রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) পরিকল্পনা উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের প্রকল্প পরিচালক (ভা.) জনাব আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। প্রকল্প পরিচালনায় অজ্ঞতা, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ঘুষ লেনদেন, বিল-ভাউচারে ডাবল ক্লেইম দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্নসাৎসহ কি নেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ। এসব অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পরও দৌরাত্ন্য থামছে না আবদুল গফুরের। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে দলবল নিয়ে ভিসি কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন তিনি। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে মিলেছে পাহাড়সম দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য। এরমধ্যে চাকরিতে নিয়োগের জালিয়াতির তথ্য ‘চোখ কপালে উঠার মতো’। সূত্র জানায়, অনিয়ম-দূর্নীতির দায়ে চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি পিডি আবদুল গফুরকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ চলমান রাখতে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল আলমকে প্রকল্প পরিচালক ও দুই সহযোগী অধ্যাপককে অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আদেশ দেওয়া হয়। রাবিপ্রবির ভারপ্রাপ্ত রেজিষ্টার মো. জুনাইদ কবির গত ৪ মে সোমবার এই আদেশপত্রে স্বাক্ষর করেন। আদেশপত্র অনুযায়ী দায়িত্বগ্রহণের চেষ্টা করা হলে আবদুল গফুর ছাত্রদল পরিচয়ে কতিপয় বিপথগামী ছাত্র ও বহিরাগত লোকজন নিয়ে ৫ মে মঙ্গলবার সকালে ভিসি কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ সময় প্রতিষ্ঠানের কাজে ঢাকায় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আতিয়ার রহমান। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভিসি আতিয়ার রহমান মঙ্গলবার দিনগত রাত সাড়ে ৮টায় দৈনিক ঈশানকে বলেন, আবদুল গফুর ছাত্রদল পরিচয়ে বহিরাগত কিছু লোক নিয়ে কার্যালয়ে তালা দেওয়ার কথা শুনেছি। এই সময় আমি ছিলাম না, দাপ্তরিক কাজে আমি ঢাকায় ছিলাম। এখনো আছি। আবদুল গফুরের এসব কাজ সম্পূর্ণ অনাকাঙ্খিত। কারণ তিনি বহিস্কৃত। এ অবস্থায় তিনি এ কাজ করতে পারেন না। আবদুল গফুর এসব কেন করছেন জানতে চাইলে ভিসি ড. আতিয়ার রহমান বলেন, আবদুল গফুর আপাদমস্তক একজন করাফটেড লোক। ভারপ্রাপ্ত পিডি থাকা অবস্থায় তিনি সীমাহীন দূর্নীতি করেছেন। ইন্টেরিম সরকারের সময় তিনি নিয়োগে অনিয়ম করে ভারপ্রাপ্ত পিডি হয়েছিলেন। অনিয়ম ঠেকাতে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ কারণে আবদুল গফুর আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে এক কেটি ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছে। যার লোভের বশবর্তী হয়ে ছাত্রদলের নেতা পরিচয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন-চারজন শিক্ষার্থী বহিরাগত ১০-১২ জন লোক নিয়ে হুমকি ধমকি দিচ্ছে। তারা আবদুল গফুরের বহিষ্কার আদেশ তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। তাদের নিয়ে আবদুল গফুর মঙ্গলবার সকালে আমার কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। চাকরিতে নিয়োগে অনিয়ম:বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্টারের তথ্যমতে, আবদুল গফুর শিক্ষা জীবনে দু'টি তৃতীয় বিভাগ থাকা এবং পূর্বে সরকারি,আধা সরকারি কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকুরির অভিজ্ঞতা না থাকা সত্বেও ২০১৭ সালের ১০ জুলাই সরাসরি ৭ম গ্রেডে সহকারী পরিচালক পদে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরে যোগদান করেন। যেখানে ২০তম গ্রেডে যোগদান করতে শিক্ষাজীবনে তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য নয়, সেখানে ৭ম গ্রেডে যোগদান বিস্ময়কর। এছাড়া বয়সসীমা ৩৫ অতিক্রম করলেও সব বাঁধা পার হয়ে যান তৎকালীন রেজিস্ট্রার জনাব অন্জন কুমার চাকমা'র সাথে ৭ লাখ টাকা লেনদেনের বিনিময়ে। একইসাথে নিয়োগ বিধান অনুযায়ী ১ জন প্রার্থী নিয়োগের জন্য কমপক্ষে ৩ জন প্রার্থী অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও ভাইবাতে শুধুমাত্র ২ জন প্রার্থীর অংশগ্রহণেই নিয়োগ হয় আবদুল গফুরের।