চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) পরিচ্ছন্নতা বিভাগের ময়লা পরিবহনকারী গাড়িচালক মো. শাহিন। কিন্তু চলাফেরা যেন রাজকীয় হালে। চলেন কয়েক লাখ টাকার প্রাইভেট কারে। হাঁকান মোটর সাইকেলও।
নগরীর ১৮ নং পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ডে শুধুমাত্র ময়লার গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে মাত্র ১০ বছরে তিনি ঘুরিয়ে দিয়েছেন নিজের জীবনযাপন। পরিস্থিতি এমন যে, প্রশ্ন করারও কোন জোঁ নেই তাকে।
মাত্র ১৩ হাজার ৫০০ টাকা বেতন পান চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী শাহিন। যেন সম্পদের পাহাড়ে বসে আছেন তিনি। তবে গাড়িচালক শাহিনের দাবি তিনি শুধু চাকরি করেন না, করেন গাড়ির ব্যবসা। মারেন পাঠাও-উবারের ভাড়া। আর স্থানীয়রা তার দাবিকে বলছেন-বুমেরাং। তার মূল পেশাই হল জ্বালানি তেল চুরি।
একদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের গাড়ির ডিজেল-অকটেন, অন্যদিকে কর্ণফুলী নদীর জাহাজের ডিজেল চুরিই হচ্ছে গাড়িচালক শাহিনের 'আলাদিনের চেরাগ'। যা নিয়ে খোদ সিটি করপোরেশনের ভেতরে-বাইরে তৈরি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য।
স্থানীয়রা জানান, ময়লার গাড়ি চালানো থেকে সবকাজে শাহিনের রয়েছে বড় ধরনের চোর চক্র। ময়লার গাড়ি যেমন শাহিন চালায় না, চক্রের সদস্যরা চালায় তেমনি তেল চুরির সাথেও জড়িত শাহিনের ভাই শাকিলের নেতৃত্বে থাকা সংঘবদ্ধ চোর চক্র।
যারা কর্ণফুলী নদী আর সিটি করপোরেশনের গাড়ির জ্বালানি তেল চুরি করে নগরীর শাহ আমানত সেতু (নতুন ব্রিজ) এলাকায় টং দোকানে বিক্রি করে। আশ্চর্য্যের বিষয়-এ দোকানে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রী হয় মাত্র ৯৫ টাকায়। অথচ নগরীর প্রতিটি পাম্পে ডিজেল বিক্রী হয় সরকার নির্ধারিত মূল্য ১১৫ টাকা হিসেবে।
রবিবার (২৮ জুন) দুপুরে ডিজেলের ক্রেতা সেজে সেই টং দোকানে গেলে ডিজেল বিক্রীর এই তারতম্য ধরা পড়ে। এত কম দামে ডিজেল বিক্রীর বিষয়ে জানতে চাইলে দোকানে থাকা কর্মচারী বলেন, আপনার লাগলে নেন, না লাগলে যান। আপনারা কারা-এমন প্রশ্ন করেন ওই কর্মচারী।
এ সময় তেল কিনতে আসা এক ক্রেতা বলেন, আমি শাকিলের এই দোকান থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ৯৫ টাকায় কিনি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এখানে নিয়মিত জ্বালানি তেল বিক্রী করেন। এই তেল সরবরাহ করেন শাকিলের ভাই শাহিন। কর্ণফুলী নদির জাহাজের চেরাই তেল হওয়ায় কম দামে বিক্রী করেন বলে জানান ওই ক্রেতা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা শাহিন উল্কাগতিতে ধনী হওয়ার পেছনে মূল উৎসই হচ্ছে জাহাজ ও চসিকের বরাদ্দকৃত ডিজেল-অকটেন চুরি। চসিকের ময়লা পরিবহনের জন্য শাহিনের গাড়ি বাবদ প্রতিদিন ১২ লিটার জ্বালানি তেল বরাদ্দ পায়। কিন্তু নির্দিষ্ট ট্রিপে তেল খরচ হয় সর্বোচ্চ ৬-৮ লিটার। বাকি অতিরিক্ত তেল তিনি প্রতিদিন বিক্রী করে দেন শাকিলের টং দোকানে।
শুধু তাই নয়, শাহিন নিজেও নিয়মিত ময়লার গাড়ি চালান না। চসিক থেকে গাড়ি ও তেলের স্লিপ সংগ্রহ করে তিনি টাকার বিনিময়ে দৈনিক ভিত্তিক অন্য শ্রমিক দিয়ে গাড়িটি চালান, আর নিজে ব্যস্ত থাকেন তেল চুরির সিন্ডিকেট ও ব্যক্তিগত ব্যবসায়।
