এলপিজির পর দেশের জ্বালানি তেলের বাজারও কব্জায় নিয়ে চায় পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর বসুন্ধরা গ্রুপ। এ বিষয়ে দু‘দিন সময় দিয়ে বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীর কাছে আবেদনের নাম হুকুম জারি করেন মাফিয়া শিল্প গ্রুপটির কর্ণধার সায়েম সোবহান আনভির। আর তাতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রতিষ্ঠান বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্টোলিয়াম করপোরেশন) বিপক্ষে মত দেওয়ায় বেজায় চটেছেন খোদ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী। একপর্যায়ে গত ২৬ জুলাই রাতে হঠাৎ করে বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ২ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জিয়াউল হককে বিপিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।আর দায়িত্ব দেওয়ার পরপরই বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য কমিটি গঠন করে চারদিনের মধ্যে খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এতে ধারণা করা হচ্ছে বসুন্ধরার কব্জায় যাচ্ছে দেশের জ্বালানি তেলের বাজার। আর তাতে চটেছেন জ্বালানি সরবরাহ সংশ্লিষ্ট সবগুলো প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের মতে, দেশের বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় এলপিজি, চিনি, ভোজ্য তেল, পেঁয়াজ কিংবা লবণের বাজারে বিভিন্ন সময়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে টিসিবির মাধ্যমে খোলা বাজারে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণেও সরকারকে উন্মুক্ত বাজারে বিক্রয় কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হচ্ছে।তাদের ভাষ্য, জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ওঠানামা করলেও দেশে কখনো বড় ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়নি। এমনকি গত মার্চে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সরবরাহে চাপ তৈরি হলেও বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগ তা সামাল দিতে সক্ষম হয়। এর বিপরীতে এলপিজি খাতের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সময় সরবরাহ সংকটের অজুহাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হয়েছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ সীমিত থাকায় এখনো দেশের অনেক এলাকায় ভোক্তাদের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্য দিয়ে এলপিজি কিনতে হচ্ছে।জ্বালানি খাতের একাধিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনে করেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বড় অংশ যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে বাজারে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ জ্বালানি তেল দেশের পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান চালিকাশক্তি। এ খাতে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তার প্রভাব পড়বে প্রায় সব পণ্য ও সেবার দামে। একই মত দিয়েছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, বর্তমানে পেট্রোলিয়াম জ্বালানি পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটি বেসরকারি খাতে চলে গেলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ ভোক্তারা। এমন পরিস্থিতিতে শুধু ভোক্তারাই নয়, সরকারও একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু তার পরিবর্তে যদি রাষ্ট্র নিজের দায়িত্ব বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আনভীরের আবেদনে কি আছে? বেসরকারি জ্বালানি নীতিমালার আওতায় ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও ফার্নেস অয়েল আমদানি এবং বিপণনের অনুমতি চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে আবেদন করে বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (বিওজিসিএল)।গত ২৪ মে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীর স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার অংশীদার হওয়ার লক্ষ্যে বিওজিসিএলকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, বিক্রি ও বিপণনের অনুমতি দেওয়া হোক। এ জন্য দু‘দিনের মতে চেয়েছেন আনভীর। যা একেবারে রাষ্ট্রীয় হুকুমের মতো। চিঠিতে বলা হয়, বসুন্ধরা অয়েল প্রায় পাঁচ বছর ধরে নিজস্ব রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করে দেশে জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ করছে। একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয় দেশের জ্বালানির চাহিদা প্রতিবছর ২ থেকে ৪ শতাংশ হারে বাড়ছে। এ ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালে দেশের মোট জ্বালানির চাহিদা প্রায় ৯ থেকে ১০ মিলিয়ন টনে পৌঁছাবে, যার প্রায় পুরোটা আমদানি নির্ভর হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে ডিজেলের।বিপক্ষে মত দেওয়ায় হঠাৎ চেয়ারম্যান অপসারণ : বিপিসির তথ্য মতে, বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বিওজিসিএল বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন ডিজেল, ২ লাখ টন অকটেন, দেড় লাখ টন পেট্রোল এবং ৮ থেকে ১০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আমদানি, বিক্রি ও বিপণনের অনুমতি চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে আবেদন করে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীর।আবেদনটি পর্যালোচনার জন্য বিপিসি ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে এবং মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়। বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একাংশও তখন বিস্ময় ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, পরিশোধিত জ্বালানির বড় অংশ বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে গেলে ভবিষ্যতে বাজারে প্রভাব বিস্তার, কৃত্রিম সংকট কিংবা মূল্য নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে চটে গিয়ে গত ২৬ জুলাই রাতে হঠাৎ করে বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়া হয়। জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার প্রস্তাবের বিপক্ষে মত দেওয়া এবং পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির সরবরাহকারী তালিকাভুক্তির শর্টলিস্টে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত না করায় তিনি চাপের মুখে ছিলেন। পরে ২ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জিয়াউল হককে বিপিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।এরপর বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। চিঠিতে আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে খসড়া নীতিমালা বিভাগে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ নীতিমালার খসড়া তৈরির জন্য বিপিসিকে সময় দেওয়া হয়েছে মাত্র চার দিন।শ্রমিক সংগঠনগুলোর তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ : বিওজিসিএলের আবেদন পর্যালোচনায় বিপিসির কমিটি গঠন এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বিভিন্ন স্মারক ও নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন বাংলাদেশ অয়েল এন্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের নেতারা। এরপর চট্টগ্রাম মহানগরের যমুনা ভবনে বাংলাদেশ অয়েল এন্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের জরুরি সভায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন নেতারা। ফেডারেশনের মহাসচিব মুহাম্মদ এয়াকুব বলেন, বিওজিসিএলের আবেদন অনুমোদনের বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠনই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অশনি সংকেত। দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই খাতকে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি করার ষড়যন্ত্র করা হলে ফেডারেশনের নেতৃত্বে কঠিন আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কায়ছার হামিদ বলেন, তেল চুরি ও সিস্টেম লস-সংক্রান্ত বিষয়ে সম্প্রতি গঠিত কমিটির কার্যপরিধি বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ। তেল চুরি ও সিস্টেম লস বন্ধের পরিবর্তে বিপণন কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের ওপর মনিটরিং ও জবাবদিহির নামে কোনো ধরনের হয়রানির চেষ্টা করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না।স্মারক ও নীতিমালা নিয়েও আপত্তি : ইস্টার্ন রিফাইনারী এমপ্লয়ীজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা বিভিন্ন স্মারকে বিপিসির আওতাধীন কোম্পানিগুলোর আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, এক্স-গ্রেশিয়া ও ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এবং কোম্পানি আইন-১৯৯৪-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর দাবি, এসব নির্দেশনা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন-৯৮ অনুযায়ী শ্রমিকদের যৌথ দর-কষাকষির অধিকারও ক্ষুণ্ন করছে। তিনি এসব শ্রমিকস্বার্থবিরোধী স্মারক অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানান।পদ্মা অয়েল কোম্পানি সিবিএর সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বিপিসি ও এর অধীনস্থ কোম্পানিগুলোর জন্য জ্বালানি বিভাগ থেকে প্রান্তিক সুবিধা-সংক্রান্ত যে নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এর পরিপন্থী। এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়নের কোনো এখতিয়ার জ্বালানি বিভাগের নেই। এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে কোম্পানিগুলোর সিবিএ তা মেনে নেবে না।ইস্টার্ন রিফাইনারী সিবিএর সভাপতি দেওয়ান মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, জ্বালানি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের দাবি বাস্তবায়নে নতুন করে কোনো জটিলতা সৃষ্টি করা হলে তা চরম অসন্তোষ ও উদ্বেগের কারণ হবে। তবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে বিষয়গুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধানে সরকার ও জ্বালানি বিভাগকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।শ্রমিক সংগঠনের তাদের দাবি, বসুন্ধরা একটি মাফিয়া শিল্প গ্রুপ। পতিত ফ্যাসিস্টের দোসর। এই শিল্প গ্রুপ কোনোমতেই দেশের জন্য ভাল কিছু করতে পারে না। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকান্ডগুলো পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করলে ভয়ংকর সত্যতা বেরিয়ে আসবে। দেশে আমদানি করা জ্বালানির চোর সিন্ডিকেট এই শিল্প গ্রুপই নিয়ন্ত্রণ করে। দেশের জ্বালানি বাজার এ শিল্প গ্রুপের হাতে গেলে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ এই খাত ধীরে ধীরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভাবাধীন হয়ে পড়বে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ ভোক্তারা।
১ মাস ৪ দিন আগে
