সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন-ভাতার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। শনিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ নামে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এতে সই করেছেন অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন কাঠামোয় বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ পাবেন। এই অর্থ গত ৩০ জুন আহরিত বা প্রাপ্য বেতনের সঙ্গে যুক্ত হবে।
২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বাড়তি মূল বেতনের ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ হারে পাবেন। এরপর ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোয় নির্ধারিত বাড়তি মূল বেতনের শতভাগ কার্যকর হবে।
নতুন বেতন কাঠামো গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বকেয়া বেতনও পাবেন।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর অন্যান্য সব ভাতা পাওয়া শুরু করবেন। একইভাবে পেনশন সুবিধাভোগীরাও নতুন কাঠামো অনুযায়ী প্রাপ্য সুবিধা পাবেন।
এতে মূল বেতনের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যাতায়াত এবং বাসস্থানসহ বিভিন্ন খাতের ভাতার পরিমাণ পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
চিকিৎসা ও নববর্ষ ভাতা
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, চাকরিজীবীদের বয়স ৫০ বছর পর্যন্ত মাসিক চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে পিআরএল শেষ হওয়া পর্যন্ত মাসিক ৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অবসরে থাকা পেনশনভোগীরা বয়সভেদে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা ভাতা পাবেন। এ ছাড়া সকল কর্মী নিজ মূল বেতনের ১৫ শতাংশ হারে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষ ভাতা পাবেন।
উৎসব ও শ্রান্তি-বিনোদনের ভাতা
প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বার্ষিক উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা দেওয়া হবে। অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীরা তাদের নিট পেনেশনের সমপরিমাণ হারে বছরে ২টি উৎসব ভাতা পাবেন।
এ ছাড়া শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীরা সমপরিমাণ নিট পেনশনের ভিত্তিতে বছরে ২টি উৎসব ভাতা পাবেন।
শিক্ষা সহায়ক ও বিশেষ সন্তান ভাতা
সরকারি চাকরিজীবীরা সন্তানপ্রতি প্রতিমাসে ৫০০ টাকা হারে শিক্ষা সহায়ক ভাতা পাবেন। সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য মাসে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত এই ভাতা মিলবে, যা ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত প্রযোজ্য হবে।
অন্যদিকে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য বিশেষ ভাতা দেওয়া হবে।
ভ্রমণ ভাতা
ভ্রমণ ভাতার ক্ষেত্রে কোনো নতুন পরিবর্তন আনা হয়নি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভ্রমণ ভাতার জন্য পূর্বে জারি করা প্রচলিত বিধিবিধান ও সুযোগ-সুবিধাগুলো পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অর্থ বিভাগ পরবর্তীতে বিষয়টির ওপর পর্যালোচনা করে আলাদা আদেশের মাধ্যমে ভ্রমণ ভাতার হার পুনর্নির্ধারণ করবে।
বিদ্যমান বিধিমালার অধীনে সরকারি কাজে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভ্রমণের ক্ষেত্রে তাদের পদমর্যাদা ও স্কেল অনুযায়ী যাতায়াত খরচ, দৈনিক ভাতা এবং অবস্থানকালীন সুবিধা পেয়ে থাকেন।
টিফিন, যাতায়াত, মোবাইল ও ধোলাই ভাতা
১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মাসিক ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত থাকলে মাসিক ৬০০ টাকা যাতায়াত ভাতা পাবেন।
মোবাইল ভাতার ক্ষেত্রে ৫ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য মাসে ৫০০ টাকা এবং ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ধোলাই ভাতার জন্য নির্ধারিত পদের কর্মীরা পাবেন মাসিক ৩০০ টাকা।
আপ্যায়ন ভাতা
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ সচিব বা মুখ্য সচিব মাসিক ২ হাজার টাকা, সচিব ১ হাজার টাকা, অতিরিক্ত সচিব ৯০০ টাকা এবং যুগ্মসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা ৬০০ টাকা আপ্যায়ন ভাতা পাবেন।
পাহাড়ি ও আঞ্চলিক ভাতা
চলতি বা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য কর্মচারীরা মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা কার্যভার ভাতা পাবেন। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৯ম বা তদূর্ধ্ব গ্রেডের প্রশিক্ষকরা মূল বেতনের ১০ শতাংশ প্রেষণ ভাতা পাবেন।
