মরক্কোর বিপক্ষে ড্র দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও হাইতি ও স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে গ্রুপ পর্ব পেরোয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। শেষ বত্রিশে জাপানকে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট কাটলেও কোয়ার্টার ফাইনালে আর যাওয়া হল না দলটির। রাউন্ড অব সিক্সটিনে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিল হলুদ জার্সিধারীরা।
আর্লিং হলান্ডের ৭৯ মিনিটের গোলে প্রথমে পিছিয়ে পড়ে নেইমার জুনিয়ররা। এরপর ৯০ মিনিটে দ্বিতীয় গোলে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন হলান্ড। ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে পেনাল্টি থেকে নেইমার গোল করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। হলান্ডের জোড়া গোলেই ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটেছে নরওয়ে।
নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে শুরুতেই গোল হজম করে পিছিয়ে পড়তে পারত ব্রাজিল। ম্যাচ শুরুর দুই মিনিট পরই জালের দেখা পেয়েছিল আর্লিং হলান্ডের দল। তবে অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। বেঁচে যায় ব্রাজিল। এরপর দশ মিনিটের খেলা শেষ না হতেই পেনাল্টি পায় সেলেসাওরা।
নরওয়ে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খেললেও ম্যাচের আট মিনিটের মাথায় দারুণ এক আক্রমণ শাণায় কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা। সেই আক্রমণ থামাতে নিজেদের বক্সে মাথেউস কুনিয়াকে ফাউল করে বসেন নরওয়ে ডিফেন্ডার ক্রিস্টোফার আয়ের।
রেফারি শুরুতে পেনাল্টি না দিলেও ভিএআর রিভিউয়ের পর পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। এদিকে স্পটকিক নিতে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের বদলে এগিয়ে আসেন ব্রুনো গিমারেস। দারুণ এক সুযোগ থেকে দলকে এগিয়ে দিতে ব্যর্থ হন এই সেলেসাও ফুটবলার।
তাঁর শট ঠেকিয়ে দিয়েছেন নরওয়ের গোলরক্ষক ওরইয়ান নিল্যান্ড। লিড পেতে ব্যর্থ হয় সেলেসাওরা। এদিকে গিমারেস দলকে এগিয়ে দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর ম্যাচের ২৩ মিনিটে গোলের দারুণ এক সুযোগ পেয়েছিলেন কুনিয়া। ওয়ারন ভার্সেস ওয়ান লড়াইয়ে বল নিয়ে ডি বক্সে প্রায় ঢুকেই পড়েছিলেন। কিন্তু নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেননি। ফলে হাইড্রেশন ব্রেকের আগ পর্যন্ত গোল পায়নি ব্রাজিল।
এদিকে হাইড্রেশন ব্রেকের পর শুরুতেই গোলের আরেকটি সুযোগ তৈরি করেছিল ব্রাজিল। গোলপোস্টের কাছে থেকে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেলি শট নিয়েছিলেন। কিন্তু নরওয়ে গোলরক্ষকের প্রচেষ্টায় এবারও নিরাশ হয় ব্রাজিল।
এদিকে ম্যাচের ৩৭ মিনিটে গোলের সুযোগ পেয়েছিল নরওয়েও। তবে হলান্ড সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। এর দুই মিনিট পরই দারুণ এক শট নিয়েছিলেন ভিনি জুনিয়র। তবে নরওয়ে গোলরক্ষক এবারও দারুণ এক সেভে নিরাশ করেন তাকে।
এদিকে প্রথমার্ধের নির্ধারিত ৪৫ মিনিটের খেলা শেষের পর যোগ হয় ৬ মিনিটের। এই সময়ের দুই মিনিট যেতেই গোলের দারুণ এক সুযোগ পেয়েছিল নরওয়ে। প্রতি আক্রমণে বল পেয়েছিলেন হ্লান্ড। তবে শট নিতে পারেননি তিনি। হলান্ড ব্যর্থ হলেও বল পেয়ে যান মার্তীন ওডেগার্ড। তবে নরওয়ে অধিনায়কের শট ঠেকিয়ে দলকে বাচান অ্যালিসন বেকার।
বিরতির পর নরওয়ে মাঠে নামে দুটি পরিবর্তন নিয়ে। আলেক্সান্দার সরলথ ও আন্তোনিও নুসার জায়গায় মাঠে নামেন অস্কার বব ও আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ। এই শেলদেরুপের পাস থেকেই ম্যাচে প্রথম গোলের দেখা পায় নরওয়ে।
এর আগে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে কুনিয়ার বদলে মাঠে নামেন এন্দ্রিক। মাঠে নেমেই ভিনির পাস থেকে গোল করার দারুণ এক সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। তবে গোলরক্ষককে একা পেয়েও গোল করতে পারেননি তিনি। এখানেও দারুণ অবদান নিলান্ডের। এন্দ্রিকের সেই মিসের পরই দারুণ এক শট নিয়েছিলেন রায়ান। তবে এবারও ব্রাজিলকে হতাশ করেন নিলান্ড। শেষ ষোলোয় নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে ব্রাজিলকে বারবার হতাশ করছেন নরওয়েজিয়ান এই গোলরক্ষক।
এদিকে বদলি হয়ে মাঠে নেমে নরওয়ের আক্রমণের ধার বাড়াতে থাকেন আন্দ্রে শেলদেরুপ। তাঁর সাজিয়ে দেওয়া আক্রমণের ধারাবাহিকতায় প্রথম গোলের দেখা পায় নরওয়ে। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে শেলদেরুপের দুর্দান্ত এক ক্রস থেকে হেডে গোল দিয়ে দলকে এগিয়ে দেন হলান্ড।