গত ২১ জুলাই বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে সৃষ্ট অগ্নিকান্ডে কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। এতে পরিবহন খাত থেকে শিল্প কারখানা, এমনকি রান্নাবান্নায়ও হাহাকার শুনা যাচ্ছে শুধু।গ্যাসের এই নিম্নচাপে দিন দিন পিষ্ঠ হচ্ছে জনজীবন। ফলে যেকোনো মূল্যে দ্রুত এর সমাধান চান সাধারণ মানুষ। কিন্তু সহজে এই সমস্যা সমাধানের কোন আলামত মিলছে না। ১ আগস্ট থেকে কিছুটা উন্নতির কথা বললেও ১১ আগষ্ট পর্যন্ত গ্যাসের নিম্নচাপ স্বাভাবিক হচ্ছে না।এমনটাই জানিয়েছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস বিতরণের দায়িত্বে থাকা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল) লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ) মো. রফিক খান। তিনি বলেন, মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকান্ড ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে।এতে বড় ধাক্কা লেগেছে আমদানিকৃত এলএনজি নির্ভর চট্টগ্রামে। দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২২৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট। যা প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ কম।এর ফলে নগরীর শিল্প, বিদ্যুৎ, সার কারখানা, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে আবাসিক খাত পর্যন্ত সর্বত্র গ্যাসের সংকট চলছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। গ্যাসের অভাবকে পুঁজি করে সিএনজিচালিত টেক্সি ভাড়া ইচ্ছেমতো হাঁকা হচ্ছে।নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রান্নার চুলায়ও গ্যাসের চাপ কমে গেছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে রপ্তানিমুখী শিল্প, উৎপাদন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।মো. রফিক খান বলেন, গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) বন্ধ রয়েছে। কেবল কাফকোতে সার উৎপাদন চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় কাটছাঁট করা হয়েছে। বর্তমানে শুধু শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সীমিত আকারে উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। এই কেন্দ্রে দৈনিক ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়ছে। চট্টগ্রামে বিদ্যুতের লোডশেডিং বিরক্তিকর পর্যায়ে ঠেকেছে।কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ ও সার খাতের জন্য গ্যাস বরাদ্দ দেওয়ার পর অবশিষ্ট প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিয়ে শিল্প, বাণিজ্যিক, আবাসিক এবং সিএনজি সব খাতের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এত অল্প গ্যাস দিয়ে পুরো নেটওয়ার্কে চাপ ধরে রাখা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে দূরবর্তী এলাকা তো বটেই, নগরীর কেন্দ্রীয় এলাকাতেও গ্যাসের চাপ কমে গেছে।চট্টগ্রামের একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় বয়লার স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে স্টিল, রি-রোলিং, কাচ, সিরামিক, টেক্সটাইল, ¯িপনিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিভিন্ন মাঝারি শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পে সময়মতো উৎপাদন শেষ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতেও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। অনেক স্টেশন পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। এর প্রভাব ইতোমধ্যে গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন এবং নগরজীবনে পড়তে শুরু করেছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। গ্যাস সংকটের কারণে ইতোমধ্যে টেক্সিগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করছে।কেজিডিসিএলের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, ভাসমান টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা কম। বরং জাতীয় চাহিদা বিবেচনায় অন্য অঞ্চলে সরবরাহ বাড়াতে হলে চট্টগ্রামে আরো কাটছাঁট করতে হতে পারে। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় গ্যাস সরবরাহ অগ্রাধিকার দিতে হলে চট্টগ্রামের শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করবে।ওই কর্মকতা বলেন, স্বাভাবিক অবস্থায়ও চট্টগ্রামের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে ২৭০-২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। সংকট শুরুর আগেও চট্টগ্রামে ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেয়া হচ্ছিল। বর্তমানে আরো কমিয়ে ২২৫-২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট করা হয়েছে। বুধবার থেকে সরবরাহ ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন না বাড়লে এবং এলএনজি আমদানি ও রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা আরো সম্প্রসারণ না করলে গ্যাস সংকট সহজে কাটবে না। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমছে। সেই ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লেও এলএনজির উচ্চমূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মহেশখালীর একটি টার্মিনালে সাময়িক দুর্ঘটনা যে পুরো দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিতে পারে, বর্তমান পরিস্থিতি তারই উদাহরণ।শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের রাজধানীতেও প্রভাব পড়েছে গ্যাস সংকটের। তিতাসের আওতাধীন রাজধানীতে প্রতিদিন ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ পাচ্ছে। এ কারণে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় বাসা বাড়িতে রান্নায় বিঘ্ন ঘটছে। কোথাও কোথাও একেবারেই চাপ কম থাকায় বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে নগরবাসীকে।তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি বলছে, তিতাসের আওতায় দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ১৫৫ কোটি ঘনফুটের মত। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন রাজধানী ও আশেপাশের জেলায় সব শ্রেণির গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপ বিরাজ করবে।ভোক্তাদের ভাষ্যগ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর গ্যাস পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদা অনুসারে গ্যাস পাচ্ছেন না বিভিন্ন পরিবহন চালক-শ্রমিকরা। আয় সীমিত হয়ে যাওয়ায় পরিবহনে নির্ভর দিন এনে দিন খাওয়া মানুষেরা তলিয়ে যাচ্ছেন চরম আর্থিক সংকটে।বুধবার (২৯ জুলাই) বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগরীর টাইগারপাস এলাকায় ইন্ট্রাকো ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার জন্য লাইনে দাড়িয়ে থাকা সিএনজি অটোরিক্সা চালক মনজুরুল ইসলামের সাথে গ্যাস নিয়ে কথা বলতেই হাতে চোখের জল চেপে ধরেন তিনি।তিনি বলেন, গত কয়েক দিন ধরে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় ৫-৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও গ্যাস ছাড়াই ফিরে যেতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি দৈনিক আয়ও কমে গেছে। সংসার চলবে কীভাবে সে চিন্তায় হয়তো মরেই যাব। তিনি গ্যাস সংকট দ্রুত নিরসনের দাবি জানান।রাইড শেয়ারিংয়ে ভাড়ায় কার চালান বহদ্দারহাট এলাকার নাছির উদ্দিন। এক সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকটে নাকাল নাছির উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামে অনেক পাম্প, কিন্তু বেশিরভাগই বন্ধ। যেগুলোতে আছে, চাপ খুব কম। সে কারণে সিলিন্ডারের অর্ধেক পরিমাণও গ্যাস ঢুকছে না।হালিশহর এলাকার নাজমা বলেন, গত একসপ্তাহ ধরে চুলাই গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে, কোনো রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। রাত নয়টার পর গ্যাস এলেও শুধু ভাত রান্না করতেই প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগছে। অন্য কোনো রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না।ডবলমুরিং থানার মনসুরাবাদের গৃহিণী সাইরা বেগম বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে বাজার থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এভাবে আর কত দিন চলা যায়?এদিকে রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছেন বলে জানা গেছে। প্রায় ২০ দিন ধরে সেখানে গ্যাস-সংকটে আছেন তাঁরা। বাসাবাড়িতে কেউ কেউ বিদ্যুৎ-চালিত চুলা কিনে রান্নাবান্নার কাজ সারছেন। নিম্ন আয়ের মানুষ মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্না করছেন বলে জানাচ্ছেন তারা।এছাড়া ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা ও বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায়ও দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকছে না। কোথাও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকছে যে, রান্না করাই সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার ও এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছে। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন পরদিনের জন্য রান্না সেরে রাখছেন।ভোগান্তির চিত্র রাজধানীর গ্যাস পাম্পগুলোতেও। ফিলিং স্টেশনের বাইরে যানবাহনের লম্বা সারি। তিন থেকে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না চালক-শ্রমিকরা। কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ভাড়ায় চালিত গাড়ি চালকরা। ফলে পুরো পরিবহনখাতই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।গ্যাস সংকটে ঢাকার রাস্তায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল কমে গেছে, বেড়ে গেছে ভাড়া। আবদুস সামাদ নামে এক চালক বলেন, আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগতেছে পাম্পেই। তাও যে গ্যাস ঢুকে, তাতে আধা বেলা গাড়ি চালান যাচ্ছে না। এজন্য ড্রাইভাররা গাড়িই বাইর করতেছে না। খাব কি? ভাড়া তো বেশি চাওয়া লাগবেই।ভুক্তভোগীরা বলছেন, দুই-তিন মাস আগেও জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এমন তামাশা করা হয়েছিল। পরে সেই তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এখন কৃত্রিমভাবে গ্যাস সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর কোনো অপচেষ্টা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বলেন, লাইনে আমাদের দেওয়ার কথা ১৫ পিএসআই (পাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চ) চাপের গ্যাস। সেখানে আমাদের তিন থেকে পাঁচ পিএসআই পর্যন্ত দেওয়া হয়।তিনি বলেন, লাইনে ১৫ পিএসআই চাপের গ্যাস থাকলে আমাদের মেশিনগুলো ঘণ্টায় ৫০০ কিউবিক মিটার গ্যাস কমপ্রেস করতে পারে। আর আমরা গাড়িতে গ্যাস ডেলিভারি দেই তিন হাজার পিএসআই প্রেশারে। ইনপুটে পিএসআই যত কমবে, আউটপুটও তত কম আসবে।ব্যবসায়ীদের ভাষ্যচট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, কারখানায় ৭৫ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে সমস্যা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রয়াদেশের পণ্য সরবরাহ করতে না পারার ঝুঁকিও আছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিল হতে পারে।তিনি বলেন, চট্টগ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে অর্ধ লাখ শিল্প-কারখানা রয়েছে, যার বড় অংশ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন প্রায় ৬০-৭০ লাখ শ্রমিক। এক সপ্তাহ ধরে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়েছে, কোথাও শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।কবির ষ্টিলের পরিচালক তানজির হোসেন বলেন, তিন থেকে চার পিএসআই গ্যাস সরবরাহ থাকলে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়। কিন্তু বর্তমানে গ্যাসের চাপ এত কম যে শ্রমিক ও অপারেটরদের অধিকাংশ সময় বসে থাকতে হচ্ছে। উৎপাদন কমেছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত।বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পরিচালক খোরশেদ আলম বলেন, সব মিলকারখানা বন্ধ প্রায়। কোনো কোনো এলাকায় গ্যাসের সঙ্গে বিদ্যুৎও নেই। কত দিন থাকবে না, সেটা সরকার ঘোষণা দিতে পারে। তাহলে শ্রমিকদের বসিয়ে না রেখে ছুটি দেওয়া যায়।মেরামতের আশাপেট্রোবাংলা এবং রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কো¤পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল স্থানীয় কারিগরি দলের সাথে মিলে এর মেরামত কাজ শুরু করেছে। টার্মিনালের দুটি বয়লারের মধ্যে আগুনে একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অক্ষত বয়লারটি ৪-৫ দিনের মধ্যে চালু করা সম্ভব হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক আরও প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যাবে। তাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়বে। তবে টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত হয়ে সচল না হওয়া পর্যন্ত এবং জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বাসাবাড়ি, সিএনজি স্টেশন ও শিল্প-কারখানার এই সংকট স¤পূর্ণ কাটবে না। এতে আরও কিছুটা সময় লেগে যেতে পারে।সূত্র মতে, এই দুর্ঘটনার কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন (৪৫ কোটি) ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। গ্যাসের অভাবে চট্টগ্রাম ও ঢাকার সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া ও মানিকগঞ্জের প্রায় ২০০টিরও বেশি টেক্সটাইল, স্টিল ও সিরামিক কারখানার উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ ১,০০০ মিলিয়ন থেকে কমিয়ে ৭০০ মিলিয়নে নামানো হয়েছে, যার ফলে দেশজুড়ে লোডশেডিং বাড়ছে।একই সঙ্গে ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, বাড্ডা ও খিলগাঁওসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় দিনের বেলা রান্নার গ্যাস থাকছে না। সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ ১-২ পিএসআই-এ নেমে আসায় যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে এবং অনেক স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে।এ প্রসঙ্গে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড-এর উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ কবির বলেন, দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল চালু রয়েছে। সাধারণত এসব টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হতো। তবে আকস্মিক কারিগরি ত্রুটির কারণে বর্তমানে সরবরাহ কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। ত্রুটি সারানোর কাজ চলমান আছে। আশা করছি শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।তবে ভিন্নমত পোষণ করেছেন মহেশখালী এলএনজি টার্মিনাল সংশ্লিষ্ট অনেকই। তাদের ভাষ্য, মহেশখালীতে স্থাপিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি এবং অপরটি পরিচালনা করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানি। এক সপ্তাহ আগে এক্সিলারেট পরিচালিত টার্মিনালের একটি বয়লারে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এরপর পুরো টার্মিনালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের চেষ্টা করেও সফল হননি। বিদেশ থেকে প্রকৌশলী এনেও চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কাজ হয়নি। কবে নাগাদ টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, টার্মিনালটিতে দুটি বয়লার রয়েছে। আগুনে একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যটি সচল করা গেলে অন্তত ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। প্রকৌশলীরা সেটি চালুর চেষ্টা করছেন। আগামী ১ আগস্ট নাগাদ ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি ঠিক হতে পারে। বিদেশ থেকে বেশ কিছু যন্ত্রপাতি আনা হচ্ছে। ওগুলো লাগানো হলে একটি বয়লার চালু করে অন্তত ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে টার্মিনালটি। তবে টার্মিনালটি পুরোপুরি কার্যকর হতে আগামী ১১ আগস্ট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে ১১ আগস্টের আগে চট্টগ্রামসহ দেশে গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ আসার সুযোগ নেই।বিশেষজ্ঞদের মতামতবিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্যাস খাত দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিতে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উত্তাল সমুদ্র বা যেকোনো দুর্ঘটনায় টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হতে পারে। অতীতে একাধিকবার এমন ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হয়ে সামিটের টার্মিনালটি ২০২৪ সালে সাড়ে তিন মাস গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছিল। আর একটি টার্মিনাল স্থলভাগে করা হলে এখনকার পরিস্থিতি এড়ানো যেত।এ ছাড়া যেকোনো সময় আমদানি ব্যাহত হতে পারে। বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০২২ সালের জুলাই থেকে টানা ৭ মাস খোলাবাজারে এলএনজি কেনেনি সরকার। আমদানি নির্ভরতার এ ঝুঁকি থাকবেই।বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল ইলাহী চৌধুরী বলেন, গত আড়াই দশকের অবহেলায় আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিদেশ নির্ভর হয়ে জ্বালানি খাত চলবে না। গ্যাস অনুসন্ধানে অনেক কম কূপ খনন করে বেশি সফলতার পরও অবহেলা করা হয়েছে। সারা দেশে গ্যাসের অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। এ ছাড়া দ্রুত কূপ সংস্কার করে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে হবে।উল্লেখ্য, দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এবং এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতির চাপ সামাল দিতে বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ কমানো হচ্ছে। তবে চট্টগ্রাম যেহেতু নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনের গ্যাস দেওয়া হয় না, পুরোপুরি এলএনজি নির্ভর, তাই এখানকার সংকট তুলনামূলকভাবে বেশি।
১ মাস ১৯ দিন আগে
মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লেগে কারিগরি সমস্যার কারণে বন্ধ রয়েছে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ। এতে পরিবহন খাত থেকে শিল্প কারখানা, এমনকি রান্নাবান্নায়ও প্রভাব পড়েছে। গৃহিণীদের নির্ভর করতে হচ্ছে ইলেকক্ট্রিক চুলার উপর। ফলে সরকারি গ্যাস সংযোগ খরচের পাশাপাশি তাদের গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। অন্যদিকে গ্যাস পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদা অনুসারে গ্যাস পাচ্ছেন না বিভিন্ন পরিবহন চালক-শ্রমিকরা। আয় সীমিত হয়ে যাওয়ায় পরিবহনে নির্ভর করে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষেরা তলিয়ে যাচ্ছেন চরম আর্থিক সংকটে। গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলছে তীব্র গ্যাস সংকট। চলছে হাহাকার। চলমান গ্যাস সংকটে দিন যতই গড়াচ্ছে ততই বাড়ছে ভোগান্তি। জীবনযাত্রা প্রায় অচল হয়ে যাচ্ছে। ফলে যেকোনো মূল্যে দ্রুত এর সমাধান চান সবাই। তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, কৃত্রিমভাবে গ্যাস সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর কোনো অপচেষ্টা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে সরকারকে।তবে সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাস সংকটের কারণ হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কথা বলা হচ্ছে। তাতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে গেছে। তিতাসের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ১৫৫ কোটি ঘনফুটের মত। সে কারণে পাম্পে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ থাকছে না।তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি বলছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন রাজধানী ও আশেপাশের জেলায় সব শ্রেণির গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপ বিরাজ করবে।গ্যাসের চাপ না থাকায় বাসা বাড়িতেও রান্নায় বিঘ্ন ঘটছে। কোথাও কোথাও একেবারেই চাপ কম থাকায় বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে নগরবাসীকে। ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছেন মোহাম্মদপুরের মানুষ। প্রায় ২০ দিন ধরে গ্যাস-সংকটে আছেন তাঁরা। শুরুতে জলাবদ্ধতার কারণে পাইপলাইনে পানি ঢুকে গ্যাস বন্ধ হয়ে যায় বেশ কিছু আবাসিক এলাকায়। শেখেরটেক এলাকায় এখনো এই সমস্যা কাটেনি। এর মধ্যে গ্যাসের সরবরাহ কমায় অন্যান্য এলাকাতেও গ্যাসের চাপ কমে গেছে। বাসাবাড়িতে কেউ কেউ বিদ্যুৎ-চালিত চুলা কিনছেন। আর নিম্ন আয়ের মানুষ মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্নার চেষ্টা করছেন। ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা ও বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায়ও দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকছে না। কোথাও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকছে যে, রান্না করাই সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার ও এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছে। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন পরদিনের জন্য রান্না সেরে রাখছেন।মনসুরাবাদের গৃহিণী সাইরা বেগম বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে বাজার থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এভাবে আর কত দিন চলা যায়? মালিবাগের আফওয়া নাজমা বলেন, সকাল থেকে গ্যাসের চাপ এতটাই কম ছিল যে, কোনো রান্না করা সম্ভব হয়নি। রাত নয়টার পর গ্যাস এলেও শুধু ভাত রান্না করতেই প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগেছে। অন্য কোনো রান্না করা সম্ভব হয়নি। কাঁঠালবাগানের সুফিয়া জান্নাত বলেন, দুপুরে প্রায় এক ঘণ্টা চুলায় কড়াই বসিয়ে রেখেও তেল গরম করা যায়নি। ছোট শিশুর জন্য সময়মতো খাবার তৈরি করতে না পেরে প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে।চলমান গ্যাস সংকটে ভোগান্তির চিত্র রাজধানীর গ্যাস পাম্পগুলোতেও। ফিলিং স্টেশনের বাইরে যানবাহনের লম্বা সারি। তিন থেকে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না চালক-শ্রমিকরা। কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ভাড়ায় চালিত গাড়ি চালকরা। ফলে পুরো পরিবহনখাতই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্পগুলোও। দ্রুত সমাধানের আকুতি পাম্প শ্রমিকদেরও। তবে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, এলএনজি সরবরাহ নির্বিঘ্ন হলে এ সংকট কেটে যাবে।