানে প্রায় সাড়ে চার হাজার পর্যটক ঘুরতে এসেছেন। ছিল বেসক্যা¤েপ থাকার সুযোগ। আর ফয়জ লেকে বোটে করে ঘুরে বেড়িয়েছেন অনেকেই।
ফয়জ লেকে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা কলেজছাত্রী তাহমিনা আইরিন বলেন, ঈদের ছুটিটা উপভোগ করতে এখানে এসেছি। আজকে অনেক মানুষের সমাগম হয়েছে। সবাই খুব আনন্দ করছে।
ফয়জ লেক কনকর্ড অ্যামিউজমেন্ট ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপক (বিপণন) বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, কয়েক বছরের তুলনায় এবার প্রচুর দর্শনার্থী ঘুরতে এসেছেন। তাঁরা দিনভর সি ওয়ার্ল্ড ও পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আবার নতুন চালু হওয়া বেসক্যা¤েপ ঘুরতে এসেছিলেন বিদেশিরাও।
কনকর্ড অ্যামিউজমেন্ট ওয়ার্ল্ডের পাশেই চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। একসময় চিড়িয়াখানায় তেমন কোনো বৈচিত্র না থাকলেও এখন আর সে পরিস্থিতি নেই। নানা ধরনের প্রাণী নিয়ে আসা হয়েছে সেখানে। আছে বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি। চিড়িয়াখানার বড় আকর্ষণ এখন সাদা বাঘ। এছাড়া সিংহ, বানর, হনুমান ও বিভিন্ন প্রজাতির হরিণসহ পশুপাখি দেখতে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে এসেছেন বয়স্করাও। পাশাপাশি পাহাড়ের মাঝখানে থাকা খেলনাগুলোতে চড়ে আনন্দ উপভোগ করছে শিশুরা।
চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট থেকে দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে ঘুরতে আসেন চাকরিজীবী মোহাম্মদ জাহেদ হোসেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। তিনি বলেন, বাঘ দেখার জন্য শিশুদের অনেক আগ্রহ। টিভি-পত্রিকায়ও চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার বাঘ নিয়ে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশিত হয়। তা দেখে বাচ্চাদের মতো তাঁদেরও আগ্রহ জন্মেছে। ঈদের ছুটিতে তাই পরিবারের সবাই এখানে বেড়াতে এসেছেন। তাঁদের ভালোই লাগছে।
চিড়িয়াখানার তত্ত্ববধায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ বলেন, স্বাভাবিক সময়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে মানুষের ভিড় লেগে থাকে চিড়িয়াখানায়। এখন ঈদের ছুটিতে সে ভিড় আরও বেড়েছে। বিশেষ করে এখানে শিশু-কিশোরদের নিয়ে এসেছেন বড়রা।
সীতাকুন্ডের গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকতজুড়ে কেউ যেন বিছিয়ে রেখেছে সবুজ ঘাসের গালিচা। ম্যানগ্রোভ বনে মাঝেমধ্যে দেখা মেলে হরিণের উঁকি, কখনো ছুটে চলে লাল কাঁকড়া। ঈদে বেড়াতে সেখানেও যাচ্ছে মানুষ। এই সৈকতে আছে দর্শনার্থীদের জন্য ওয়াশ ব্লক, রয়েছে দোকানপাটও। বেড়িবাঁধের পাশে রয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। সৈকতের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের সহস্রধারা ও সুপ্তধারা নামে দুটি ঝরনা। পর্যটকেরা সেখানেও ভিড় জমাচ্ছেন।
