প্রায় দেড় বছরের ভাড়া মেরে দিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরের হালিশহর এলাকায় যমুনা অয়েল পিএলসির বেদখলকৃত জমি ছেড়ে লেজ গুটিয়ে পালাল ওয়াসার সু্যয়ারেজ প্রকল্পের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এস এ ইঞ্জিনিয়ারিং। দেড় বছর ধরে নির্মাণসামগ্রী রেখে জমিটি দখল করে ব্যবহার করে আসছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কারও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
অভিযোগ উঠেছে, যমুনা অয়েল পিএলসির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম হোসেন ও সাবেক ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন অ্যান্ড স্টেট) মো. নজরুল ইসলামের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় জমিটি দখলে নেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সে হিসেবে এই দুই কর্মকর্তার কাছে জমির ভাড়া বাবদ প্রতিমাসে লাখ টাকা পরিশোধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু ভাড়ার এক টাকাও জমা হয়নি যমুনার রাজস্ব খাতে।
সূত্র মতে, জমি দখলের খবর পেয়ে সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহর বি ব্লক, আন্ধা হুজুর মাজার সংলগ্ন এলাকা পরিদর্শনে যান যমুনার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়াসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ সময় সেখানে নির্মাণসামগ্রী রাখা এবং অফিস নির্মাণের বিষয়টি কর্মকর্তাদের নজরে আসে। পরে যমুনার কর্মকর্তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনের কাছে বিষয়টি জানতে চান। তারা জানান, এস এম হোসেন ও নজরুল ইসলামের কাছ থেকে জায়গাটি ভাড়া নেওয়া হয়েছে।
এরপর যমুনার এমডি পরিচয় গোপন রেখে এস এম হোসেনকে ফোন দেন। অপরপ্রান্তে কল রিসিভ করে নিজেকে যমুনার বর্তমান কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন হোসেন। তখন এমডি জানতে চান, তিনি কোথায় কর্মরত রয়েছেন। হোসেন জানান, তিনি যমুনার টার্মিনালে কর্মরত রয়েছেন। পরে যমুনার এমডি নিজের পরিচয় জানালে বিপাকে পড়েন হোসেন। তখন তিনি জানান, যমুনা থেকে ইতোমধ্যে তিনি অবসরে গেছেন।
পরে অভিযুক্ত দু‘জনকে অফিসে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন যমুনা অয়েলের এমডি। এ বিষয়ে পরবর্তী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে দখল ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে বলে জানান তিনি।
গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, জমিটির উপর বেশ কয়েকটি মালবাহী ট্রাক, স্ক্যাভেটর, লোহার পাইপ, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী রাখা আছে। একপাশে খালি কন্টেইনার রাখা হয়েছে। সেখানে একটি অফিসও রয়েছে এস এ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের। সেগুলো তারা সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির ওয়েল্ডিং অপারেটর মোহাম্মদ আলী।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এস এ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যবস্থাপক আলী রিয়াল বলেন, আমরা চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ করছি। যেহেতু আমরা সরকারি কাজ করছি, জমিটিও সরকারের। তাছাড়া আমরা এটি অস্থায়ীভাবে ব্যবহার করছি। তাই অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনি।
তিনি বলেন, জমিটি ছিল একটি কুয়ার মতো। এটি ভরাট করে আমরা ব্যবহারের উপযোগী করেছি। জমিটির ভাড়াও আমরা নিয়মিত পরিশোধ করেছি। কিন্তু যথাযথ অনুমোদন না থাকায় জমিটি ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হচ্ছে আমোদের। এতে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি আমরা।
যমুনা অয়েলের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি এক দপ্তরের জায়গা আরেক দপ্তর ব্যবহার করতে চাইলে অনুমতি লাগে। কিন্তু যমুনার জায়গাটির জন্য তারা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেয়নি। ঊর্ধ্বতন কয়েকজনের যোগসাজশে এটি দখলে নেওয়া হয়েছে, যা অফিসিয়াল নয়। তিনি জানান, জমিটির আয়তন প্রায় ৭০ শতক। আশপাশের জমির মূল্যের হিসাব অনুযায়ী জায়গাটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যমুনা অয়েলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম হোসেন বলেন, জায়গাটি দখলে আমার কোনো হাত নেই। আমি কোনো ভাড়াও আদায় করিনি। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান আপনাদের মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। বরং যমুনা অয়েল পিএলসির রাজস্ব মেরে দেওয়ার কৌশল হিসেবে এসব কথা বলছে তারা।
এমডির ফোনের বিষয়ে জানতে চাইলে এস এম হোসেন বলেন, যমুনার এমডি স্যার আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। আমি প্রথমে চিনতে পারিনি। আমাদের সাবেক কলিগ ইউসুফ কল করেছে মনে করে বলেছিলাম, আমি বর্তমানেও চাকরি করি। তবে পরবর্তীতে স্যার পরিচয় দিয়েছেন। এরপর এমডি স্যারকে যা বলার আমি বলেছি।
এ বিষয়ে জানতে সাবেক ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন অ্যান্ড স্টেট) মো. নজরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও কল রিসিভ করেননি তিনি।