মাছের ঘের, লবণ মাঠ, বলগেট ঘাট ও শত শত একর জমির অবৈধ জবর দখলই তাঁর নেশা এবং পেশা। তিনি হলেন কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার ৯নং উজানটিয়া ওয়ার্ডের মেম্বার জাফর আলম। যিনি বিএনপি নেতা পরিচয় দিয়ে রাজকীয় কায়দায় এসব অপরাধ কর্মকান্ড করায় আওয়ামী দস্যুচক্র দিয়ে।
সে হিসেবে তিনি এসব অপরাধ জগতের অঘোষিত রাজা! তাঁর মাথার ওপরও রয়েছে আর্শীর্বাদের ছায়া। যাকে বলা হয় রাজার রাজা। তিনি হলেন পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি বাহাদুর শাহ। যার প্রভাবে মেম্বার জাফর আলমের অপরাধের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নিতে পারছেন না পুলিশ প্রশাসন।
যার প্রমাণ মিলেছে পেকুয়া থানা পুলিশের মুখেও। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেকুয়া থানা পুলিশের এক এসআই বলেন, মেম্বার জাফর আলমের বিরুদ্ধে মাছের ঘর, লবণ মাঠ, বলগেট ঘাট, অবৈধভাবে জমি জবরদখল, সাগর পথে চোরাচালান-দস্যুতা ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে তিনি।
বাইরে কেন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তারা তো এখন ক্ষমতাসীন। মেম্বার জাফর আলম পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়ন ৯নং ওয়ার্ডের মেম্বার এবং উজানটিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ স¤পাদক। এ কারণে ক্ষুব্দ জনতা মেম্বার জাফর আলমের অপরাধ কর্মকান্ডের বিচারের দাবিতে একের পর এক মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে।
ক্ষুব্দ জনতার তথ্যমতে, মেম্বার জাফর আলম ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চকরিয়ার সাবেক এমপি কুখ্যাত বাইট্টা জাফর ও পেকুয়া অঞ্চলের আলোচিত গরু চোর জাহাঙ্গীর ওরফে গরু জাহাঙ্গীর-এর সহযোগিতায় সাধারণ মানুষের জায়গা-জমি দখল করেছেন। এসব দখলকৃত জমি থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ ওই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছাতেন।
এছাড়া উজানটিয়া ইউনিয়নের করিয়ারদিয়া মৌজায় ছগির মেম্বারের রেজিস্ট্রারভুক্ত প্রায় ৯২ একরের মাছের ঘের দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে গরু জাহাঙ্গীর ও তার লোকজন দিয়ে জবরদখল করে রাখে। এই দখল প্রক্রিয়াও মেম্বার জাফর আলমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর গরু জাহাঙ্গীর আত্নগোপনে চলে গেলে ওই মাছের ঘের দখলে প্রকাশ্যে আসে জাফর আলম মেম্বার।
যেখানে পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি বাহাদুর শাহের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। অথচ ক্ষতিগ্রস্ত ছগির মেম্বারের পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁর ওয়ারিশ গিয়াসউদ্দিন মাস্টার কক্সবাজার জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য ছিলেন।
মেম্বার জাফর আলমের জমি জবর দখলের ঘটনা এখানে শেষ নয়, করিয়ারদিয়া এলাকায় ১২ জনের নামে বন্দোবস্তি থাকা ১২০ একর জমিও সুকৌশলে দখলে নিয়েছেন মেম্বার জাফর আলম। তাদের নিয়োগকৃত মোক্তারকে হুমকি দিয়ে এই জমি জবর দখল করেন।
বন্দোবস্তি প্রাপ্তরা জানান, গত ১২-১৩ বছর আগে তারা করিয়ারদিয়া এলাকায় ১২০ একর জমি বন্দোবস্তি পান। তখন এসব জমি ছিল অনাবাদি। আবাদি করার শর্তে এসব বন্দোবস্তি দেওয়া হয় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। এরপর চাষাবাদ করতে মোক্তার হিসেবে নিযুক্ত করা হয় মোক্তার হোসেন নামে একজনকে। বিগত সময়ে তিনি জমি চাষাবাদ থেকে আয়কৃত অর্থ দিয়ে আসছিল।
