দেশে পরিচালিত ১৫১টি উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং প্রকল্পে পচা, বাসি ও নিম্নমানের খাবার সরবরাহ ঠেকাতে এবার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। শিশুদের খাবারে অনিয়ম ও জালিয়াতি রুখতে ঘোষণা করা হয়েছে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। এখন থেকে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ প্রমাণিত হলে ঠিকাদারের বিল আটকে দেওয়া, চুক্তি বাতিল ও কালো তালিকাভুক্ত করাসহ দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সেজন্য চালু হচ্ছে ‘থ্রি-স্ট্রাইক’ নীতি, সরবরাহকারীদের পারফরম্যান্স র্যাংকিং এবং লাইভ অভিযোগ ড্যাশবোর্ড। একই সঙ্গে প্রতিটি স্কুলে গঠন করা হচ্ছে পাঁচ সদস্যের ‘খাবার গ্রহণ কমিটি’। সেখানে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত তিনজন মা সরাসরি খাবারের মান যাচাই করবেন।
মাঠপর্যায়ে নজরদারিতে থাকবেন ইউএনও, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিইও) ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা (টিইও)। আগামী ১ জুনের মধ্যে সব সরবরাহকারীকে তাদের কারখানা, খামার, গুদাম, পরিবহন ও ফুড টেকনিশিয়ানের বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় নিম্নমানের খাদ্য বিতরণ, শিশু অসুস্থ হওয়া এবং সরবরাহব্যবস্থায় গোপন সাবকন্ট্রাক্টের অভিযোগ ওঠার পর পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কারণ, এই প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু খাবার বিতরণ নয়; বরং শিশুদের স্কুলমুখী করা, উপস্থিতি বৃদ্ধি, পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়া কমানো।
ইতোমধ্যে দেখা গেছে, কর্মসূচিটির কারণে বিশেষ করে প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়ে আসার প্রবণতা বেড়েছে। তাই প্রকল্পটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সরকার। তবে, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় এর স্বচ্ছতা ও মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এবার কঠোর তদারকিতে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন ব্যবস্থাপনায় কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, স্কুলে সরবরাহ, গ্রহণ, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং বিল পরিশোধসহ প্রতিটি ধাপে দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। কে কী করবেন, কোন নথি যাচাই করবেন এবং কোথায় ব্যর্থ হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তারও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পুরো ব্যবস্থাকে আনা হচ্ছে ‘কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স চেইন’ বা গুণগত নিরাপত্তা চক্রের আওতায়। প্রথম ধাপে থাকবে কাঁচামালের মান নিশ্চিতকরণ। সরবরাহকারীকে জানাতে হবে ডিম, দুধ, বনরুটি, বিস্কুট বা ফল কোথা থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোনো উৎসের পণ্য নিম্নমানের প্রমাণিত হলে সেই উৎস বাতিল করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপে থাকবে সংরক্ষণাগার ও কারখানার পরিবেশ। স্বাস্থ্যবিধি, যন্ত্রপাতি, কর্মপরিবেশ ও সংরক্ষণব্যবস্থা মানসম্মত কি না, তা নিয়মিত যাচাই করা হবে। সংরক্ষণব্যবস্থার কারণে খাদ্যের মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাচের উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে খাবার উৎপাদনের ক্ষেত্রে ফুড টেকনিশিয়ানের ভূমিকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিটি ব্যাচ উৎপাদনের পর টেকনিশিয়ানকে সনদ দিতে হবে যে খাবারের ওজন, পুষ্টিমান, স্বাস্থ্যবিধি ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া চুক্তি অনুযায়ী হয়েছে। এই সনদ ছাড়া কোনো খাদ্য পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হবে