গত সোমবার ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকটি পাম্পে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় গ্যাস বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। যেগুলো খোলা আছে, সেগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদা মোতাবেক গ্যাস পাচ্ছেন না সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালকরা। পাম্পগুলো থেকে মাত্র ২০০ টাকার গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন এভাবে দিনের অর্ধেক সময় অলস ব্যয় করে গাড়ির জমা ও পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। টানা এই সংকটে ক্রমান্বয়ে ভোগান্তি বাড়ছে যানবাহন নির্ভর অন্য কর্মজীবীরাও। তারা বলেন, গ্যাসের জন্য পাম্পের বাইরে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের। তবুও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না তারা। এতে ফের এসে গ্যাসের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরা বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় আয় রোজগারে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে তাদের। গ্যাসের অভাবে ভাড়ার গাড়ি চালাতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা।পাম্পের কর্মচারীরাও বলেন, চাহিদা অনুসারে গ্যাস দেয়ার মতো মজুদ নেই তাদের কাছে। তবে স্বল্প পরিমাণে সারাদিনই গ্যাস সরবরাহ করতে পারবেন তারা। আর কর্তৃপক্ষ বলছে, সরবরাহ কমে আসায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। আর্থিক ক্ষতি এড়াতে পাম্প বন্ধও রাখতে হচ্ছে। তবে সরবরাহ বাড়লে এ সংকট কেটে যাবে। একজন পাম্প কর্মচারি বলেন, যুদ্ধের কারণে বাইরে থেকে এলএনজি খুব একটা আসছে না। আর বর্তমানে বৈশ্বিক বৈষম্যের কারণে একটু কম আনা হচ্ছে। যার জন্য হয়তো প্রেশারটা একটু কম পাচ্ছে। যদি এলএনজি ঠিকমতো আসতে পারে, তাহলে আপনার প্রেশার ঠিকমতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে, আশা রাখি।’রাইড শেয়ারিংয়ে ভাড়ায় গাড়ি চালান গাবতলী এলাকার নাছির উদ্দিন। তিনদিন ধরে গ্যাস সংকটে নাকাল নাছির উদ্দিন বলেন, গাবতলীতে অনেক পাম্প, কিন্তু বেশিরভাগই বন্ধ। তার ভাষ্য, শুধু গাবতলীই নয়, বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশনে ‘গ্যাস নেই’। যেগুলোতে আছে, চাপ খুব কম। সে কারণে সিলিন্ডারের অর্ধেক পরিমাণও গ্যাাস ঢুকছে না।তিনি বলেন, ‘সাভার এলাকার পাম্পগুলাও সব বন্ধ। আজকে একটা ট্রিপ নিয়ে গেছিলাম ডেমরা। স্টাফ কোয়ার্টারে (পাম্পে) লাইনে দিয়া দাঁড়াইতে গেলাম। দেখি বিশাল সিরিয়াল। কিছুক্ষণ পর পাম্প এমনিই বন্ধ হবে। বাধ্য হয়ে খালি ট্যাংক নিয়াই এখন বাসার দিকে রওনা দিছি।’কল্যাণপুরের হাফিজা সিএনজি পাম্পের কর্মী ফিরোজ বলেন, ‘সারাদিন কমপ্রেশর মেশিন চালাইয়াও প্রেশার উঠতাছে না। লাইনে গ্যাসই নাই।’এদিকে গ্যাস সংকটে ঢাকার রাস্তায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল কমে গেছে, বেড়ে গেছে ভাড়া। চালক জহির মোল্লা বলেন, ‘আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগতেছে পাম্পেই। তাও যে গ্যাস ঢুকে, তাতে আধা বেলা গাড়ি চালান যাচ্ছে না। এজন্য ড্রাইভাররা গাড়িই বাইর করতেছে না।’ বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বলেন, লাইনে আমাদের দেওয়ার কথা ১৫ পিএসআই (পাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চ) চাপের গ্যাস। সেখানে আমাদের তিন থেকে পাঁচ পিএসআই পর্যন্ত দেওয়া হয়। ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় আমরা কখনো ১০ থেকে ১১ পিএসআই চাপের গ্যাস পাই। এখন গ্যাস একেবারেই জিরো বলা যায়।’ তিনি বলেন, ‘লাইনে ১৫ পিএসআই চাপের গ্যাস থাকলে আমাদের মেশিনগুলো ঘণ্টায় ৫০০ কিউবিক মিটার গ্যাস কমপ্রেস করতে পারে। আর আমরা গাড়িতে গ্যাস ডেলিভারি দেই তিন হাজার পিএসআই প্রেশারে। ইনপুটে পিএসআই যত কমবে, আউটপুটও তত কম আসবে।নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি রাশিদুল হাসান বলেন, কারখানায় ৭৫ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে সমস্যা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রয়াদেশের পণ্য সরবরাহ করতে না পারার ঝুঁকিও আছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিল হতে পারে। গাজীপুরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে, যার বড় অংশ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক। এক সপ্তাহ ধরে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়েছে, কোথাও শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।গাজীপুরের সাদমা গ্রুপের পরিচালক সোহেল রানা বলেন, তিন থেকে চার পিএসআই গ্যাস সরবরাহ থাকলে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়। কিন্তু বর্তমানে গ্যাসের চাপ এত কম যে শ্রমিক ও অপারেটরদের অধিকাংশ সময় বসে থাকতে হচ্ছে।উৎপাদন কমেছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পরিচালক খোরশেদ আলম বলেন, সব মিলকারখানা বন্ধ প্রায়। কোনো কোনো এলাকায় গ্যাসের সঙ্গে বিদ্যুৎও নেই। কত দিন থাকবে না, সেটা সরকার ঘোষণা দিতে পারে। তাহলে শ্রমিকদের বসিয়ে না রেখে ছুটি দেওয়া যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের গ্যাস খাত দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিতে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উত্তাল সমুদ্র বা যেকোনো দুর্ঘটনায় টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হতে পারে। অতীতে একাধিকবার এমন ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হয়ে সামিটের টার্মিনালটি ২০২৪ সালে সাড়ে তিন মাস গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছিল। আর একটি টার্মিনাল স্থলভাগে করা হলে এখনকার পরিস্থিতি এড়ানো যেত। এ ছাড়া যেকোনো সময় আমদানি ব্যাহত হতে পারে। বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০২২ সালের জুলাই থেকে টানা ৭ মাস খোলাবাজারে এলএনজি কেনেনি সরকার। আমদানিনির্ভরতার এ ঝুঁকি থাকবেই।বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল ইলাহী চৌধুরী বলেন, গত আড়াই দশকের অবহেলায় আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিদেশনির্ভর হয়ে জ্বালানি খাত চলবে না। গ্যাস অনুসন্ধানে অনেক কম কূপ খনন করে বেশি সফলতার পরও অবহেলা করা হয়েছে। সারা দেশে গ্যাসের অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। এ ছাড়া দ্রুত কূপ সংস্কার করে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে হবে।
১ মাস ২১ দিন আগে
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উপব্যবস্থাপক ও প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের সাবেক একান্ত সচিব (পিএস) মো. আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ গড়ে তোলার তথ্য মিলেছে। যা বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য মিলাতে এসব সম্পদের বড় অংশ স্ত্রী, মা-বাবা ও শ্বশুরের নামে কিনেছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর পল্লবী সেকশন-৬-এর ৮ নম্বর সড়কের সি-ব্লকের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় প্রায় ১ হাজার ১৬০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে আহম্মদুল্লাহর। এছাড়া আদাবরে একটি প্লট, মোহাম্মদপুরে আরেকটি ফ্ল্যাট এবং কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে তার স্ত্রী নুসরাত জেবিন সিনথীর নামে সাড়ে তিন কাঠা জমির ওপর আটতলা ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে।দলিল সূত্র মতে, ২০২১ সালের ১১ নভেম্বর জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যবসায়ী আবুল বশর আবুর কাছ থেকে প্লটটি ক্রয় করা হয়। দলিলে জমির মূল্য ৩০ লাখ ৯৬ হাজার টাকা উল্লেখ থাকলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে প্লটটির বাজারমূল্য এক কোটি টাকার চেয়েও বেশি। এছাড়া আদাবরের একটি প্লট প্রথমে আহম্মদুল্লাহ তার শ্বশুর অলিউল হকের নামে কিনে পরে সেটি স্ত্রীর নামে হস্তান্তর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বরিশালের ঝালকাঠী সদর উপজেলার দিবাকরকাঠী গ্রামে তিনি একটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ওই এলাকায় তার ১০ একরেরও বেশি জমি রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এছাড়া বরিশাল শহরে একটি ফ্ল্যাট এবং উজিরপুর কলেজসংলগ্ন এলাকায় জমি কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে।অভিযোগ রয়েছে, আহম্মদুল্লাহর স্ত্রী ঢাকা মেট্রো-গ ৪৩-৪৭৬৯ নম্বরের গাড়িটি ব্যক্তিগত হলেও সামনে সরকারি লোগো ব্যবহার করেন। অন্যদিকে আহম্মদুল্লাহ নিজেও দীর্ঘদিন বিপিসি চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেছেন বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, প্রতি মাসে পল্লবীর বাসভবনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গাড়িভর্তি উপহারসামগ্রী নিয়ে আসতেন। বিষয়টি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিপিসির অধীনস্থ আটটি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ক্রয় ও প্রশাসনিক ফাইল চেয়ারম্যানের অনুমোদনের আগে আহম্মদুল্লাহর মাধ্যমে যেত। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফাইল আটকে রেখে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে কমিশন আদায় করতেন তিনি।এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি জাহাজে জ্বালানি সরবরাহকারী (বাংকার) ডিলারদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বেসরকারি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শত শত কোটি টাকার বিল দ্রুত অনুমোদনের বিনিময়েও তিনি আর্থিক সুবিধা নিতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।বিটুমিন বিতরণ, বিদেশি জাহাজের এলসি পেমেন্ট এবং ফিলিং স্টেশন অনুমোদনের ফাইলেও অর্থ লেনদেন ছাড়া ফাইল চেয়ারম্যানের টেবিলে না যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মাদারীপুরের শিবচরে একটি ফিলিং স্টেশনের অনুমোদনের ফাইল আটকে রেখে প্রায় ছয় লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।আহম্মদুল্লাহ ২০১৯ সালে চাকরির আবেদনে নিজের স্থায়ী ঠিকানা গোপন করে ঢাকার ঠিকানা ব্যবহার করেন। বিপিসির বিধিমালা অনুযায়ী চেয়ারম্যানের একান্ত সহকারীর পদটি নবম গ্রেডের হলেও তিনি ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা হয়েও টানা সাড়ে ছয় বছর ওই পদে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় বরিশাল অঞ্চলের লোকজনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে একটি প্রভাববলয় গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, বিপিসির ঢাকা কার্যালয় ও রেস্ট হাউসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বরিশাল অঞ্চলের লোকজনের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। ২০২১ সালে বিপিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ আহম্মদুল্লাহকে চট্টগ্রামে বদলির আদেশ দেন। তবে মাত্র একদিনের মাথায় সেই আদেশ বাতিল হয় এবং তিনি পুনরায় পিএস হিসেবে দায়িত্বে ফিরে আসেন।এদিকে তার অনিয়মের প্রতিবাদ করায় বিপিসির ঢাকা রেস্ট হাউসের ইনচার্জ মো. শফিউল ইসলাম চাকরি হারান বলেও অভিযোগ রয়েছে। গত ১ মার্চ বিপিসি চেয়ারম্যানের সাবেক পিএস কে এম রিয়াজ রহমান জ্বালানি উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগে আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংকে স্বজনদের চাকরি দেওয়ার বিনিময়ে বিপিসির এফডিআর ও এসএনডি হিসাব স্থানান্তরের অভিযোগ তোলেন।অভিযোগে বলা হয়, তার দায়িত্বকালে বিপিসির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে বিনিয়োগ করা হয়। এছাড়া ডিপো ইনচার্জদের বদলির হুমকি দিয়ে মাসোহারা আদায়, তদন্ত প্রতিবেদনে জালিয়াতি এবং ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিয়োগ-বাণিজ্যে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।বিপিসির উপব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. ইসতিয়াক হোসেন স্বাক্ষরিত একটি প্রত্যয়নপত্রে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আপ্যায়ন, টিএ/ডিএ ও জ্বালানি বিল বাবদ আহম্মদুল্লাহকে ৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলতে আহম্মদুল্লাহর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে স্ত্রী নুসরাত জেবিন সিনথী জমি ও ভবনের মালিকানার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ভবন নির্মাণে তিনি ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন।