কিন্তু ৫ আগষ্টের পর মোক্তার হোসেনকে হুমকি দিয়ে সেই আয়ের অর্থ লুটে নিচ্ছে মেম্বার জাফর আলম। মোক্তার হোসেনও প্রাণভয়ে মেম্বার জাফর আলমের পক্ষ নিয়েছেন। পর্যায়ক্রমে ডাকাতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েছেন মোক্তার হোসেন। তাকে পেকুয়ার মানুষ ডাকাত মোক্তার হিসেবে চিনে।
এছাড়া চকরিয়া উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নের ১নং ঘোনা এলাকায় জাকের হোসেন গং-এর ৫২ একর জমিও গত প্রায় ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাইট্টা জাফরের সঙ্গে মিলিতভাবে দখলে নেয় মেম্বার জাফর আলম। এছাড়াও এ ধরনের আরও বহু মানুষের জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়ভাবে।
শুধু জমি দখল নয়, পেকুয়ার লবণ মাঠ, বলগেট ঘাট দখল করেও চাঁদাবাজি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে মেম্বার জাফর আলমের বিরুদ্ধে। এমনকি সাগর পথে ইয়াবাসহ নিষিদ্ধ চোরাই মালামাল পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সাগরে মাছ ধরা নৌকা ডাকাতির সাথেও জড়িত বলে জানান স্থানীয়রা।
উজানটিয়ার বাসিন্দা করিম উল্লাহ (৬১) বলেন, আওয়ামী লীগ আমল থেকে পেকুয়ায় অপরাধ প্রবণতা বাড়ে। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও অপরাধ কমেনি একটুও। বরং আরও বেড়েছে। মেম্বার জাফর আলম অনেক আগে থেকে বিএনপি করলেও তার অপরাধ চক্রের সহযোগী সব আওয়ামী লীগের দস্যু। যারা এখনো সক্রিয়। পেকুয়ায় অপরাধের মুলে এই মেম্বার জাফর আলম।
বদরখালী এলাকার বাসিন্দা আমিনুর রহমান বলেন, মেম্বার জাফর আলম উজানটিয়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের মেম্বার হলেও বিএনপি নেতা পরিচয়ে পেকুয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রভাব বিস্তার করেছে। চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ এমন কোন অপরাধ নেই তিনি অনুসারি লোক দিয়ে করাচ্ছেন না। ফলে পুরো পেকুয়া অশান্ত হয়ে উঠেছে।
আমিনুর রহমান জানান, মেম্বার জাফর আলমের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ দিলেও কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না পুলিশ প্রশাসন। ফলে নিরূপায় হয়ে ভুক্তভোগীরা সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে একের পর এক মানববন্ধনসহ নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি করছে। তাতেও কোন প্রতিকার মিলছে বলে মনে হচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে মেম্বার জাফর আলমের মুঠোফোনে কল করা হয়। কল রিসিভ করার পর একটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দস্যুরা যদি আমার সহযোগী হয়, তাহলে আমার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করছে এরা কারা?। মানববন্ধনকারীরা তো আওয়ামী লীগের লোক নয়, ওরা তো ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে তো বিএনপিও রয়েছে। যারা অপনার অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে-এ প্রসঙ্গে মেম্বার জাফর আলম বলেন, এ নিয়ে আমি কোন কথা বলতে চাই না। এ কথা বলেই ফোন কল কেটে দেন তিনি।
এ বিষয়ে কথা বলতে পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি বাহাদুর শাহর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। একইভাবে পেকুয়া থানার ওসির মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনিও কল রিসিভ করেননি।
(নোটিশ :- মেম্বার জাফর আলমের অপরাধ কর্মকান্ড নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হলো। দ্বিতীয় পর্বে আসছে ‘‘সাগরে চোরাচালান ও দস্যুতা নিয়ে। প্রিয় পাঠক বিস্তারিত জানতে চোখ রাখুন দৈনিক ঈশানের অনলাইন, মাল্টিমিডিয়া ও পৃন্ট ভার্সনে)