না। সেই সঙ্গে এখন থেকে প্রতিটি ব্যাচের ট্রেসেবিলিটিও (উৎসের সন্ধানযোগ্যতা) নিশ্চিত করা হবে। অর্থাৎ কোন ব্যাচ কখন উৎপাদিত হলো, কোথায় তৈরি হলো, কোন গাড়িতে পাঠানো হলো— সব তথ্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে স্কুল পর্যায়ে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে পাঁচ সদস্যের একটি গ্রহণ কমিটি থাকবে। কমিটির সভাপতি থাকবেন প্রধান শিক্ষক। এছাড়া থাকবেন স্কুল ম্যানেজিং কমিটির একজন সদস্য ও তিনজন মা। মায়েদের উপস্থিতিতে খাবারের সিল, মেয়াদ, গন্ধ, প্যাকেট, পচন বা ফাঙ্গাস আছে কি না, তা সরাসরি যাচাই করা হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, মায়েদের যুক্ত করার পেছনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শিশুদের নিরাপত্তাকে। কারণ একজন মা কখনোই নিজের সন্তানের স্বাস্থ্যের সঙ্গে আপস করবেন না। একই ব্যক্তি যাতে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন না করেন, সে জন্য চালু করা হচ্ছে রোটেশন পদ্ধতি। লটারির মাধ্যমে মায়েরা বাছাই হবেন। কমপক্ষে দুইজন মায়ের উপস্থিতি ছাড়া কোনো খাদ্য গ্রহণ করা যাবে না। তারা আপত্তি তুললে সেটি লিখিতভাবে নথিভুক্ত করতে হবে। এমনকি প্রধান শিক্ষক গ্রহণে সম্মতি দিলেও আপত্তির বিষয়টি রেকর্ডে রাখতে হবে।
নতুন নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, নিম্নমানের খাবার স্কুলে পৌঁছালে তা সঙ্গে সঙ্গে ফেরত দিতে হবে। এক্ষেত্রে সরবরাহকারীকে নিজ খরচে খাবার বদলে দিতে হবে। ‘স্কুলে এসে গেছে, তাই নিতে হবে’— এমন অজুহাত আর চলবে না।
এদিকে খাদ্য সরবরাহে অনিয়ম ঠেকাতে সবচেয়ে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে বিল পরিশোধে। এখন থেকে শুধু ডেলিভারি নয়, বরং ‘গ্রহণযোগ্য ডেলিভারি’র ভিত্তিতে বিল পরিশোধ করা হবে। অভিযোগমুক্ত, যাচাইকৃত ও গ্রহণযোগ্য খাবারের ক্ষেত্রেই কেবল বিল ছাড় হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে রিপোর্ট সংকলনের পর জেলা পর্যায়ে যাচাই হবে। এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ‘নো অবজেকশন’ বা অনাপত্তিপত্র মিললেই বিল পরিশোধ করা হবে। কোনো অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিল আটকে থাকবে।
১ জুনের মধ্যে দিতে হবে সাপ্লাই চেইনের বিস্তারিত তথ্য
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে তরতাজা খাবার পৌঁছে দিতে সরকারের নতুন নির্দেশনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ‘সাপ্লাই চেইন ডিসক্লোজার’। জানা গেছে, রোববার (২৪ মে) থেকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে সব সরবরাহকারীকে পুরো সরবরাহব্যবস্থার তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে থাকবে উপজেলাভিত্তিক সাপ্লাই চেইনের মানচিত্র, কারখানা ও গুদামের ঠিকানা, ডিমের খামার বা দুধ উৎপাদনকারীর তালিকা, পরিবহন যানবাহনের নম্বর, চালকের পরিচয়পত্র, ফুড টেকনিশিয়ানের তথ্য এবং গোপন সাবকন্ট্রাক্ট না থাকার লিখিত ঘোষণা।
সেই সঙ্গে গোপন সাবকন্ট্রাক্ট বা ‘শ্যাডো মিডলম্যান’ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। ফলে এখন থেকে প্রতিটি স্কুলের জন্য একজন নির্দিষ্ট সরবরাহকারীই জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন। একাধিক ব্যক্তি বা গোপন অংশীদারত্বের সুযোগ থাকবে না। অনুমতি ছাড়া ডেলিভারি রুটও পরিবর্তন করা যাবে না। কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে প্রথমে লিখিত সতর্কবার্তা, পরে নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো, কারণ দর্শানোর নোটিশ, আংশিক বা পূর্ণ চুক্তি বাতিল এবং প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বিশেষ কিছু অপরাধকে সরাসরি ‘জিরো টলারেন্স’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— পচা ডিম, ফাঙ্গাস ধরা