রেলওয়ের আরেক কালো বিড়াল ছিলেন চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী। যিনি পর পর তিনবার রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যাবহার করে বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে বড় বড় প্রজেক্ট হাতিয়ে নেওয়া, বিনা প্রতিযোগিতায় ডিপিএম পদ্ধতিতে যন্ত্রাংশ সরবরাহের নামে হাজার কোটি টাকার অপরিসীম দুর্নীতি। আর এসব কাজে সরাসরি নিজের ছেলে ফারাজ করিম ও শ্যালক খান মোহাম্মদ এহসানকে ব্যবহার করেছেন তিনি। সহযোগী হিসেবে ছিলেন রেলওয়ের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাও।
এর আগে রেলের কালো বিড়াল হিসেবে খ্যাতি পান আওয়ামী লীগের রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। যার অনিয়ম-দূর্নীতির ইতিহাস গণমাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব হলেও ফজলে করিম চৌধুরীর দূর্নীতির ইতিহাস প্রকাশ্যে আনতে কেউ সাহস করেনি বিগত সময়ে। এতটাই ভয়ঙ্কর ছিলেন তিনি।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ফজলে করিম চৌধুরী কারাগারে এবং ছেলে ও শ্যালক পলাতক থাকায় ফজলে করিম চৌধুরীর কিছু দূর্নীতির তথ্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। তবে বহাল তবিয়তে রয়েছেন রেলওয়ের উর্ধ্বতন সেই অসাধু কর্মকর্তারা।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। যারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ফজলে করিম চৌধুরীর ভয়ঙ্কর সব দূর্নীতি নিরবে নিভৃতে সয়ে গেছেন।
তাদের ভাষ্যমতে, ফজলে করিম চৌধুরী ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হন। এরপর তিনি প্রথমবার বাংলাদেশ রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন।
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য হয়েও তিনি দ্বিতীয়বার রেলপথ মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য হয়ে তৃতীয়বারের মতো একই মন্ত্রণালয়ের সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হন। যা ছিল লীজ নেওয়ার মতো।
একাধারে দশ বছর রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দ্বায়িত্বে থাকাকালে তিনি রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যাবহার করে বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে বড় বড় প্রজেক্ট হাতিয়ে নেন এবং বিনা প্রতিযোগিতায় ডিপিএম পদ্ধতিতে যন্ত্রাংশ সরবরাহের নামে করেছেন হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি।
এক্ষেত্রে তিনি সরাসরি ব্যবহার করেছেন তার ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী ও শ্যালক খান মোহাম্মাদ এহসানকে। এই খান মোহাম্মদ এহসানের মালিকানাধীন মূল কোম্পানি হচ্ছে NGGL গ্রুপ (Next Generation Graphics Ltd)| NGGL গ্রুপের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করে দেখা যায়, এই প্রতিষ্ঠানের আরো ২টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- (১) Fav Diesel Sales & Service এবং (২) Maximum Support Limited|
বাংলাদেশ রেজিট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের (আরজেএসসি) নিবন্ধন অনুসারে রেকর্ড পর্যালোচনা করে জানা যায়, ফারাজ করিম চৌধুরী ও তার মামা এহসানের মালিকানায় ফিফটি ফিফটি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নিবন্ধিত হয় কোম্পানি দুটি। ফারাজ করিম ও তার মামা এহসানের মধ্যে হওয়া একটি গোপন ব্যবসায়িক চুক্তির কপিও সংরক্ষিত রয়েছে দৈনিক ঈশানের কার্যালয়ে।
তবে ফারাজ করিম চৌধুরী বিভিন্ন গণমাধ্যমে দম্ভ করে বলতেন, তিনি নামে-বেনামে নয়, সরাসরি নিজ নামে DEUTZ Engine Germany এবং IRCON International India- এই দুটি কোম্পানির মাধ্যমে ব্যবসা করেন। বিদেশি দুই কোম্পানির মাধ্যমে ব্যবসা করার কথা ঘোষণা করলেও, সুকৌশলে তার ও তার মামার মালিকানাধীন দেশীয় দুটি অংশীদারিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের নাম গোপন রাখেন।
অনুসন্ধানেও মিলেছে, ফারাজের বিদেশি প্রতিষ্ঠান Deutz Engine Germany ব্যবহার করে তাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠান Fav Diesel Sales & Service এর মাধ্যমে এবং IRCON International India ব্যবহার করে তাদের আরেক দেশীয় প্রতিষ্ঠান Maximum Support Limited এর মাধ্যমে ফজলে করিম চৌধুরীর সরাসরি প্রভাব প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা দেখিয়ে কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন। বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপে ফারাজ করিম ও এহসান ব্যবহার করেন ফজলে করিম চৌধুরীর সরাসরি হস্তক্ষেপ ও সর্বময় শক্তি।
সূত্র মতে, ফজলে করিম চৌধুরী সিন্ডিকেট দরপত্র আহ্বান না করে প্রতিযোগিতাহীন ডিপিএম পদ্ধতিতে যন্ত্রাংশের মূল্য কয়েকশ গুণ বাড়িয়ে কাজ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তাদের ওপর চালাতেন অত্যাচারের স্টিম-রোলার, দিতেন অমানষিক চাপ এবং অফিসিয়ালি করতেন অপমান-অপদস্ত ও অশ্রাব্য গালাগালি।