১ মাস ২৫ দিন আগে
দূর্নীতি যেখানে গেড়ে বসে, সেখানে পরতে পরতে বাসা বাঁধে দূর্নীতি। এরপরও দূর্নীতি চোখে পড়ে না সংশ্লিষ্টদের। নিজেদের মনে করা হয় নিরেট স্বচ্ছ। বাকী সব বোকা। দূর্নীতির এমন ফাটল দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে ভিজে সয়লাব বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সদ্য নির্মিত নতুন সদর দপ্তরের পাঁচতলা ভবন। ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটির অফিস কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিনেই দেয়াল চুঁইয়ে বৃষ্টির পানি কক্ষের ভেতরে ঢুকে ভিজে গেল গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। আর পরিস্থিতি সামাল দিতে ত্রিপল দিয়ে বাইরের অংশ ঢেকে রাখতে হল সংস্থাটিকে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে ভবনটির নির্মাণ কাজের কারসাজি নিয়ে।সূত্র মতে, চট্টগ্রাম মহানগরীর সার্সন রোডের জয়পাহাড় কেটে শুরু করা হয় পাঁচতলা এই ভবন। নবনির্মিত এই ভবনে রোববার (১২ জুলাই) থেকে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম দিনেই বিভিন্ন কক্ষে পানি ঢুকে কিছু কাগজপত্র নষ্ট হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা ভবনের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।এর আগে গত ৮ জুলাই সল্টগোলার বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) ভবন থেকে এই ভবনে অফিস স্থানান্তর করা হয়। শুক্রবার (১০ জুলাই) মিলাদ আয়োজনের পর রোববার থেকে সেখানে দাপ্তরিক কাজ শুরু হয়। সেদিনেই নামে ঝুম বৃষ্টি। ফলে ভবনটির দেয়াল চুঁইয়ে পানি ঢুকে দূর্নীতি ও অনিয়মের ফাটলে। বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিপিসির সদর দপ্তর নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ও সংস্থাটির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম-পরিকল্পনা) মো. আপেল মামুন। তিনি নিজের অফিস কক্ষে পানি ঢোকার বিষয়টিও সরেজমিনে দেখান।তবে কাজে কোন কারসাজি হয়নি দাবি করে তিনি জানান, জানালায় একপ্রকার গাম না দেওয়ায় ভবনে পানি ঢুকেছে। এর আগে ভবনটির কয়েকটি জায়গায় ফাটল দেখা দিলে পুটিং দিয়ে তা মেরামত করা হয়। তবে এগুলো বড় ধরনের কোনো ফাটল নয় এবং নির্মাণকাজের সময় ছোটখাটো ফাটল দেখা দিতেই পারে বলে জানা আপেল মামুন।ভবনের নির্মাণসামগ্রী ও কাজের মান নিয়ে কোনো সমস্যা নেই দাবি করে তিনি বলেন, গত বছর জয়পাহাড় এলাকায় স্টিল স্ট্রাকচারের পাঁচতলা এই ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড করপোরেশন। শুরুর দিকে পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠলেও পরে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।বিপিসি সূত্র জানায়, দেশের জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ ও বিপণনের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯০ সাল থেকে চট্টগ্রামে ভাড়া ভবনে সদর দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। প্রথমে আগ্রাবাদের হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের ভবন এবং পরে ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ভবনে কার্যক্রম চলছিল। দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর নিজস্ব স্থায়ী সদর দপ্তর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছর জয়পাহাড় এলাকায় স্টিল স্ট্রাকচারে নির্মিত পাঁচতলা ভবনের কাজ শুরু হয় এবং নির্মাণের দায়িত্ব পায় ইউনাইটেড করপোরেশন। নির্মাণের শুরুতে পাহাড় কাটার অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়।নতুন এই ভবন থেকেই বিপিসির সব প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা। প্রায় ১৮০ জন কর্মকর্তা–কর্মচারী এখানে দাপ্তরিক কাজ করবেন। কিন্তু উদ্বোধনের পরদিনই ভবনে পানি প্রবেশের ঘটনায় শুধু কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মধ্যেই নয়, সংশ্লিষ্ট মহলেও ভবনটির নির্মাণমান, তদারকি এবং কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তারা বলেন, বিপুল সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনায় কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিনেই এ ধরনের সমস্যা দেখা দেওয়া উদ্বেগজনক এবং বিষয়টি নিরপেক্ষ কারিগরি তদন্তের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলেও তারা মন্তব্য করেন। প্রসঙ্গত, বিপিসি বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। সংস্থাটির নিয়ন্ত্রণাধীন পদ্মা অয়েল কোম্পানি, যমুনা অয়েল কোম্পানি ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম, স্টান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েলের মাধ্যমে এসব তেল বাজারজাত করা হয় এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি তা পরিশোধন করে।সম্প্রতি বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের আলোচনা শুরু হলে বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। তবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি জানিয়েছেন, বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামেই থাকবে।
২ মাস ৪ দিন আগে
প্রায় দেড় বছরের ভাড়া মেরে দিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরের হালিশহর এলাকায় যমুনা অয়েল পিএলসির বেদখলকৃত জমি ছেড়ে লেজ গুটিয়ে পালাল ওয়াসার সু্যয়ারেজ প্রকল্পের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এস এ ইঞ্জিনিয়ারিং। দেড় বছর ধরে নির্মাণসামগ্রী রেখে জমিটি দখল করে ব্যবহার করে আসছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কারও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করেনি প্রতিষ্ঠানটি। অভিযোগ উঠেছে, যমুনা অয়েল পিএলসির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম হোসেন ও সাবেক ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন অ্যান্ড স্টেট) মো. নজরুল ইসলামের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় জমিটি দখলে নেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সে হিসেবে এই দুই কর্মকর্তার কাছে জমির ভাড়া বাবদ প্রতিমাসে লাখ টাকা পরিশোধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু ভাড়ার এক টাকাও জমা হয়নি যমুনার রাজস্ব খাতে। সূত্র মতে, জমি দখলের খবর পেয়ে সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহর বি ব্লক, আন্ধা হুজুর মাজার সংলগ্ন এলাকা পরিদর্শনে যান যমুনার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়াসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ সময় সেখানে নির্মাণসামগ্রী রাখা এবং অফিস নির্মাণের বিষয়টি কর্মকর্তাদের নজরে আসে। পরে যমুনার কর্মকর্তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনের কাছে বিষয়টি জানতে চান। তারা জানান, এস এম হোসেন ও নজরুল ইসলামের কাছ থেকে জায়গাটি ভাড়া নেওয়া হয়েছে।এরপর যমুনার এমডি পরিচয় গোপন রেখে এস এম হোসেনকে ফোন দেন। অপরপ্রান্তে কল রিসিভ করে নিজেকে যমুনার বর্তমান কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন হোসেন। তখন এমডি জানতে চান, তিনি কোথায় কর্মরত রয়েছেন। হোসেন জানান, তিনি যমুনার টার্মিনালে কর্মরত রয়েছেন। পরে যমুনার এমডি নিজের পরিচয় জানালে বিপাকে পড়েন হোসেন। তখন তিনি জানান, যমুনা থেকে ইতোমধ্যে তিনি অবসরে গেছেন।পরে অভিযুক্ত দু‘জনকে অফিসে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন যমুনা অয়েলের এমডি। এ বিষয়ে পরবর্তী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে দখল ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে বলে জানান তিনি। গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, জমিটির উপর বেশ কয়েকটি মালবাহী ট্রাক, স্ক্যাভেটর, লোহার পাইপ, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী রাখা আছে। একপাশে খালি কন্টেইনার রাখা হয়েছে। সেখানে একটি অফিসও রয়েছে এস এ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের। সেগুলো তারা সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির ওয়েল্ডিং অপারেটর মোহাম্মদ আলী। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এস এ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যবস্থাপক আলী রিয়াল বলেন, আমরা চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ করছি। যেহেতু আমরা সরকারি কাজ করছি, জমিটিও সরকারের। তাছাড়া আমরা এটি অস্থায়ীভাবে ব্যবহার করছি। তাই অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনি। তিনি বলেন, জমিটি ছিল একটি কুয়ার মতো। এটি ভরাট করে আমরা ব্যবহারের উপযোগী করেছি। জমিটির ভাড়াও আমরা নিয়মিত পরিশোধ করেছি। কিন্তু যথাযথ অনুমোদন না থাকায় জমিটি ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হচ্ছে আমোদের। এতে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি আমরা। যমুনা অয়েলের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি এক দপ্তরের জায়গা আরেক দপ্তর ব্যবহার করতে চাইলে অনুমতি লাগে। কিন্তু যমুনার জায়গাটির জন্য তারা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেয়নি। ঊর্ধ্বতন কয়েকজনের যোগসাজশে এটি দখলে নেওয়া হয়েছে, যা অফিসিয়াল নয়। তিনি জানান, জমিটির আয়তন প্রায় ৭০ শতক। আশপাশের জমির মূল্যের হিসাব অনুযায়ী জায়গাটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।এ বিষয়ে জানতে চাইলে যমুনা অয়েলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম হোসেন বলেন, জায়গাটি দখলে আমার কোনো হাত নেই। আমি কোনো ভাড়াও আদায় করিনি। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান আপনাদের মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। বরং যমুনা অয়েল পিএলসির রাজস্ব মেরে দেওয়ার কৌশল হিসেবে এসব কথা বলছে তারা। এমডির ফোনের বিষয়ে জানতে চাইলে এস এম হোসেন বলেন, যমুনার এমডি স্যার আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। আমি প্রথমে চিনতে পারিনি। আমাদের সাবেক কলিগ ইউসুফ কল করেছে মনে করে বলেছিলাম, আমি বর্তমানেও চাকরি করি। তবে পরবর্তীতে স্যার পরিচয় দিয়েছেন। এরপর এমডি স্যারকে যা বলার আমি বলেছি। এ বিষয়ে জানতে সাবেক ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন অ্যান্ড স্টেট) মো. নজরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও কল রিসিভ করেননি তিনি।
২ মাস ১৫ দিন আগে