বিস্কুট, নষ্ট দুধ, মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার, ভেজালের সন্দেহ, ভুয়া সনদ, শিশু অসুস্থ হওয়া, অনুমোদনহীন সাবকন্ট্রাক্ট এবং পরিদর্শনে বাধা দেওয়া। এসব ক্ষেত্রে কোনো ‘থ্রি-স্ট্রাইক’ নীতি প্রযোজ্য হবে না; সরাসরি বিল স্থগিত, তদন্ত, চুক্তি বাতিল এবং কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও প্রমাণভিত্তিক করা হচ্ছে। কোনো সরবরাহকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে নমুনা ল্যাবে পাঠানো হবে এবং রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত পেমেন্ট লক থাকবে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ১ জুনের মধ্যে সরবরাহকারীদের সব তথ্য জমা দিতে হবে। আর ঈদের ছুটির পর স্কুল খোলার পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে সব বিদ্যালয়ে খাবার গ্রহণ কমিটি সক্রিয় করা হবে। এছাড়া ৩০ দিনের মধ্যে সরবরাহকারীদের পারফরম্যান্স র্যাংকিং, অভিযোগ রেজিস্টার, বিল স্থগিতের তালিকা এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ডিজিটাল কাঠামো বা ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী ও মহাপরিচালকের মন্তব্য
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা কার স্বার্থ রক্ষা করব— কন্ট্রাক্টরের (খাবার সরবরাহকারী), না বাচ্চাদের? অবশ্যই শিশুদের স্বার্থ। একটি শিশুর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই। স্কুল ফিডিং যথাযথভাবে বাস্তবায়নে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে।’
মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘আমরা শুধু মৌখিক অভিযোগের ওপর নির্ভর করতে চাই না। কোনো অভিযোগ থাকলে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে, যাতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থাও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়। এই প্রকল্প জনগণের টাকায় পরিচালিত, তাই সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য একটাই— শিশুদের নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা।’
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, বর্তমানে দেশের ১৫১টি উপজেলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু রয়েছে। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প জাতীয় বাজেটের প্রায় এক শতাংশের সমান। এত বড় প্রকল্পে অনিয়ম হলে জনগণের মধ্যে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাসের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার নতুন কিছু নির্দেশনা তৈরি করেছে। এসব নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে (২৪ মে থেকে পরবর্তী সাত কর্মদিবস) সব সরবরাহকারীকে তাদের পূর্ণ সরবরাহব্যবস্থার মানচিত্র জমা দিতে হবে। কোন কারখানা থেকে পণ্য নেওয়া হচ্ছে, কোথা থেকে কীভাবে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে— সব তথ্য স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।’
দূরের জেলা থেকে খাবার সরবরাহের কারণে অনেক ক্ষেত্রে মান ঠিক থাকছে না উল্লেখ করে স্থানীয়ভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যেখানে স্থানীয়ভাবে খাবার পাওয়া যায়, সেখানে তিন জেলা দূর থেকে পণ্য আনার কোনো প্রয়োজন নেই।’
খাদ্যমান নিশ্চিত করতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যোগ্য ফুড টেকনিশিয়ান নিয়োগের নির্দেশ দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এত বড় প্রকল্প পরিচালনা করছেন, অথচ একজন ফুড টেকনিশিয়ান রাখতে পারবেন না, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার নীতিগত ও যৌক্তিক সহযোগিতা করবে। তবে রাস্তা, রুট পরিকল্পনা, সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা সম্পর্কে আগাম পরিকল্পনা করা সরবরাহকারীদেরই দায়িত্ব।