সংশ্লিষ্ঠ কোনো রেলওয়ে কর্মকর্তা যন্ত্রাংশের প্রাক্কলিত মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি করতে রাজি না হলে এবং ডিপিএম পদ্ধতিতে ক্রয় না করে খোলা দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ক্রয় করতে চাইলে, তার ওপর নেমে আসত অমানষিক নির্যাতন এবং পড়তেন ব্যাপক সামাজিক হেয় প্রতিপন্নের মুখে।
শুধু তাই নয়, এসব রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ডাক পড়তো রেলপথ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় এবং স্বয়ং ফজলে করিম চৌধুরী সবার সামনে ও অন্যান্য রেল কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তাদের অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতেন।
ফজলে করিম চৌধুরীর সঙ্গে মেজর জেনারেল জিয়ার ছিল দীর্ঘদিনের অন্যরকম ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যা তিনি ব্যবহার করেছেন তার রাজনৈতিক হত্যার মিশনে এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরকে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের কাজে। তারই এক অনন্য উদাহরণ বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামানকে ব্ল্যাকমেইলিং করা।
মেজর জেনারেল জিয়ার সহযোগিতায় মোবাইল ট্র্যাকিং করে শামসুজ্জামান ও তার ছেলে সাদমান জামানের মধ্যকার আলোচনার কিছু স্পর্শকাতর তথ্য, লন্ডনে থাকা ব্যাংক একাউন্টের তথ্য এবং ইজরায়েলি গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সঙ্গে সাদমান জামানের সংযোগ থাকার মতো তথ্য খুঁজে পান ফজলে করিম চৌধুরী। এসব ব্যবহার করে চলতে থাকে মহাপরিচালক শামসুজ্জামানকে ব্ল্যাকমেইলিং, হুমকি-ধামকি ও দুদকের ভয়।
আর ব্ল্যাকমেইলিংয়ের পরবর্তী ধাপ হিসেবে ওই সময়ে জাগো নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমসহ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ প্রচার করা হয়। পরবর্তীতে চলতে থাকা এই ব্ল্যাকমেইলিংয়ের বিনিময়ে ফজলে করিম আদায় করে নেন ৩৬ কোটি টাকা মূল্যের কার্যাদেশ রেলওয়ের ডিজিটাল ওয়াশিং প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ।
যা উদ্বোধনের দিন থেকে আজ অবধি অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। অথচ বলা হয়েছে, এই প্ল্যান্টে ১০ মিনিটের মধ্যে একটি ট্রেন (গড়ে ১৪টি বগি) পরিষ্কার করা যাবে। এতে ঝকঝকে তকতকে হবে রেলের প্রতিটি বগি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারবেন যাত্রীরা।
২০১৭ সালের ৪ অক্টোবর যাত্রীদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে ভ্রমণের জন্য এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুটি অটোমেটিক ট্রেন ওয়াশিং প্ল্যান্ট কেনা হয়। যার একটি ওয়াশিং প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয় ঢাকার কমলাপুরে এবং অন্যটি স্থাপন করা হয় রাজশাহীতে।
পরের বছর সেপ্টেম্বরে প্ল্যান্ট স্থাপনের পর পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন পরিষ্কার করা হয়। এরপর ওই বছরের ৮ নভেম্বর আনুষ্ঠিকভাবে প্ল্যান্ট দুটি উদ্বোধন করেন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। ওই দিন একটি ট্রেন যাত্রী নামানোর পর ট্রেনের বগিগুলোর উভয় পাশ, ছাদ, আন্ডার গিয়ার সুচারুভাবে পরিষ্কার করা হয়।
এরপর থেকে প্ল্যান্টটির বা ঘরের দুপাশে ফটকে তালা লাগানো। বাইরে আরকটি ঘরের সামনে বড় পানির ট্যাংক, পাইপসহ বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। সেগুলোতেও তালা লাগানো রয়েছে।
এর পাশে আলাদা একটি প্ল্যাটফর্মে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে হুইল পাউডার ও ব্রাশ দিয়ে ট্রেন পরিষ্কার করছেন শ্রমিকরা। একেকটি ট্রেন পরিষ্কার করতে তাদের ৪০ থেকে ৫০ মিনিট সময় লাগছে। তবে ট্রেনের নিচের অংশ তারা পরিষ্কার করতে পারছেন না।
আর এই স্বয়ংক্রিয় ট্রেন ওয়াশিং প্ল্যান্টের প্রকল্প কর্মকর্তা ছিলেন ফকির মহিউদ্দিন। যিনি সম্প্রতি এডিজি-আরএস পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। তিনি বলেন, প্ল্যান্ট দুটিতে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কোনো কাজ বাকি নেই। যন্ত্রপাতি সব সচল রয়েছে। প্ল্যান্ট দুটি রেলওয়ের অপারেশন বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক নানা সংকটে মূল্য বেশি হওয়ায় প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি সম্ভব হচ্ছে না, ফলে সচল করা আর সম্ভব হয়নি প্লান্ট দুটি।
এদিকে চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরী কারাগারে থাকায় এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি। এমনকি ফজলে করিমের ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী ও শ্যালক খান মোহাম্মদ এহসানও পলাতক থাকায় তাদের মতামত নেওয়াও সম্ভব হয়নি।