উপচে পড়া ভিড় জমেছে ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার চা বাগানগুলোতেও। সেখানেও সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চট্টগ্রামের শহর ও প্রত্যন্ত এলাকার ভ্রমণ পিপাসু মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। চা বাগান কর্তৃপক্ষ সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পর্যটকের ঢল নেমেছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মহামায়া ইকোপার্কেও। ঈদের দিন দুপুরের পর থেকে পর্যটক আসা শুরু হলেও শুক্রবার সকাল থেকে ছিল উপচে পড়া ভিড়। ছুটি পেয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পরিবারের সদস্য ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে এখানে ছুটে আসেন অনেকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঠাকুরদীঘি থেকে মহামায়ায় যাওয়ার সড়কে গাড়ির জন্য হাঁটা দায়। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ছিল চোখে পড়ে মত। এছাড়া বাস, মাইক্রো, প্রাইভেটকার, লোকাল সিএনজি চালিত অটোরিকশা যোগে লেকের পাড়ে যেতে দেখা গেছে। পার্ক ঘিরে গড়ে উঠা হোটেলসহ বিভিন্ন দোকানে মানুষ ভিড় ছিল। পার্কের মূল গেইটের বাইরে গাড়ি পার্কিংয়ে প্রায় শতাধিক গাড়ি দেখা গেছে।
দূর থেকে দেখা যায় প্রায় পাহাড়সম বাঁধ। উভয় পাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। বাঁধের ধারে অপেক্ষমাণ সারি সারি ডিঙি নৌকা আর ইঞ্জিনচালিত বোট। বোটে ঘরে ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের লেক ঘুরে বেড়াচ্ছেন ভ্রমণ পিপাসা লোকজন। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে লেকের স্বচ্ছ পানিতে তাকাতেই দেখা যায় নীলাকাশ। পূর্ব-দিগন্তের সারি পাহাড়ের বুক চিরে যেতে যেতে লেকে মজা করে কায়াকিং করছে অনেকে। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরছেন অনেকে। কিছু দূরেই দেখা গেছে পাহাড়ের কান্না। অঝোরে কাঁদছে। অথচ তার কান্না দেখে নিজের কাঁদতে ইচ্ছে হয়নি। উপরন্তু কান্নার জলে গা ভাসাচ্ছে অনেকে।
ইছাখালী ইউনিয়নের সাহেবদী নগর এলাকা থেকে বেড়াতে আসা সরোয়ার কামাল বলেন, ঢাকায় ব্যবসা করি। পরিবার নিয়ে সেখানে থাকতে হয়। ঈদ করতে গ্রামের বাড়িতে এসেছি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মহামায়ায় বেড়াতে এলাম, দেখে খুব ভালো লাগছে। বাচ্চারাও অনেক মজা করেছে।
চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর থেকে আসা ৫ বন্ধুর একজন ইঞ্জিনিয়ার জাবেদ আবছার বলেন, প্রতি বছর ঈদের ছুটিতে বন্ধুরা সবাই মিলে বিভিন্ন পর্যটন ¯পটে বেড়াতে যাই। এবার মহামায়ায় আসলাম। রাস্তায় তেমন গাড়ি না থাকায় শহর থেকে মাত্র এক ঘণ্টায় এখানে চলে এসেছি। সবাই মিলে অনেক আনন্দ করছি।
মহামায়া ইকোপার্ক ইজারা পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এআর এন্টারপ্রাইজের কর্মকর্তা মো. জাহেদ হোসেন বলেন, স্বাভাবিক সময়ে এখানে প্রতিদিন ৩০০-৪০০ পর্যটক পার্কে আসেন। ঈদের দিন প্রায় তিন হাজার টিকেট বিক্রি হয়েছে। আশা করছি, সামনে আরও ২-৩দিন আরো বেশি টিকেট বিক্রি হবে।
এদিকে বাড়তি দর্শনার্থী সামাল দিতে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে বিভিন্ন ¯পটে। পাশাপাশি যানজট এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ট্যুরিস্ট পুলিশের পতেঙ্গা জোনের (সাব জোন) ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. হাসান ইমাম বলেন, ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। দর্শনার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে ঘুরতে পারেন, সেজন্য ট্যূরিস্ট পুলিশ সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে।