পানির বিল নির্ধারণে নতুন পদ্ধতি চালু করতে চায় চট্টগ্রাম ওয়াসা। নতুন পদ্ধতি অনুযায়ী, গ্রাহক পানি ব্যবহার না করলেও মাসিক নির্দিষ্ট ফি গুনতে হবে। পাশাপাশি পানির ব্যবহার বাড়লে বাড়বে বিলও। বর্তমানে প্রতি ইউনিট (১ হাজার লিটার) পানিতে আবাসিক গ্রাহককে ১৮ টাকা এবং অনাবাসিকে (শিল্প ও বাণিজ্য) ৩৭ টাকা গুনতে হয়।
চট্টগ্রাম ওয়াসার জন্য এই ‘টু-পার্ট ট্যারিফ’ বা দুই অংশের বিল কাঠামো প্রস্তাব করেছে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেলয়েট ইন্ডিয়া। ঘাটতি পূরণ ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে এই বিল পদ্ধতির প্রস্তাব করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। নতুন এই বিল পদ্ধতি ঢাকাসহ দেশের কোনো ওয়াসায় নেই।
এ বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারুর দাবি, ‘নতুন ট্যারিফ চালু হলে ভোক্তার ওপর বিলের বোঝা বাড়বে। সিস্টেম লসের নামে যে বিপুল পরিমাণ পানি চুরি হয়, সেটি গড় বিল করে পোষায় ওয়াসা। এই ট্যারিফের মাধ্যমে সেটিকে বৈধতা দিতে চায় তারা। মানুষের ওপর বিলের বোঝা না কমিয়ে সিস্টেম লস বন্ধ করুক ওয়াসা।’
পারু বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম ওয়াসার সিস্টেম লস প্রায় ২৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ, যা বছরে ৪৭ হাজার ৪২০ কোটি লিটার। এই বিশাল অপচয় বা চুরি রোধ না করে নতুন ট্যারিফ আরোপ করে গ্রাহকের ওপর বোঝা চাপানো কেনোমতেই উচিত নয়।
তবে ভিন্ন কথা বলছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম। তিনি বলেছেন, নতুন ট্যারিফ বাস্তবায়ন হলে বিল বাড়বে না। বরং গড় বিল নিয়ে যে সন্তোষ আছে তা প্রশমন হবে। বর্তমানে প্রতিদিন এক ইউনিট হারে প্রতি মাসের সর্বনিম্ন গড় বিল দিতে হয়। যেটি নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে গ্রাহকদের মধ্যে।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত কাঠামোয় পানির বিল দুভাগে নির্ধারণ করা হবে। একটি নির্দিষ্ট মাসিক ফি, অন্যটি ব্যবহারের ওপর চার্জ। বর্তমানে যে ন্যূনতম এক ইউনিট বিলের ব্যবস্থা রয়েছে, নতুন মডেলে সেটি বদলে পরিবার সংখ্যা ও পানি ব্যবহারের ভিত্তিতে বিল নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের দুটি প্রস্তাবের মধ্যে ‘প্রস্তাব-১’-কে তুলনামূলকভাবে কার্যকর ও গ্রাহকবান্ধব হিসেবে বিবেচনা করেছে ওয়াসার গঠিত কমিটি।
এই প্রস্তাব অনুযায়ী, এক থেকে চারটি পরিবারের জন্য মাসিক নির্ধারিত বিল হবে ৩২৫ টাকা। এর আওতায় ২৫ ইউনিট পানি ব্যবহার করা যাবে। পাঁচ থেকে ১০টি পরিবারের জন্য নির্ধারিত বিল হবে ৯৭৫ টাকা, যেখানে ৭৫ ইউনিট পানি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আর ১০টির বেশি পরিবারের ক্ষেত্রে মাসিক বিল হবে ১ হাজার ৯৫০ টাকা, যার মধ্যে ১৫০ ইউনিট পানি ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করলে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিটে ২৫ টাকা করে দিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের জন্য এই হার ৫০ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৮০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক সংযোগে ১৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারের জন্য মাসিক ৭৫০ টাকা নির্ধারিত ফি রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি বছর নির্ধারিত ও পরিবর্তনশীল উভয় ধরনের ট্যারিফে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫ শতাংশ হারে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বিকল্প আরেকটি প্রস্তাবে প্রথম ৩০ ইউনিট পর্যন্ত সব শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ন্যূনতম ৬৫০ টাকা বিল নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে ইউনিটপ্রতি মূল্য ২৩ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বাড়বে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত টু-পাট ট্যারিফের নতুন পদ্ধতি যাচাই-বাছাই করতে কমিটি গঠন করে চট্টগ্রাম ওয়াসা।
কমিটি ৯ দফা সুপারিশ করেছে। সুপারিশের ভিত্তিতে দুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্ম সম্পাদনে সহায়তা প্রদানের জন্য গঠিত কমিটির সভায়। সিদ্ধান্তগুলো হলো— বিল পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য অংশীজনের সঙ্গে সভা করা ও বর্তমান প্রচলিত রাজস্ব হ্রাস পাবে কি না, তা বিশ্লেষণ করা। তবে কমিটি বোর্ড মিটিংয়ে তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে। বোর্ড মিটিংয়ে অনুমোদন হলে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে নতুন ট্যারিফ গ্রাহক পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হবে।’
চট্টগ্রাম ওয়াসার তথ্যমতে, বর্তমানে ওয়াসার মোট সংযোগ সংখ্যা ১ লাখ ১ হাজার ২২২টি। এর মধ্যে ৯২ হাজার ১১২টি আবাসিক ও ৯ হাজার ১১০টি অনাবাসিক। বর্তমান সংযোগের মধ্যে পানির ব্যবহার ৯১ শতাংশ আবাসিকে ও ৯ শতাংশ অনাবাসিকে।