দেশের যে কোন নাজুক পরিস্থিতিতে জ¦ালানি তেলের যোগান সংকট মেটাতে কক্সবাজারের মহেশখালী সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল মজুতাগার। প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা এই মজুতাগার এখন পড়ে আছে সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায়।
এখানে সংরক্ষণ নেই এক ফোটা জ¦ালানি তেলও। ফলে প্রশ্ন উঠেছে কেন গড়ে তোলা হয়েছে এই মজুতাগার। প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের জবাব, ব্যবস্থাপনা আর সক্ষমতার সমন্বয়ের অভাবে এই প্রকল্পে জ্বালানি তেল মজুত করা যাচ্ছে না। ফলে অব্যবহৃত পড়ে আছে মজুতাগারটি।
সোমবার (১১ মে) দুপুরে আলাপকালে এমন মন্তব্য করেছেন এসপিএম প্রকল্পের পরিচালক নাহিদ জামান। তিনি বলেন, মজুতাগারের নির্মাণ কাজ শেষ হলেও কিছু কারিগরি ত্রুটি ও লজিস্টিক সংকটের কারণে প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়ন করা যায়নি। দীর্ঘ নির্মাণ প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালে এই স্টোরেজে পরীক্ষামূলক কিছু তেল মজুত করা হলে ত্রুটিগুলো ধরা পড়ে।
তিনি জানান, সমুদ্রে অবস্থানকারী বড় তেলবাহী জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি খালাসের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। দীর্ঘ নির্মাণ প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের এপৃল মাসে কাজ শেষ হলেও বাস্তব ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি স¤পন্ন হয়নি প্রকল্পটির।
প্রকল্পের অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রে স্থাপিত ভাসমান মুরিং এবং সমুদ্রতল দিয়ে নির্মিত প্রায় ১১০ কিলোমিটার পাইপলাইন, যা স্টোরেজ সুবিধার মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারির সঙ্গে সংযুক্ত। এ ছাড়া পা¤িপং স্টেশন, অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল সংরক্ষণ ট্যাংক, বুস্টার পা¤প এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও স্থাপন করা হয়েছে। তবে চলতি বছরেই ত্রুটি ও লজিস্টিক সংকট নিরসন করে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে পারবেন এমন আশা প্রকাশ করেন নাহিদ জামান।
ইস্টার্ন রিফাইনারী পিএলসির তথ্য মতে, মহেশখালী দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে কালারমারছড়া সোনারপাড়া অংশে এই বিশাল অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। প্রকলটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, যা পরে বাড়িয়ে ৮ হাজার ২২২ কোটি টাকা করা হয়।
চীনের একটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান পুরো নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছে। অর্থায়নের বড় অংশও এসেছে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের মাধ্যমে, যা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।
সূত্র আরও জানায়, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল যে কোন শাটডাউন পরিস্থিতিতে জ্বালানি ব্যাকআপ দেওয়া, জ্বালানি আমদানির সময় কমানো এবং ব্যয় সাশ্রয় করা। বিদ্যমান ব্যবস্থায় বড় ট্যাংকার সরাসরি বন্দরে প্রবেশ করতে না পারায় গভীর সমুদ্রে নোঙর করে ছোট জাহাজের মাধ্যমে তেল খালাস করতে হয়, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এসপিএম চালু হলে একই প্রক্রিয়া কয়েক দিনের পরিবর্তে স্বল্প সময়ে স¤পন্ন হওয়ার কথা ছিল। তবে বাস্তবে সেই সুবিধা এখনো মিলছে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়া এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিকল্পিত সম্প্রসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রকল্পটির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বর্তমানে বিদ্যমান প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা সীমিত থাকায় এসপিএম কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ কমে গেছে।
পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও অপারেটর না থাকায় প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হয়নি। পূর্ববর্তী সময়ে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা এগোলেও তা স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলে প্রস্তাবিত ব্যয় বেশি হওয়ায় তা বাতিল করা হয়।
দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হলেও অংশগ্রহণ সীমিত ছিল এবং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও অনেকেই শেষ পর্যন্ত প্রস্তাব জমা দেয়নি। এতে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এমন অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। তবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতায় মহেশখালীর এসপিএম প্রকল্প এখনো সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছেন, প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও বাস্তবতা যাচাই যথাযথভাবে করা হয়নি। সহায়ক অবকাঠামো প্রস্তুত না রেখেই বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এখন এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে প্রকল্পটি ব্যবহারের উপযোগী করতে নতুন করে পরিকল্পনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় আকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চাহিদা, সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় জরুরি। তা না হলে বিনিয়োগ সত্ত্বেও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) উপ-মহাব্যবস্থাপক ও গণসংযোগ দপ্তরের কর্মকর্তা মনিলাল দাশ বলেন, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর। কিন্তু চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। অন্যদিকে সরকারের ওপর প্রতিনিয়ত বাড়ছে বৈদেশিক ঋণের চাপ, জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও কমছে না। ফলে নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও অপারেশনাল জটিলতা, সীমিত সংরক্ষণ সক্ষমতা এবং ব্যবস্থাপনাগত অনিশ্চয়তার কারণে প্রকল্পটি এখনো পুরোপুরি চালু করা যায়নি। ফলে বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের জ্বালানি খাত।