সূত্র জানায়, প্রায় ১০ বছর ধরে চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগের অধীনে ১৮ নং পূর্ব বাকলিয়া এলাকায় ময়লা পরিবহনের গাড়ি চালক হিসেবে কাজ করছেন শাহিন। বর্তমানে তার মাসিক বেতন মাত্র ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তার বিভিন্ন ছবি সূত্রে জানা গেছে, শাহিন যাতায়াত করেন কয়েক লাখ টাকা মূল্যের প্রাইভেট কারে।
শুধু তাই নয়, তার সংগ্রহে রয়েছে লাখ টাকা দামের একটি মোটরসাইকেলও। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সিটি করপোরেশনের সর্বনিম্ন স্তরের চালক হয়েও তিনি নিজের ব্যক্তিগত প্রাইভেট কারে অবৈধভাবে 'চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন' এর লোগো ব্যবহার করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন নগরী।
এছাড়া নগরীর একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে বসবাসের পাশাপাশি তিনি গাড়ি ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। যদিও আইনি জটিলতা এড়াতে ব্যবসার কাগজপত্র অন্যের নামে রাখা হয়েছে, তবে এর মূল নিয়ন্ত্রণ শাহিনের হাতেই বলে নিশ্চিত করেছে চসিকের একাধিক সূত্র।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চসিকে গাড়ি চালক হিসেবে চাকরি পান শাহিন। চাকরিতে ঢুকেই সাবেক শাসকদলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় জড়িয়ে পড়েন।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চসিকের পরিবহন বিভাগে গড়ে তোলেন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও অলৌকিকভাবে এখনো বহাল তবিয়তে নিজের রাজত্ব ধরে রেখেছেন শাহিন।
সম্পদের উৎস ও তেল চুরির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. শাহিন বলেন, সব মিথ্যা। আমার সম্পদ কোথায় আছে এবং তেল চুরি প্রমাণ করতে হবে আপনাদের। যারা এসব মিথ্যে সংবাদ ভাইরাল করেছে তাদের বিরুদ্ধে আমি সাইবার আইনে মামলা করেছি।
প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহিন বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি চালাই, বেতন পায় ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। এতে আমার সংসার চলে না। তাই পাঠাও-উবারের ভাড়া মারার জন্য আমি মোটর সাইকেল কিনেছি। আর প্রাইভেট কার আমার বন্ধুর, তবে এটির রেজিষ্ট্রেশনও আমার নামে। আমি গাড়ির ব্যবসাও করি।
একজন সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কীভাবে ভাড়া মারেন, ব্যবসা করেন-এমন প্রশ্নের উত্তরে শাহিন বলেন, আমি পরিশ্রম করে খাচ্ছি। এতে কারও অনুমতির প্রয়োজন নেই। চাকরি না পোষালে করছেন কেন-প্রশ্ন করা হলে শাহিন বলেন, পারলে আমি সবই করব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ১৮ নং পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা পরিচ্ছন্ন বিভাগের সুপারভাইজার মো. মাহফুজ বলেন, ভাই বর্তমানে কোটিপতি হওয়া বিস্ময়ের কিছু নয়, দু‘চারটা মোটরসাইকেল চুরি করলেও কোটিপতি হওয়া যায়। আপনারা সামান্য একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পেছনে কেন লাগলেন সেটাও তো বুঝতে পারছি না।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী কিছুই জানে না বলে জানান। তিনি বলেন, খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, চসিকের এই সাধারণ চালক শাহিনের সম্পদের মূল উৎস তেল চুরি, বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্ত হলে থলের বেড়াল বেরিয়ে আসবে।