চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে কন্টেনারবাহী দুটি জাহাজের সংঘর্ষের ঘটনায় যখন উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছিল আমদানিকারকদের মাঝে। ঠিক তখনই ভেতরে ভেতরে মহা আয়োজনে জাহাজ দুটিকে বন্দরের এনসিটি জেটিতে এনে ভেড়ালো চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এমন সক্ষমতা বন্দরের জন্য একেবারেই নতুন।
আমদানিকারকদের ভাষ্য, বন্দরের এমন সক্ষমতা আছে তা বিশ্বাস করতে পারছিলনা কেউ। সময় তখন রবিবার দুপুর আড়াইটা। খবর ছড়িয়ে পড়ে বহির্নোঙর থেকে সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত জ্হাাজ দুটি বন্দরের এনসিটি জেটিতে ভেড়াতে সক্ষম হয়েছে। জাহাজ দুুটির কন্টেনারভর্তি পণ্য খালাসে আর কোন অনিশ্চয়তা নেই। আর এই খবর নিশ্চিত হওয়ার পর হাসি ফুটে আমদানিকারদের।
শুধু হাসি নয়, আমাদের বন্দরের এমন সক্ষমতা আছে, যা ভাবতে গর্ব লাগছে। বললেন ফোর জুয়েল ডিষ্ট্রিবিউডর কোম্পাানি লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী আমিন শরীফ ও শাহজাহান শরীফ। তারা বলেন, বন্দরের এমন সক্ষমতার কথা আমাদের জানা ছিল না। এই সক্ষমতায় চট্টগ্রাম বন্দর অনন্য উচ্চতায় পৌছে যাবে বর্হিবিশ্বে¦, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসার প্রসারে ব্যাপক ভুমিকা রাখবে।
রবিবার (৩ মে) সন্ধ্যার দিকে এ বিষয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহণ) এনামুল করিমের সাথে। তিনি জানান, সিঙ্গাপুর থেকে আমদানিপণ্য নিয়ে শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দরে ভেড়ার কথা ছিল জাহাজ দুটির। তার আগেই মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে জাহাজ দুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জাহাজ দুটি হলো বিদেশি জাহাজ মায়েরস্ক চট্টগ্রাম এবং দেশীয় জাহাজ এইচআর তুরাগ। দুর্ঘটনার পর থেকেই জাহাজ দুটি বহির্নোঙরে নোঙর করা ছিল। জাহাজ দুটি জেটিতে আনার জন্য গত শুক্রবার বিকেলে বহির্নোঙরে গিয়েছিলেন বন্দর পাইলট ক্যাপ্টেন মো. আতাউল হাকিম সিদ্দিকী ও ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শামসুদ্দীন। তবে কাছাকাছি পৌঁছে দুর্ঘটনার চিত্র দেখে তারা জাহাজ না এনে বন্দর ভবনে ফিরে আসেন।
পরে ক্যাপ্টেন শামসুদ্দীন জানান, জাহাজের মূল কাঠামোতে ক্ষতির প্রমাণ দেখেছি। সংঘর্ষে জাহাজ দুটির নিচের অংশে আঘাত লেগেছে। তবে পানির নিচের অংশে কোনো ফাটল বা গুরুতর ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
আর জাহাজ দুটির সংঘর্ষের পর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এক ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল। জাহাজ দুটি কবে নাগাদ নিরাপদে বন্দরে পৌঁছাবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয় আমদানিকারকদের মাঝে। এই সংশয় দূর করতে এবং পণ্য খালাস বিলম্ব হলে চরম আর্থিক ক্ষতি বিবেচনায় জাহাজ দুটি বন্দরে ভেড়াতে ভেতরে ভেতরে মহা উদ্যোগ গ্রহণ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দরের তথ্য মতে, রবিবার সকাল ১১টায় বন্দর থেকে বহির্নোঙরে রওনা দেন চারজন ক্যাপ্টেনের রেতৃত্বে একটি টিম। সেখানে তারা একটি টাগবোট ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে সকাল ১১টা ৪০মিনিটে মায়েরস্ক চট্টগ্রাম এবং এইচ আর তুরাগ বন্দরের এনসিটির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীর মালিকানাধীন কর্ণফুলী গ্রুপের জাহাজ হচ্ছে এইচ আর তুরাগ। সেটি চালাচ্ছিলেন, ক্যাপ্টেন আবু সাইদ মোহাম্মদ কামরুল আলম ও মোহাম্মদ তানভীর রহমান। মায়েরস্ক চট্টগ্রাম হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ডেনমার্কভিত্তিক শিপিং ক¤পানি মায়ের্সক লাইনের। চালাচ্ছিলেন বন্দরের সহকারী হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আতাউল হাকিম সিদ্দিকী।