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল পিএলসিতে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির একটি শূন্য পদে মোট ১৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। গত ১৭ জুন প্রকাশিত হয় এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। ২১ জুন থেকে আবেদনপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।পদের নাম: জুনিয়র অফিসার (রিফুয়েলিং)।পদসংখ্যা: ১৪টি।শিক্ষাগত যোগ্যতা: মাস্টার্স/স্নাতক/বিবিএ/এমবিএ ডিগ্রি। প্রার্থীদের কমপক্ষে ১ম শ্রেণির সিজিপিএ থাকতে হবে। কোনো ক্ষেত্রে ৩য় শ্রেণির সিজিপিএ গ্রহণযোগ্য হবে না।অন্যান্য যোগ্যতা: লাইট ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে। হেভি ড্রাইভিং লাইসেন্সধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।বয়সসীমা: অনূর্ধ্ব ৩২বছর।বেতন: ২২,০০০-৫৩,০৬০ টাকা (৯ম গ্রেড)।আবেদন ফি: ২২৩ টাকা।আবেদন পদ্ধতি: আগ্রহী প্রার্থীরা এখানে ক্লিক করে অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন।আবেদনের শেষ সময়: আগামী ১৬ জুলাই, ২০২৬; তারিখ বিকাল ৫টা পর্যন্ত আবেদন করা যাবে। -সূত্র : বিজ্ঞপ্তি
২ মাস ২২ দিন আগে
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সরানো হবে না। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের বড় দারোগারহাটে পণ্য পরিবহনের ওজন স্কেল নিয়ে চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ীদের আর বৈষম্যের শিকার হতে হবে না বলে বলে নিশ্চিত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।শুক্রবার (২৯ মে) সন্ধ্যায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাণিজ্য সহজীকরণ নিয়ে নবনির্বাচিত চট্টগ্রাম চেম্বার নেতাদের সাথে দেড় ঘণ্টার বৈঠকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সময় এ নিশ্চয়তা দেন মন্ত্রী। মন্ত্রীর মেহেদিবাগের বাসায় চেম্বারের সভাপতি ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাই আমিরুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে চেম্বার নেতারা এ অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। গত ২৩ মে চট্টগ্রাম চেম্বার নির্বাচনে আমিরুল হকের নেতৃত্বে ২৪ জন পরিচালকই জয়ী হন। ২৫ মে তাদের নেতৃত্বে চেম্বারের প্রেসিডিয়াম গঠিত হয়। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরুর সঙ্গে নতুন চেম্বার নেতৃত্বের এটি ছিল প্রথম বৈঠক। বৈঠকে উঠে আসে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ।বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের ৪৬তম সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেছেন, বৈঠকটি ছিল অনানুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ। একপর্যায়ে আলোচনাটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রূপ নেয় এবং চট্টগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো উঠে আসে।বিপিসির সদর দপ্তর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সরানোর সরকারি উদ্যোগের বিষয়টি তিনি তুলে ধরলে মন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে জানান, এটি চট্টগ্রামেই থাকবে, ঢাকায় যাবে না।আমিরুল হক জানান, চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ীদের বাণিজ্য সহজ করতে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ চালু করা, বিমানবন্দর ট্যারিফ কমিয়ে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, ফ্ল্যাট রেটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাট আদায়, চট্টগ্রাম কাস্টমসে আধুনিক ল্যাব স্থাপন, চট্টগ্রাম বন্দরে স্ক্যানার মেশিন স্থাপন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো, ট্রেড লাইসেন্স পাঁচ বছর মেয়াদি করা এবং ডিজিটালাইজেশন এসব বিষয় আলোচনায় আসে। মন্ত্রী বিষয়গুলো আন্তরিকভাবে শোনেন এবং সমাধানের উপায় খুঁজে দেখেন। কিছু বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিক সমাধানও দেন।চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কে পণ্য পরিবহনে ওজন স্কেল সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসনে হস্তক্ষেপ চান চেম্বারের সহ-সভাপতি মশিউল আলম স্বপন। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী উপস্থিত ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বস্ত করেন যে. দ্রুতই সমাধান করা হবে এবং চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের এককভাবে এই ভোগান্তি পোহাতে হবে না।প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর আহমদ দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মন্ত্রীর নজরে আনেন। একটি হলো বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি পণ্যের তথ্য যেভাবে উন্মুক্ত থাকে, ঠিক সেভাবেই আমদানি পণ্যের তথ্যও উন্মুক্ত করা হোক। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং বাজারে ভারসাম্য থাকবে, অপ্রয়োজনীয় আমদানিও কমবে।তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজন হলে বিদেশি ফ্লাইট চট্টগ্রামে নামার জন্য বিমানবন্দর ট্যারিফ কমানো, শুল্ক-কর ও অন্যান্য চার্জ মওকুফ এবং কার্গো ভিলেজ চালুর জন্য প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে মংলা বন্দর ব্যবহারে যেভাবে ট্যারিফ কমানো হয়েছিল, সেভাবেই উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।অনুষ্ঠানে গাড়ি ব্যবসায়ী সংগঠন বারভিডার সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল হাবিবুর রহমান বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে বাজেটে বিশেষ প্রণোদনা এবং আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানান।বৈঠকে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও ইউনাইটেড বিজনেস ফোরামের আহ্বায়ক আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সালাম এবং চট্টগ্রাম চেম্বারের নতুন ২২ জন পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। তবে নতুন সিনিয়র সহ-সভাপতি আমজাদ হোসেন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন না। উল্লেখ্য, গত ৬ মে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী একটি জরুরি ও জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশ প্রদান করেন। নোটিশে তিনি জনস্বার্থে বিপিসির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠুভাবে কার্যসম্পাদনের লক্ষ্যে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম থেকে প্রশাসনিক রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের প্রকাশ্য আবেদন জানান। একই সঙ্গে তিনি ঢাকায় বিপিসির একটি স্বতন্ত্র ও নিজস্ব বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করার কথাও বলেন।সাধারণত যেকোনো জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশ বা প্রস্তাবনার ওপর সরকারের বিভিন্ন পর্যায় ও অংশীজনদের সাথে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার নিয়ম থাকলেও, বিপিসির ক্ষেত্রে তা ঘটেছে অলৌকিক গতিতে। সংসদ সদস্যের নোটিশ প্রদানের মাত্র ছয় দিনের মাথায়, অর্থাৎ ১২ মে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিষয়টি আমলে নিয়ে বিপিসির চেয়ারম্যানকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেন। এরপর থেকেই মূলত আড়ালে-আবডালে থাকা স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি ‘বিদ্যুৎ গতিতে’ ডানা মেলতে শুরু করে।সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ১৯৯০ সালে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গুরুত্ব দিতে এবং জ্বালানি খাতের মূল অবকাঠামো কাছাকাছি রাখতে বিপিসি চট্টগ্রামে আনা হয়। কিন্তু গত ৩৫ বছর ধরে সংস্থাটির বড় বড় কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে ঢাকাতেই লিয়াজোঁ অফিস বা অন্য কোনো নাম দিয়ে অবস্থান করে আসছিলেন। সপ্তাহে দু-একদিন অথবা মাঝেমধ্যে লোকদেখানো চট্টগ্রাম সফর করলেও তাদের মূল মনোযোগ ও যাতায়াত ছিল রাজধানী কেন্দ্রিক।চট্টগ্রামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নিজস্ব আধুনিক বহুতল প্রধান কার্যালয় ভবন যখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়, ঠিক তখন কর্মকর্তাদের এই ‘ঢাকা ছাড়তে না চাওয়ার’ মানসিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই সংসদ সদস্যের এই নোটিশ এবং মন্ত্রণালয়ের এই অতি-তৎপরতা বলে উল্লেখ করেন চিটাগাং চেম্বারের সাবেক পরিচালক সৈয়দ সগির আহমেদ। তিনি বলেন, সরকারের শীর্ষ ও প্রভাবশালী কর্মকর্তারা রাজধানীর বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে চান না। আর কর্মকর্তাদের এই ‘ঢাকা ছাড়তে অনীহা’র মানসিকতাকে পুঁজি করেই এবার শুরু হয়েছে স্থায়ীভাবে সদর দপ্তর ঢাকায় ফিরিয়ে নেওয়ার সূক্ষ্ম ও অতি গোপনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যা চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক স্বার্থকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করবে।চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহল ও নাগরিক সমাজ এই প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করে একে ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে: যেখানে সরকারের মূল নীতি বিকেন্দ্রীকরণ, সেখানে কর্মকর্তাদের আরাম-আয়েশ ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের স্বার্থে একটি পুরো জাতীয় সংস্থাকে ঢাকায় ফেরত নিয়ে যাওয়া চরম বৈষম্যমূলক। বিশেষজ্ঞদের মতে, মুষ্টিমেয় কিছু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য দেশের পুরো জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ কক্ষকে অপারেশনাল এরিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। এই ‘বিদ্যুৎ গতির’ আত্মঘাতী প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করে বিপিসির পূর্ণাঙ্গ সদর দপ্তর সদ্য নির্মিত চট্টগ্রামের স্থায়ী ভবনেই কার্যকর করার দাবি এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
৩ মাস ২০ দিন আগে