এদিকে শেষদিকে গোল হজম করে ব্রাজিল তখন বাদ পড়ার শঙ্কায়। ম্যাচে ফিরতে মরিয়ে হয়েই লড়াই শুরু করে সেলেসাওরা। নেইমার-ভিনিরা আক্রমণের ধার বাড়াতে থাকেন। দারুণ কিছু সুযোগও তৈরি করেছিলেন। তবে নরওয়ে গোলরক্ষক নিলান্ডের দক্ষতায় ভেস্তে যায় সব। এরই মধ্যে দ্বিতীয় গোল হজম করে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় ব্রাজিল। ৯০ মিনিটে শেলদেরুপের অ্যাসিস্ট থেকেই দ্বিতীয় গোল করেন হলান্ড।
দুই গোলে পিছয়ে পড়ার পর আর কিছুই করতে পারেননি নেইমার-ভিনিরা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের পর অতিরিক্ত সময় আসে সাত মিনিট। এই সাত মিনিটেই বাড়ে নাটকীয়তা। অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। আর স্পটকিক থেকে গোল করেন নেইমার। সান্ত্বনার সেই গোলেই ২-১ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় ব্রাজিল।
যেখানে শুরু সেখানেই শেষ নেইমার
নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপের শেষ ১৬ থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের রেশ কাটতে না কাটতেই সেলেসাও ভক্তদের জন্য এলো সবচেয়ে বড় এবং হৃদয়বিদারক ধাক্কা। আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর স্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেন ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার জুনিয়র।
ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি থেকে ব্রাজিলের একমাত্র সান্ত্বনার গোলটি করার পর মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েন এই পিএসজি ও বার্সার সাবেক মহাতারকা। ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের জিই টিভি কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে জানান, বিশ্বমঞ্চে ট্রফি জেতার তাঁর সমস্ত চেষ্টা এখন "শেষ"।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুম টানেলে দাঁড়িয়ে শূন্য চোখে নেইমার বলেন, "আমি চেষ্টা করেছি, বারবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন সব শেষ। আমি এখানেই শুরু করেছিলাম (মেটলাইদ স্টেডিয়ামে), আর এখানেই শেষ করলাম।"
রবিবারের এই পরাজয় কেবল নেইমারের বিদায়ঘণ্টাই বাজায়নি, এটি সামগ্রিকভাবে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসকেও এক অন্ধকার অধ্যায়ে ঠেলে দিয়েছে। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই (শেষ ১৬ থেকে) বিদায় নিতে হলো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
ডালাস ও নিউ জার্সির দর্শকদের কাঁদিয়ে বিদায় নেওয়া সান্তোসের এই তারকা আরও একটি নেতিবাচক রেকর্ডের সঙ্গী হলেন। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে ৪টি বিশ্বকাপ খেলেও একটিও ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে না পারা দ্বিতীয় খেলোয়াড় এখন নেইমার জুনিয়র। এর আগে তাঁরই সাবেক সতীর্থ ও ডিফেন্ডার থিয়াগো সিলভা প্রথম ব্রাজিলিয়ান হিসেবে এই দুঃখজনক রেকর্ডের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
কার্লো আনচেলত্তির ছকে সাদিয়ার স্পন্সরশিপের নতুন জোয়ারে এবার হেক্সা জয়ের যে স্বপ্ন নেইমার দেখেছিলেন, ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা সেই স্বপ্ন এরলিং হালান্ডের নরওয়ের কাছে এভাবে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, তা হয়তো কোনো ফুটবল ভক্তই কল্পনা করেননি।
৩৬ বছর পর এমন লজ্জায় ডুবল ব্রাজিল
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের ২৪ বছরের বিশ্বকাপ খরা কাটানোর মিশন থমকে গেল নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই। শেষ ১৬-র রুদ্ধশ্বাস ও নাটকীয় মহাকাব্যে ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়েছে নরওয়ে।
১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই (শেষ ১৬ থেকে) বিদায় নেওয়ার চরম লজ্জায় ডুবল সেলেসাওরা। এর আগে ১৯৯০ সালে বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল। সেবার গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচই জিতেছিল সেলেসাওরা। তবে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হেরে কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বিদায় নেয় ব্রাজিল।
এই বিদায়ের ফলে নিশ্চিত হয়ে গেল যে, ২০৩০ বিশ্বকাপ আসা মানেই ব্রাজিলের শিরোপাহীনতার বয়স দাঁড়াবে টানা ২৮ বছর। নিজেদের ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ (১৯৫৮) জয়ের পর থেকে এত দীর্ঘ সময় ট্রফি ছাড়া কখনো কাটায়নি সাম্বা বয়রা।