খড়া ছিল আষাঢ়ের শুরুতেই, মধ্য সময়ে এসে সাগরে লঘুচাপ। পরে তা মৌসুমি নিম্নচাপে পরিণত হয়ে বৃষ্টি ঝরিয়ে যাচ্ছে গত তিন দিন ধরে। এর মধ্যে ৭ জুলাই মঙ্গলবার ছিল ১৯ বছরের রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিপাত।
আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, মঙ্গলবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার। এতে কার্যত অচল হয়ে পড়ে চট্টগ্রাম। এর আগে ২০০৭ সালের ১১ জুন একদিনে বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল ৪০৮ মিলিমিটার।
সেদিন চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল আর পাহাড়ধসে মারা যান ১২৭ জন। সেই ১১ জুনকেও ছাপিয়ে গেছে মঙ্গলবারের ৪১২ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত। কিন্তু সেদিনের মতো এত প্রাণহানি ঘটেনি। তবে একেবারে ঘটেনি তা নয়, পাহাড় ও দেয়ালধসে মারা গেছেন এক নারী ও এক যুবক। দুই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৫ জন।
স্থবির জনজীবন
চলতি মৌসুমে জুন মাসে বৃষ্টির জন্য হাহাকার ছিল। স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৪ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয় ওই মাসে। জুনে স্বাভাবিক বৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল ৬১৩ মিলিমিটার, হয়েছে ৩৫১। আর জুলাই মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ সাধারণত ৬৯৪ মিলিমিটার। কিন্তু আজ এক দিনের বৃষ্টিতে তা অর্ধেক পার হয়ে গেছে।
এই বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, দোকানপাট, বাসাবাড়ি সব। নগরের কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, বহদ্দারহাট, মৌলভীপুকুর পাড়, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ ব্যাংক কলোনি, সিডিএ আবাসিক, সল্টগোলা ক্রসিং ও হালিশহর এলাকাসহ সর্বত্র পানি থই থই করছে।
বলতে গেলে ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম নগরীর জনজীবন। তলিয়ে গেছে বাসাবাড়ি, অফিস। বন্ধ রয়েছে বেশির ভাগ দোকানপাট। থেমে গেছে বিয়ের অনুষ্ঠান। তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী রোড। ডুবে গেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন। ফলে চট্টগ্রাম ষোলশহরে আটকে গেছে কক্সবাজারগামী পর্যটন এক্সপ্রেস, একইভাবে কক্সবাজারে আটকে গেছে চট্টগ্রামগামী প্রবাল এক্সপ্রেস।
মঙ্গলবার ভোর থেকে টানা ভারী বৃষ্টিতে চকবাজার, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, হালিশহর, দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ, প্রবর্তক মোড়সহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সড়কে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে যায়। এতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ, ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।
সকালের দিকে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে নির্ধারিত ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে। তবে আগে থেকে না জানায় অনেক শিক্ষার্থী বাসা থেকে বের হয়ে পথে নেমে জলাবদ্ধতার মধ্যে আটকা পড়ে। অনেকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর আবার বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হন।
কোমর সমান পানি মারিয়ে বাবার সঙ্গে স্কুল থেকে ফেরত আসা শিক্ষার্থী সাইমা রহমান বলল, 'স্কুলে পৌঁছে জানতে পারি আজকের পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। আগে থেকে জানানো হলে নোঙরা পানির মধ্যে এসে এমন ভোগান্তি পোহাতে হতো না।'
নগরীর কাতালগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা খোকন চৌধুরী বলেন, এমন পরিস্থিতি আগে দেখিনি। টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা আগেও হয়েছে, কিন্তু কখনো এত ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি বা এত দীর্ঘসময় স্থায়ী হয়নি। এখন বাসার মধ্যেই বন্দিজীবন কাটাতে হচ্ছে।
জলাবদ্ধতার কারণে গণপরিবহনের সংকটে বেশি বিপদে পড়েছে চাকরিজীবীরা। রিকশাভাড়া বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ, তবুও মিলছে না। পানিতে ডুবে সিএনজি, মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকারসহ বহু গাড়ি রাস্তায় অচল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ঢাকনাবিহীন লানা পানির নিচে ডুবে থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে পথচারীদের।
বহদ্দারহাটে রিকশাচালক এমরান হোসেন বলেন, 'রাস্তায় এত পানি যে অনেক জায়গায় রিকশা চালানোই সম্ভব হচ্ছে না। যাত্রীরাও ভয়ে আছে কখন খাদে পড়ে গাড়ি উল্টে যায়।