মন্ত্রীর ফোনের পর বিটুমিন সরবরাহ করল যমুনা অয়েল কোম্পানী লিমিটেড। এর আগে বিটুমিন সরবরাহ পেতে হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগ করেন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার একটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদার। এ ঘটনায় ওএসডি হলেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিয়ন্ত্রিত যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (জেওসিএল) মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) মো. মাসুদুল ইসলাম। তাঁকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে সংযুক্ত (ওএসডি) করার আদেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গত এক বছরে বিটুমিন সরবরাহে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাকে বলা হচ্ছে ‘ঠেলার নাম বাবাজি’। এ ঘটনায় জ্বালানি তেল সেক্টরে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিপিসির প্রশিক্ষণ, সাবসিডিয়ারি প্রশাসন ও কর্মী ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে জারি করা এক আদেশপত্রে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত চিঠিটি যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে।নির্দেশনা অনুযায়ী মো. মাসুদুল ইসলামকে এমডির দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। আদেশপত্রে বলা হয়, মো. আবদুস সামাদ নামের এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির দাখিল করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও পৌরসভার একটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য গত বছরের ৭ ডিসেম্বর যমুনা অয়েলে বিটুমিন সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পে-অর্ডার জমা দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিটুমিন বরাদ্দ পায়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।লিখিত অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পটি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজ এলাকার এবং গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দ্রুত কাজ শেষ করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিটুমিনের অভাবে কাজ ব্যাহত হচ্ছিল। এ বিষয়ে বারবার যোগাযোগ করেও বিটুমিন কমিটির কাছ থেকে কোনো কার্যকর সাড়া পাওয়া যায়নি।অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ৩ মে যমুনা অয়েলের এক প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে ৫ মে বিটুমিন সংগ্রহের আশায় ঠাকুরগাঁও থেকে চট্টগ্রামে যমুনা অয়েলের প্রধান কার্যালয়ে আসেন অভিযোগকারী প্রতিনিধি। সেখানে সারাদিন অপেক্ষা করার পর তাঁকে জানানো হয়, তাঁর সিরিয়াল নম্বর ৯৫ এবং ওই মুহূর্তে বিটুমিন দেওয়া সম্ভব নয়।এ ঘটনায় মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) মো. মাসুদুল ইসলামের আচরণ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে অভিযোগপত্রে। পরে উপায়ান্তর না পেয়ে বিষয়টি এলজিআরডি মন্ত্রীর নজরে আনা হলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তবে এরপরও বিটুমিন সরবরাহ করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে মো. আবদুস সামাদ বলেন, ‘পে-অর্ডার জমা দেওয়ার ছয় মাস পার হলেও আমরা বিটুমিন পাইনি। অথচ সাধারণত এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই বিটুমিন পাওয়ার কথা।’ তিনি অভিযোগ করেন, বিটুমিন সরবরাহের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুষ চাওয়া হয়েছে। ঘুষ দিতে অস্বীকার করায় তাঁদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে। ‘একেক সময় তাঁদের একেক সিরিয়াল নম্বর বলা হয়েছে। কাজের গুরুত্ব বিবেচনায় আমরা একাধিকবার যোগাযোগ করলেও বিটুমিন দেওয়া হয়নি,’।আবদুস সামাদ আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও বিটুমিন না পাওয়ায় আমরা পে-অর্ডার ফেরত চাই। কিন্তু সেটিও ফেরত দেওয়া হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে বিষয়টি এলজিআরডি মন্ত্রী মহোদয়কে অবহিত করা হয়।’তবে ভিন্ন কথা বলছেন অভিযুক্ত যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) মো. মাসুদুল ইসলাম। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি এ ধরনের অভিযোগের মতো কোনো কাজ করিনি। পুরো বিটুমিন সরবরাহ প্রক্রিয়াটি অনলাইনভিত্তিক ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয়। এখানে ব্যক্তিগতভাবে কারও সিরিয়াল পরিবর্তন বা হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।তিনি বলেন, অভিযোগকারী যে ৮০-১০০ গ্রেডের বিটুমিন চেয়েছিলেন, সে সময় ইস্টার্ন রিফাইনারি শাটডাউনে থাকায় ওই গ্রেডের কোনো উৎপাদন ছিল না। ফলে তা সরবরাহের সুযোগও ছিল না। ‘রিফাইনারিতে খোঁজ নিলেই বিষয়টি জানা যাবে।মো. মাসুদুল ইসলাম জানান, অভিযোগকারীর প্রকল্পের জন্য মূলত স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (এসএওসিএল) থেকে বিটুমিন সরবরাহ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি যমুনা অয়েলে আবেদন করেন। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সময়মতো জমা না দেওয়ায় তাঁর সিরিয়াল পিছিয়ে যায়।তিনি বলেন, ‘অভিযোগকারীর আবেদনপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরে তিনি টাইম এক্সটেনশন নিয়ে এপৃল মাসে কাগজপত্র জমা দেন। এরপরও সব ডকুমেন্ট ঠিকভাবে এন্ট্রি না হওয়ায় তাঁর সিরিয়াল আরও পিছিয়ে যায়। এটি অনলাইনের নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে।’চট্টগ্রামে আসতে অভিযোগকারীকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বলেননি বলেও দাবি করেন এই কর্মকর্তা। তার দাবি, ‘আমাদের আইটি বিভাগের একজন সদস্য তাঁকে ডেকেছিলেন বিষয়টি বুঝিয়ে বলার জন্য। কেন তাঁর সিরিয়াল পিছিয়েছে, সেটি দেখানোর জন্য তাকে আসতে বলা হয়েছিল।’মন্ত্রীর ফোন পাওয়ার পর বিশেষ বিবেচনায় নিয়ম শিথিল করে অভিযোগকারীকে বিটুমিন সরবরাহ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন মো. মাসুদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় ফোন করার পর আমরা বিশেষ ব্যবস্থায় ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে পুরোনো বিটুমিন গলিয়ে ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিন সরবরাহ করেছি। যদিও তাঁর আবেদন ছিল ৮০-১০০ গ্রেডের জন্য।’মাসুদুল ইসলাম বলেন, ‘এক গ্রেডের পরিবর্তে অন্য গ্রেডের বিটুমিন সরবরাহ করাও নিয়মের বাইরে। তারপরও বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় সেটি করা হয়েছে।’নিজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে দাবি করে মাসুদুল আলম বলেন, ‘আমি কোনো অন্যায় বা অনিয়ম করিনি। সরকার ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেই কাজ করেছি। হয়তো আমাকে এখান থেকে সরানোর জন্য একটি পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি আল্লাহর ওপর বিচার ছেড়ে দিয়েছি।’তিনি আরও বলেন, ‘আমি সবসময় গ্রাহকদের মূল্যায়ন করি। কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে পারে। আমি ২২ দিন রুটিন দায়িত্বে এমডির দায়িত্বও পালন করেছি। এমডি হওয়ার চেষ্টা করেছি, হয়তো সেটিই আমার অপরাধ।’এ বিষয়ে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। বিপিসির তাগিদপত্র পাওয়ার পর মো. মাসুদুল ইসলামকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
৪ মাস ৩ দিন আগে
দেশের যে কোন নাজুক পরিস্থিতিতে জ¦ালানি তেলের যোগান সংকট মেটাতে কক্সবাজারের মহেশখালী সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল মজুতাগার। প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা এই মজুতাগার এখন পড়ে আছে সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায়। এখানে সংরক্ষণ নেই এক ফোটা জ¦ালানি তেলও। ফলে প্রশ্ন উঠেছে কেন গড়ে তোলা হয়েছে এই মজুতাগার। প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের জবাব, ব্যবস্থাপনা আর সক্ষমতার সমন্বয়ের অভাবে এই প্রকল্পে জ্বালানি তেল মজুত করা যাচ্ছে না। ফলে অব্যবহৃত পড়ে আছে মজুতাগারটি। সোমবার (১১ মে) দুপুরে আলাপকালে এমন মন্তব্য করেছেন এসপিএম প্রকল্পের পরিচালক নাহিদ জামান। তিনি বলেন, মজুতাগারের নির্মাণ কাজ শেষ হলেও কিছু কারিগরি ত্রুটি ও লজিস্টিক সংকটের কারণে প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়ন করা যায়নি। দীর্ঘ নির্মাণ প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালে এই স্টোরেজে পরীক্ষামূলক কিছু তেল মজুত করা হলে ত্রুটিগুলো ধরা পড়ে। তিনি জানান, সমুদ্রে অবস্থানকারী বড় তেলবাহী জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি খালাসের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। দীর্ঘ নির্মাণ প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের এপৃল মাসে কাজ শেষ হলেও বাস্তব ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি স¤পন্ন হয়নি প্রকল্পটির। প্রকল্পের অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রে স্থাপিত ভাসমান মুরিং এবং সমুদ্রতল দিয়ে নির্মিত প্রায় ১১০ কিলোমিটার পাইপলাইন, যা স্টোরেজ সুবিধার মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারির সঙ্গে সংযুক্ত। এ ছাড়া পা¤িপং স্টেশন, অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল সংরক্ষণ ট্যাংক, বুস্টার পা¤প এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও স্থাপন করা হয়েছে। তবে চলতি বছরেই ত্রুটি ও লজিস্টিক সংকট নিরসন করে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে পারবেন এমন আশা প্রকাশ করেন নাহিদ জামান। ইস্টার্ন রিফাইনারী পিএলসির তথ্য মতে, মহেশখালী দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে কালারমারছড়া সোনারপাড়া অংশে এই বিশাল অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। প্রকলটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, যা পরে বাড়িয়ে ৮ হাজার ২২২ কোটি টাকা করা হয়। চীনের একটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান পুরো নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছে। অর্থায়নের বড় অংশও এসেছে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের মাধ্যমে, যা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।সূত্র আরও জানায়, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল যে কোন শাটডাউন পরিস্থিতিতে জ্বালানি ব্যাকআপ দেওয়া, জ্বালানি আমদানির সময় কমানো এবং ব্যয় সাশ্রয় করা। বিদ্যমান ব্যবস্থায় বড় ট্যাংকার সরাসরি বন্দরে প্রবেশ করতে না পারায় গভীর সমুদ্রে নোঙর করে ছোট জাহাজের মাধ্যমে তেল খালাস করতে হয়, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এসপিএম চালু হলে একই প্রক্রিয়া কয়েক দিনের পরিবর্তে স্বল্প সময়ে স¤পন্ন হওয়ার কথা ছিল। তবে বাস্তবে সেই সুবিধা এখনো মিলছে না।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়া এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিকল্পিত সম্প্রসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রকল্পটির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বর্তমানে বিদ্যমান প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা সীমিত থাকায় এসপিএম কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ কমে গেছে।পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও অপারেটর না থাকায় প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হয়নি। পূর্ববর্তী সময়ে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা এগোলেও তা স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলে প্রস্তাবিত ব্যয় বেশি হওয়ায় তা বাতিল করা হয়। দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হলেও অংশগ্রহণ সীমিত ছিল এবং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও অনেকেই শেষ পর্যন্ত প্রস্তাব জমা দেয়নি। এতে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এমন অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। তবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতায় মহেশখালীর এসপিএম প্রকল্প এখনো সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছেন, প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও বাস্তবতা যাচাই যথাযথভাবে করা হয়নি। সহায়ক অবকাঠামো প্রস্তুত না রেখেই বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এখন এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে প্রকল্পটি ব্যবহারের উপযোগী করতে নতুন করে পরিকল্পনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় আকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চাহিদা, সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় জরুরি। তা না হলে বিনিয়োগ সত্ত্বেও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) উপ-মহাব্যবস্থাপক ও গণসংযোগ দপ্তরের কর্মকর্তা মনিলাল দাশ বলেন, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর। কিন্তু চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। অন্যদিকে সরকারের ওপর প্রতিনিয়ত বাড়ছে বৈদেশিক ঋণের চাপ, জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও কমছে না। ফলে নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও অপারেশনাল জটিলতা, সীমিত সংরক্ষণ সক্ষমতা এবং ব্যবস্থাপনাগত অনিশ্চয়তার কারণে প্রকল্পটি এখনো পুরোপুরি চালু করা যায়নি। ফলে বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের জ্বালানি খাত।