পাহাড়ি অঞ্চলে কর্মরতরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫০০ টাকা এবং হাওড় বা চর এলাকায় দায়িত্ব পালনকারীরা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা ভাতা পাবেন।
ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতা
এ ছাড়া স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), আনসার, ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, দুদক ও কারাগারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সেবায় নিয়োজিত নির্দিষ্ট পদের কর্মীদের জন্য পূর্ব নির্ধারিত স্মারক অনুযায়ী ঝুঁকি ভাতা ও বিশেষ সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে।
এনএসআই, ডিজিএফআই, এসএসএফ ও পিজিআরসহ বিশেষ সংস্থায় নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য পূর্বের ভাতার পরিমাণের ওপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ যুক্ত করে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
বাড়ি ভাড়া
চাকরিজীবীদের কর্মস্থল ও বেতন গ্রেড অনুযায়ী বাড়ি ভাড়া ভাতার হার নির্ধারণ করা হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেড ২০ থেকে ১৬ পদের কর্মচারীরা মূল বেতনের সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া পাবেন।
অন্যান্য বিভাগীয় শহর ও সাভার-কক্সবাজারের ক্ষেত্রে এই হার ৫০ শতাংশ এবং অন্যান্য স্থানের জন্য ৪৫ শতাংশ। এছাড়া প্রথম সারির গ্রেডগুলোর ক্ষেত্রে পদের পদমর্যাদা অনুযায়ী ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হবে।
ভ্রমণ ভাতা
ভ্রমণ ভাতার ক্ষেত্রে কোনো নতুন পরিবর্তন আনা হয়নি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভ্রমণ ভাতার জন্য পূর্বে জারি করা প্রচলিত বিধিবিধান ও সুযোগ-সুবিধাগুলো পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অর্থ বিভাগ পরবর্তীতে বিষয়টির ওপর পর্যালোচনা করে আলাদা আদেশের মাধ্যমে ভ্রমণ ভাতার হার পুনর্নির্ধারণ করবে।
বিদ্যমান বিধিমালার অধীনে সরকারি কাজে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভ্রমণের ক্ষেত্রে তাদের পদমর্যাদা ও স্কেল অনুযায়ী যাতায়াত খরচ, দৈনিক ভাতা এবং অবস্থানকালীন সুবিধা পেয়ে থাকেন।
এখনই মিলছে না ভাতা
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীরা বর্ধিত বেতন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন হারের সব ভাতা পাবেন না; বরং ভাতার এই সুবিধাটি ধাপে ধাপে ও নির্দিষ্ট সময় পর থেকে কার্যকর হবে।
প্রজ্ঞাপনের ১(৩)(ঞ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সকল প্রকার ভাতা বিদ্যমান কাঠামোতে দেওয়া হবে।
নতুন স্কেলে নির্ধারিত বর্ধিত ভাতার হার কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। ফলে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের বর্ধিত মূল বেতন বকেয়াসহ পরিশোধ করা হলেও ভাতা সংক্রান্ত সুবিধার ক্ষেত্রে পুরোনো হিসাবই বহাল থাকছে।
উল্লেখ্য, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছিল। এরপর প্রায় ১২ বছর ধরে কোনো বেতন কাঠামো হয়নি। ফলে তাদের দাবি ছিল নতুন বেতন কাঠামোর। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপনে দেরি দেখে তাদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল।
নতুন বেতন কাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের বেতন ১৪২ শতাংশ বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা।
নতুন বেতন কাঠামোতে আগের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। বিভিন্ন গ্রেডে বেতন বেড়েছে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ। তবে নিচের গ্রেডগুলোয় বেতন বেশি বেড়েছে।
২০টি গ্রেডের মধ্যে প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। অন্যদিকে ১২তম গ্রেডে ১১৫, ১৩তম গ্রেডে ১১৮, ১৪তম গ্রেডে ১৩০, ১৫তম গ্রেডে ১৩৫, ১৬তম গ্রেডে ১৩৫, ১৭তম গ্রেডে ১৩৮, ১৮তম গ্রেডে ১৩৯, ১৯তম গ্রেডে ১৪১ শতাংশ এবং ২০তম গ্রেডে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
নতুন বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর মন্ত্রিপরিষদসচিব জানিয়েছিলেন, জাতীয় বেতন স্কেল গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। তবে বাস্তবায়ন করা হবে ধাপে ধাপে।
২০২৬-২৭ এবং আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। এক্ষেত্রে স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। আর বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর হবে। পেনশনভোগীদের নিট পেনশনও একইভাবে ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে।
প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির ফলে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এজন্য অর্থবছরের বাজেটে আলাদা অর্থ সংস্থান রাখা হবে বলে সরকার জানিয়েছে।