চকবাজার এলাকার বাসিন্দা আবুল মনছুরের অভিযোগ, প্রতিবছরের মতো এবারও ভারী বর্ষণে একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে নানা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে পানি জমে মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ ও নিম্ন আয়ের কর্মজীবীদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি।
টানা বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্যসেবায়ও। বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিচতলায় পানি ঢুকে জরুরি বিভাগ, ল্যাবরেটরি ও প্রশাসনিক কক্ষ প্লাবিত হয়েছে। এতে রোগী ও স্বজনদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। একই সঙ্গে বোয়ালখালীর বিভিন্ন এলাকা জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যায়। দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় জনজীবন আরও বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে।
এজন্য স্বল্প সময়ে অধিক বৃষ্টিপাতকে দুষলেন চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী। তিনি বললেন, ৫ জুলাই থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত তিন দিনে চট্টগ্রামে ৫৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টি ধারণ করার মতো সক্ষমতা রেখে জলাবদ্ধতা প্রকল্পটি নকশা করা হয়। অতিবৃষ্টিতে পানি জমলেও তা এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে নেমে যাবে।
বাড়ছে পাহাড়ধসের ঝু^ঁকি
এদিকে টানা বর্ষণে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে একাধিক আশ্রয়কেন্দ্র।
এদিকে আজ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় না থাকার অনুরোধ করছি।
সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর রেসকিউ টিম মাঠে কাজ করছে। বিভিন্ন প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করে পানি নিষ্কাশন ও জনদুর্ভোগ কমাতে কাজ করছে তারা। রাতেও আমি নগরের নিম্নাঞ্চল পরিদর্শন করবো।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, টানা ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে মহানগরে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় আটটি আশ্রয়কেন্দ্র সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সই করা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখার এক নির্দেশনায় এ তথ্য জানানো হয়।
এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড নগরের বিভিন্ন এলাকায় পানি নিষ্কাশনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হতে পারে। পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বৃষ্টিপাত কম ক্ষতি বেশি যেসব সালে
গত ২০২৩ সালের ৭ আগস্ট এক দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ায় বন্যা দেখা দিয়েছিল। তখন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনটি সদ্য স্থাপন করা হয়েছিল। উদ্বোধনের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু বৃষ্টি ও ঢলজনিত বন্যায় বেঁকে গিয়েছিল নতুন ওই রেলপথের প্রায় তিন কিলোমিটার।
সেদিন ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছিল মাত্র ৩২২ মিলিমিটার। তাহলে আজকের মৌসুমি বৃষ্টির তুলনায় সেদিনের বৃষ্টি ছিল প্রায় ৯০ মিলিমিটার কম। তবে শুধু চট্টগ্রামে নয়, ওই দিন বৃষ্টি হয়েছিল সাতকানিয়ার পূর্বদিকের জেলা বান্দরবানেও। সেখানকার পাহাড়ের ঢলও নেমে এসেছিল উপজেলাটির ওপর।
এর আগে ২০১৭ সালের ১৩ জুন চট্টগ্রামের পাশাপাশি রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধসে প্রায় ১৫০ জন মারা যায়। সেদিন চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত ছিল ১৭৭ মিলিমিটার। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ছিল রাঙামাটিতে।
যেসব সালে আরও বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড
চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের আরেক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল ২০১২ সালের ২৬ জুন, নগরীর আকবরশাহ মাজার এলাকায়। মারা গিয়েছিল ২৮ জন। ওই দিন ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৬৩ মিলিমিটার। আজকের চেয়ে যা প্রায় ৫০ মিলিমিটার বেশি ছিল।
তবে চট্টগ্রাম আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সর্বকালের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ২৪ ঘণ্টায় ৫১১ মিলিমিটার। ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট এটি রেকর্ড করা হয়েছিল। সে হিসাবে আজকের বৃষ্টিপাত প্রায় ১০০ মিলিমিটার কম।