৪ মাস ৭ দিন আগে
চলতি বছরের ২৬ শে জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের দুবাইয়ের জলসীমায় প্রবেশ করেছিল বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন বাণিজ্যিক জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয় ইরানের সাথে আমেরিক ও ইসলাইলের যুদ্ধ।এর মধ্যে কয়েক দফা চেষ্টা করেও হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা। গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে জাহাজটি দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে আটকা পড়েছে।ফলে জাহাজটির নাবিক, ইঞ্জিনিয়ারসহ মোট ৩১ জন ক্রু উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় জীবন কাটাচ্ছেন। একইভাবে চরম উৎকন্ঠায় রয়েছেন নাবিক ও ক্রুদের পরিবারের স্বজনেরা। শুক্রবার (৮ মে) এমন তথ্য জানিয়েছেন বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (বাণিজ্য) মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা। তিনি বলেন, হরমুজে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল বা অনুমোদন না দেয়া পর্যন্ত জাহাজটি ওখান থেকে বের হতে পারছে না। হরমুজ ছাড়া বিকল্প কোন পথও নেই বের হওয়ার। তিনি বলেন, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি হরমুজে কিছু কিছু জাহাজকে চলাচলের অনুমিত দিলেও বাংলার জয়যাত্রার অনুমোদন মিলছে না। এর কারণ কি সেটাও বুঝতে পারছি না। হরমুজ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগে ইতোমধ্যে আইআরজিসি বরাবরে একাধিকবার অনুমতি চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাহাজটির ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম। ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের যুদ্ধবিরতি শুরু হলে গত ৮ই এপৃল হরমুজ প্রণালি পার হতে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল জাহাজটি। কিন্তু পার হতে পারেনি।জাহাজটির চিফ ইঞ্জিনিয়ার রাশেদুল হাসান জানান, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির নৌবাহিনী কেউ যদি হরমুজ ক্রসের চেষ্টা করো, অ্যাটাক করা হবে বলে ক্রমাগত বার্তা প্রচার করছে। ফলে হরমুজে জাহাজ নিয়ে আসা নিরাপদ মনে হচ্ছে না। বিএসসির একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, বাংলার জয়যাত্রা বিএসসির হলেও এটি যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য পরিবহণের কাজে ভাড়ায় নিয়োজিত। সম্ভবত এ কারণে বাংলার জয়যাত্রা ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর এর রোষানলে পড়েছে। বর্তমানে জাহাজটিতে ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল রয়েছে। যা নিয়ে যাওয়া হবে যুক্তরাষ্ট্রে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, জাহাজটিকে বের করে আনার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে ইরানের সাথে আলোচনা করে বাংলাদেশ জাহাজটিকে যখন বের করে আনার পর্যায়ে নিয়ে এসেছিল, ঠিক তখন আবার সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যে কারণে এটি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, জাহাজের নাবিকদের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তাদের ভাতা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। জাহাজে পর্যাপ্ত পানি ও খাদ্য রয়েছে। নাবিকদের সাথে দেশে থাকা পরিবারের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।প্রসঙ্গত, কাতারের একটি বন্দর থেকে গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি প্রায় ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে গিয়েছিল এমভি বাংলার জয়যাত্রা। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পর গত এক মাস ধরে সংযুক্ত আরব আমীরাতের মিনা সাকারের অদূরে গভীর সমুদ্রে অবস্থান করছিল। গত সোমবার জাহাজটি অবস্থান পাল্টে শারজাহর কাছে কিছুটা নিরাপদে গিয়ে অবস্থান করছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
৪ মাস ১০ দিন আগে
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর হঠাৎ বদলে গেছে চট্টগ্রাম মহানগরীর তেলের পাম্পগুলোর দৃশ্যপট। গেলেই মিলছে সোনার হরিণ অকটেন-পেট্রোল। গত দেড় মাসের মতো পা¤পগুলোতে এখন নেই যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। প্রায় ফাঁকা পাম্পগুলো।শুক্রবার (২৪ এপৃল) সকাল থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগরীর ষোলশহর, নতুন ব্রিজ, পাঁচলাইশ, অক্সিজেন, ওয়াসা মোড়, লালদীঘি ও গণি বেকারি সংলগ্ন একাধিক ফিলিং স্টেশন ঘুরে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। পা¤প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাম্পগুলোতে বর্তমানে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক। বিশেষ করে অকটেন সরবরাহ বাড়ানো এবং সীমাবদ্ধতা তুলে দেওয়ার কারণে বাজারে চাপ অনেকটাই কমে গেছে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল দেওয়া হতো না, এখন চালকরা ইচ্ছেমতো তেল নিতে পারছেন। এতে ভোগান্তি ছাড়াই দ্রুত সেবা পাচ্ছেন তারা।গ্রাহকদের অভিযোগ, তেলের দাম বাড়াতেই এতদিন জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি করা হয়েছিল। যেভাবে এখন সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে সংকট তৈরী করা হয়েছে। তেলের পাম্পের ভিড় এখন গ্যাস রি-ফুয়েলিং স্টেশনে শুরু হয়েছে।আহসান উল্লাহ নামে এক সিএনজি চালক জানান, তারা নগরীর যে কোন স্টেশনে গ্যাসের জন্য গেলে মাইলেরও অধিক ভিড় দেখছেন। রি-ফুয়েলিং স্টেশনের মালিক ও কর্মচারীরা বলছে, গ্যাস সংকটের কারণে চাপ কম, তাই রিফুয়েলিং করতে সময় লাগছে। এতে গ্যাস চালিত যানবাহনগুলোর ভিড় বাড়ছে। নগরীর টাইগার পাস মোড়ের ইন্ট্রাকো সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশনে গ্যাস রি-ফুয়েলিং করতে আসা প্রাইভেটকার চালক রেজাউল করিম বলেন, শুক্রবার সকাল ৯ টায় গ্যাস নিতে এসে লাইনে দাড়িয়েছি। এখন দুপুর দেড়টা বাজে। এখনো পর্যন্ত গ্যাস নিতে পারিনি। সামনে যে লাইন আছে তাতে মনে হচ্ছে আরও এক ঘন্টা সময় লাগবে। এভাবে নগরীর প্রতিটি গ্যাস রি-ফুয়েলিং স্টেশনে ভিড় জমে আছে বলে জানান গ্যাস নিতে আসা চালকরা। অন্যদিকে স্বস্তির নিংশ্বাস ফেলছেন তেলের পাম্পগুলোর কর্মচারী ও তেল নিতে আসা যানবাহন চালকরা। তারা বলছেন, আগে যেখানে প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি থাকতো এখন সেখানে স্বাভাবিক সময়ের মতোই অল্প কিছু গাড়ি থাকছে। কোন কোন পা¤েপ কর্মরতরা অলস সময় কাটাচ্ছে। নগরীর গণি বেকারি সংলগ্ন কিউ সি ট্রেডিংয়ে অকটেন নিতে আসা মোটরসাইকেল চালক রহিম উল্লাহ বলেন, আমি মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করি। এ কয়েকদিন সীমাহীন কষ্ট করতে হয়েছে। এক ঘণ্টা, কোন সময় দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হয়েছে। হঠাৎ দেখি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এরপরই দেখি পা¤েপর চিত্র পাল্টে গেছে। তেল নেওয়ার কোনো লিমিটেশন নেই। ফুল ট্যাংক লোড করে নিতে পারছি। চট্টগ্রাম মহানগরীর গাড়ির বেশি চাপ থাকা পা¤েপর একটি দামপাড়া এলাকার মেসার্স সিএমপি ফিলিং স্টেশন। দেড় মাস ধরে রাতদিন লাইন থাকতো পা¤পটিতে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে উল্টো চিত্র মিলেছে। শুক্রবার সকালে পা¤পটিতে গাড়ির কোনো লাইন ছিল না।একই চিত্র দেখা গেছে নগরীর নাছিরাবাদ ও কাতালগঞ্জ এলাকার পা¤পগুলোতেও। আগে যেখানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লম্বা লাইন থাকতো, সেখানে এখন স্বাভাবিক বিক্রি হচ্ছে। কিছু পা¤েপ একসময় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ির লাইন থাকলেও বর্তমানে সেই দৃশ্য একেবারেই অনুপস্থিত।পা¤প মালিকদের ভাষ্য, ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে অকটেনের ক্ষেত্রে সরবরাহ উন্মুক্ত করে দেওয়ায় বাজারে স্থিতিশীলতা এসেছে। এতে একদিকে যেমন গাড়ির চাপ কমেছে, অন্যদিকে মানুষের মধ্যে থাকা আতঙ্কও অনেকটাই দূর হয়েছে।কিউ সি পা¤েপর কর্মচারী মো. আলমগীর বলেন, তেলের দাম বাড়ানোর পর বুধবার একটু চাপ ছিল। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে চাপ একদম কমে গেছে। অনেকে আগে অকটেন-পেট্রোল মজুত করেছিল, দাম বাড়ানোর পর এখন সেগুলো ব্যবহার করছে। এজন্য পা¤েপ চাপ কমে গেছে।তিনি বলেন, দুইদিন আগেও সবাই ট্যাংকি ভরে অকটেন নিতে চাইতো। এখন নিচ্ছে তিনশ থেকে পাঁচশ টাকার মতো। এখন কেউ আর অতিরিক্ত তেল কিনছেন না। আতঙ্ক প্রায় কেটে গেছে। জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাম বৃদ্ধির আগে বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছিল। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, সামনে তেলের দাম বাড়বে কিংবা সরবরাহ কমে যাবে। সেই আশঙ্কা থেকে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুত করা হয়েছিল। কিন্তু দাম সমন্বয়ের পর এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ফলে সেই মজুত তেল এখন বাজারে ব্যবহার হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ সীমাবদ্ধ না রেখে উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। এতে পা¤পগুলোতে অস্বাভাবিক ভিড় কমেছে এবং সার্বিক বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে। মানুষের মধ্যে যে 'প্যানিক' তৈরি হয়েছিল, সেটিও কেটে গেছে।সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, অকটেন ও পেট্রোলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ডিজেলের ক্ষেত্রে এখনো কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে কৃষি ও পরিবহন খাতে ডিজেলের চাহিদা বেশি থাকায় এই সংকট পুরোপুরি কাটেনি। তবে সংকট কাটাতে সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে ডিজেল আমদানির চেষ্টা করছে। প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ডিজেল ও অপরিশোধিত ক্রুড অয়েলবাহী জাহাজ দেশে আসতে পারেনি। তবে অকটেন ও পেট্টোল দেশে তৈরী হত। এরপরও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট দেখা দেয়ার কথা বলেন ডিলার ও পাম্প মালিকরা। ফলে আতঙ্কিত হয়ে জ্বালানি তেল নির্ভর যানবাহনের চালক ও মালিকরা অকটেন ও পে্েট্রালের জন্য দেশের সবগুলো পেট্রোল পাম্পে ভিড় জমাতে শুরু করে। যা একপর্যায়ে দীর্ঘ হতে থাকে। এ সময় সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) দেশে অকটেন ও পেট্রোলের কোন সংকট নেই বলে দাবি করেন। তবে ডিপো ও পাম্প মালিকরা তেল মজুত করছে বলে স্বীকার করেন বিপিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। যা সত্যে পরিণত হল সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর। তেলের মূল্য বাড়ার ঘোষণার পরপরই উধাও হয়ে গেল সরবরাহ সংকট।
৪ মাস ২৫ দিন আগে