বিশ্ব জুড়ে খবর পেতে মানুষ এখন মূলধারার মিডিয়ার চেয়ে সোশাল মিডিয়া ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মের দিকে বেশি ঝুকছে। রয়টার্স ইন্সটিটিউট ফর দি স্টাডি অফ জার্নালিজমের এক রিপোর্টে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত রয়টার্স ইন্সটিটিউট ফর দি স্টাডি অফ জার্নালিজম প্রতি বছর মিডিয়ার গতিপ্রকৃতি নিয়ে এই রিপোর্ট প্রকাশ করে।
চলতি বছরের শুরুতে ৪৮টি দেশের প্রায় এক লাখ মানুষের ওপর অনলাইনে একটি জরিপ চালায় গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ইউগভ'। সেই জরিপের ভিত্তিতেই রিপোর্টটি তৈরি করা হয়েছে।
জরিপে অংশ নেয়া ৫৪ শতাংশ মানুষ জানিয়েছে, জরিপের আগের সপ্তাহে তারা সোশাল মিডিয়া বা ভিডিও প্ল্যাটফর্ম থেকে খবর পেয়েছে। আর এআই চ্যাটবটগুলোকে হিসাবে ধরলে এই হার দাড়ায় ৫৬ শতাংশে। আর ৫২ শতাংশ মানুষ টেলিভিশনের খবর, ৫১ শতাংশ মানুষ সংবাদপত্রের ওয়েবসাইট বা অ্যাপ এবং ২১ শতাংশ মানুষ রেডিওর কথা বলেছেন।
গবেষণায় নেতৃত্বে থাকা জিম ইগান রিপোর্টে লিখেছেন, ২০২৬ সাল একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক। মিডিয়ার পুরনো ব্যবসায়িক মডেল এখন হুমকির মুখে। বৈশ্বিকভাবে ৫৪ শতাংশ মানুষ সোশাল মিডিয়া ও ইন্টারনেট ভিডিও থেকে খবর নিচ্ছে। কেবল ৪৫ বছরের বেশি বয়সীদের কাছে এখনো খবর পাওয়ার প্রধান মাধ্যম টেলিভিশন।
আয় কমছে মিডিয়ার
খবরের জন্য বৈশ্বিকভাবে এবারই প্রথম প্রচলিত মিডিয়াগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে সোশাল মিডিয়া। তবে বেশ কিছু দেশ এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত আগেই দেখা গেছে। অবশ্য ইওরোপের দেশগুলোতে মূলধারার মিডিয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ এখনো এগিয়ে রয়েছে।
বৈশ্বিক এই জরিপ অনুযায়ী, প্রতি ১০ জনের মধ্যে তিন জন জানিয়েছে, তাদের খবর পাওয়ার প্রধান উৎস সোশাল মিডিয়া বা ভিডিও প্ল্যাটফর্ম। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় অর্ধেক।
একেকটি সোশাল মিডিয়ায় খবরের ধরনও একেক রকম। বেশিরভাগ মানুষ নির্দিষ্ট করে খবর খুজতেই এক্স (সাবেক টুইটার) বা ইউটিউবে ঢোকে। কিন্তু ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে সাধারণত অন্য কিছু করার ফাকে মানুষের সামনে খবর চলে আসে।
গণমাধ্যমের অ্যাপ ও মূলধারার ওয়েবসাইটগুলোর অবস্থাও বেশ করুণ। জরিপে অংশ নেয়া কোনো বয়সী মানুষই সংবাদপত্রের অ্যাপ বা ওয়েবসাইটকে খবরের প্রাথমিক উৎস হিসেবে উল্লেখ করেনি।
বিবিসির সাবেক সিনিয়র নির্বাহী জিম ইগানের মতে, এর ফলে মিডিয়ার পাঠক বা দর্শকের কাছে পৌছানো, তাদের ধরে রাখা এবং আয় করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় করা কতটা চ্যালেঞ্জিং, তা জরিপের আরেকটি তথ্যে স্পষ্ট। মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ জানিয়েছে, অনলাইনে খবরের জন্য তারা টাকা খরচ করেন।
অন্যদিকে মূলধারার মিডিয়ার জায়গা দখল করে বিজ্ঞাপনের বাজারের বিশাল একটি অংশ নিজেদের পকেটে পুরছে গুগল ও মেটার মতো টেক জায়ান্টগুলো।
আস্থার সংকট
খবরের হালচাল নিয়ে ১৮০ পৃষ্ঠার এই রিপোর্টে গত কয়েক বছর ধরে চলা কয়েকটি প্রবণতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। ভিডিও কনটেন্টের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি, ব্যক্তিপর্যায়ের কনটেন্ট কৃয়েটরদের (নির্মাতা) প্রভাব বৃদ্ধি এবং মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়া এর মধ্যে অন্যতম।
'আস্থা'র কথা বিবেচনাতেও মূলধারার মিডিয়ার জন্য কোনো সুখবর নেই। মাত্র ৩৭ শতাংশ মানুষ বলেছে, তারা বেশিরভাগ সময় খবরের ওপর আস্থা রাখে। খবরের জন্য মানুষ এখন এআই চ্যাটবটের ওপরও বেশি নির্ভর করছে।
রয়টার্স ইন্সটিটিউটের গত বছরের রিপোর্টের মূল ফোকাসও ছিল এটি। জরিপে অংশ নেয়া প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছে, তারা সপ্তাহে অন্তত একবার খবরের জন্য চ্যাটবট ব্যবহার করেন। গত বছর এই হার ছিল সাত শতাংশ।
জিম ইগান রিপোর্টে লিখেছেন, জেনারেটিভএআইয়ের দ্রুত প্রসারের সঙ্গে কিভাবে মানিয়ে নেয়া যায়, সেটাই এখনকার মিডিয়ার কর্তা ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।