তিনি জানান, ঝুঁকি এড়াতে বন্দরের নৌ বিভাগ বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। প্রতি জাহাজেই আমরা দুজন পাইলট নিয়েছি। আমার সঙ্গে ছিলেন পাইলট আবুল খায়ের। দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে জাহাজ জেটিতে নিরাপদে ভিড়েছে। এতে অন্তত ৪০ মিনিট বেশি সময় লেগেছে। বৈরি আবহাওয়া এবং উত্তাল সাগরের মধ্যে দেশের আমদানিকারকের স্বার্থেই এমন পদক্ষেপ।
ক্যাপ্টেন আবু সাইদ মোহাম্মদ কামরুল আলম জানান, ১১টা ৬ মিনিটে বহির্নোঙর থেকে রওনা দিয় ১২টা ৫০ মিনিটেই আমরা জাহাজ জেটিতে নিরাপদে ভিড়াতে পেরেছি। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কিছুটা ধীরগতি যেমন ৬ থেকে ১০ নটিক্যাল মাইল গতিতে চালাতে হয়েছে।
মায়েরস্ক চট্টগ্রাম জাহাজে ১৮৭৮ কন্টেইনার বক্স আমদানি পণ্যভর্তি আছে। আর এইচ আর তুরাগ আছে এক হাজার একক কন্টেইনার। দুটি জাহাজই আমদানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার নামিয়ে জেটি ছাড়বে। কিন্তু রপ্তানি কন্টেইনার বোঝাই করবে না। কারণ দুটি জাহাজই এখন সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার অনুমতি নেই।
জাহাজ পরিচালনাকারীরা বলছেন, জাহাজ ডকইয়ার্ডে নিয়ে গিয়ে মেরামত করা হবে। তদন্ত কমিটির অনুমোদন, ক্ষতি নিরূপন এবং সমুদ্রপাড়ি দেয়ার অনুমতি সনদ পাওয়ার পরই জাহাজে রপ্তানি কন্টেইনার বোঝাই করতে পারবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, জাহাজ দুটি ভেড়ানোর আগে রবিবার সকাল ১১টা থেকেই বন্দরের প্রবেশপথ মোহনা থেকে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পর্যন্ত নৌপথে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দুটি জাহাজকে তিনটি করে টাগবোট পাহারা দেয়। আশপাশে বাড়তি টাগবোট রাখা হয় স্ট্যান্ডবাই।
এ দুটি জাহাজ ভিড়বে তাই রবিবার সকালে বন্দরের নির্ধারিত শিডিউলের জাহাজগুলোর আগেভাগেই বার্থিং শেষ করা হয়। একই সময় সাধারণ জাহাজের চলাচল বন্ধ রাখা হয়। বন্দর ভবনের ভ্যাসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা ভিটিএমএস থেকে ক্যামেরার মাধ্যমে জাহাজ চলাচল তদারকি করেন বন্দর নৌ বিভাগের কর্মকর্তারা।
এছাড়া বন্দরের নৌ বিভাগ, বার্থ অপারেটর ও শিপিংলাইনের প্রায় ৪০ জন অতিরিক্ত লোক নিয়োগ করা হয়। নিকট অতীতে চট্টগ্রাম বন্দরে এভাবে জাহাজ ভেড়ানোর নজীর নেই বললেই চলে। কারণ একসঙ্গে দুটি পণ্যবাহী জাহাজ বহির্নোঙরে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও নেই।
স্বাভাবিক সময়ে এই বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। কিন্তু দুটি জাহাজই শুক্রবার সকালে বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার আগে পর¯পরের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল স্বাভাবিকভাবে দুটি জাহাজ জেটিতে আনা সম্ভব ছিল না। তাই বিশেষ বিবেচনায় অনুমতি নিয়ে জাহাজ দুটি ভেড়ানোর এ আয়োজন।
চট্টগ্রাম বন্দরের উপ-সংরক্ষক ক্যাপ্টেন জহিরুল ইসলাম বলছেন, দুটি জাহাজেই অনেকগুলো আমদানি কন্টেইনার শুক্রবার থেকে আটকা পড়েছিল। বেশিদিন আটকে থাকায় আমদানিকারকের উদ্বেগ বাড়ছিল। আবার বহির্নোঙরে এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে কন্টেইনার স্থানাস্তরের সুযোগ নেই। দুদিন আটকে থাকায় দেশের অর্থনীতির ক্ষতি বিবেচনায় আমরা বিশেষ বিবেচনায় জাহাজ দুটি জেটিতে আনার সিদ্ধান্ত নিই।
গত শুক্রবার সকালে জাহাজ দুটি আমদানি কন্টেইনার নিয়ে বহির্নোঙর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগে পর¯পর ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর রবিবার সকাল পর্যন্ত জাহাজ দুটি সেখানেই ছিল। জাহাজ দুটিতে প্রায় ২ হাজার ৮০০ টিইইউএস আমদানি পণ্যবাহী কন্টেনার আটকে পড়ে। যা নিয়ে উদ্বেগে পড়েছিলেন আমদানিকারকরা।
এদিকে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা যায়নি বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির প্রিন্সিপাল অফিসার শেখ জালাল উদ্দিন গাজী।