সরকারি অর্থ ডাবল ক্লেইম করা:নথির তথ্যমতে, ট্রেনিং কিংবা মিটিং এর কাজে ঢাকায় যাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম ভঙ্গ করে কর্মচারীদের নামে অগৃম উত্তোলন করে পরবর্তীতে প্রত্যার্পন নেওয়া ছাড়াও ডিএ নিতেন তিনি। একটি নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর একদিনের ট্রেনিং এর জন্য একজন কর্মচারীর নামে ২৫ হাজার টাকা অগৃম উত্তোলন করা হয়েছে। যদিও তিনি একই প্রশিক্ষণে যেতে নিয়েছেন ডিএ বিল। কর্মচারীর নামে অগৃম গ্রহণ, একই অর্থ ডাবল ক্লেইম করেন তিনি। যে কর্মচারীর নামে অগৃম এবং প্রত্যার্পন নেওয়া হয় উক্ত প্রশিক্ষণে তিনি যাননি এবং তাঁর অংশগ্রহণের সুযোগ ও ছিলো না। পরবর্তীতে ১১ নভেম্বর এই বিলের প্রত্যার্পন নেওয়া হয়। আরেকটি নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়,একজনের নামে অগৃম নেওয়া হয়েছে কিন্তু যার নামে নেওয়া হয়েছে নথিতে তাঁর স্বাক্ষর নেই এবং একই কাজে পিডি আবদুল গফুর নিজের নামেও বড় অংকের টাকা প্রত্যার্পণ তুলেছেন। সেই সাথে ট্রেনিং এ যাওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়েছেন ডিএ। ভ্রমণ কিংবা ট্রেনিং এ যাওয়ার ক্ষেত্রে এমন অগৃম নেওয়ার বিধান নেই বলে জানা যায়। ঢাকায় যতবার মিটিং কিংবা গমন করেছেন ব্যাক্তিগত কাজে হলেও নিয়েছেন অগৃম এবং ডিএ। অগৃম নেওয়ার মাধ্যমে ভূয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। একইসাথে কর্মচারীদের নামে অগৃম নেওয়ার বিধান সরকারি চাকুরী নীতিমালায় না থাকলেও কর্মচারীকে দিয়ে জোরপূর্বক অগৃম নিয়ে নিজের পকেট ভারী করেছেন তিনি। মূলত আবদুল গফুর তাঁর অধীনস্থদের ভয় ভীতি প্রদর্শন করে এবং বাধ্যতামূলকভাবেই সবার নামেই অগৃম ও প্রত্যার্পন নিয়ে নিজের পকেট ভারী করতেন।ফটক নির্মাণে অনিয়ম :বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক ও নেম প্লেটের কাজ প্রীতি এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান করলেও মূলত প্রতিষ্ঠানটি আবদুল গফুর নিজের। যার দরুন কাজ শুরু করার পূর্বেই রানিং বিল দিয়ে ২০২৫ সালের ২৪ জুন ৩৯ লাখ টাকা প্রকৌশলীদের স্বাক্ষর ছাড়াই তুলে নেন। অথচ এখনো ৩৯ লাখ টাকার সমপরিমাণ কাজই হয়নি বলে জানা গেছে। এছাড়া ৮০ হাজার টাকা দামের টেবিলকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেখিয়ে ৪টি টেবিল ক্রয়সহ কোনো প্রকারের টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়া নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিয়ে নিজের পকেট ভারী করেন পিডি আবদুল গফুর।উপাচার্য পরিবর্তনে কোটি টাকা ব্যয়:দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শোকসভার পরে কোটি টাকা ব্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পরিবর্তনের জন্য জিসান নামে এক ছাত্রকে বলেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নিউজ করানো, অসাধু শিক্ষার্থীদের টাকা দেওয়ার মত অনৈতিক কাজে লিপ্ত রয়েছেন তিনি। প্রকল্প পরিচালক (ভা.) হন যেভাবে:নন-টেকনিক্যাল লেখাপড়া করে সাধারণ ডিগ্রি পাস করে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ মামুনুল ইসলাম, যুগ্ম সচিব মীর্জা মোহাম্মদ আলী রেজার সাথে অর্থ ও লেকের মাছ,ফল উপহারের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক হয়ে যান আবদুল গফুর। তাঁর পূর্ণ প্রকল্প পরিচালক হওয়ার যোগ্যতা না থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক করা হয়।প্রকল্প পরিচালনায় অজ্ঞতার দরুন প্রকল্পের কাজ শুরু করার পূর্বে এনভায়রনমেন্টাল ইমপেক্ট এ্যাসেসমেন্ট (EIA) রিপোর্ট এবং পরিবেশ অধিদপ্তর হতে পাহাড় কাঁটার অনুমোদন না নিয়ে ভবন তৈরীর কাজ শুরু করে এবং প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত পাহাড় কাঁটায় পরিবেশ অধিদপ্তর হতে মামলা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।যুগ্ম সচিব মীর্জা মোহাম্মদ আলী রেজার গলা পর্যন্ত গফুরের দেওয়া লেকের মাছ বলেও দম্ভ করেন এই পিডি। একইসাথে মীর্জা মোহাম্মদ আলী রেজার পরিবারের পাহাড় ভ্রমণের দায়িত্বও নিতেন আবদুল গফুর।টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ঘুষ লেনদেন: ঠিকাদারদের মতে, বিশ্বিবিদ্যালয়ের ৪টি ভবন তৈরী করতে শিক্ষা প্রকৌশল তদারকিতে থাকলেও প্রকল্প পরিচালক হওয়ার সুবাদে শিক্ষা প্রকৌশলের মাধ্যমে ঠিকাদারদের সাথে লেনদেন এবং বিল দেওয়ার ক্ষেত্রেও লেনদেন করেছেন তিনি। কনসালট্যান্সি ফার্ম শেলটেক প্রাইভেট লি. এর সাথেও রয়েছে অবৈধ লেনদেন।সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প কাজে কনসালটেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড শেলটেক কাজ পরিদর্শনে আসেন। যা দেখে মনে হয়েছে প্রকল্প পরিচালক (ভা.)আবদুল গফুরের সোনায় সোহাগা প্রকল্প। একদিনের কাজ পরিদর্শনে আবদুল গফুর ভ্যাট ট্যাক্স বাদেও নিজ নামে বিল করেন ৭৪ হাজার ৫৯৯ টাকা। যেখানে তিনি বোট ভাড়া,গাড়ি ভাড়া,স্টেশনারী,দুপুরের খাবারসহ নানাবিধ ভুয়া খরচ দেখিয়ে নিজের পকেট ভারী করেন। কনসালটেন্ট নিয়মিত কাজ তদারকি করার কথা থাকলেও প্রকল্প পরিচালকের সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে মাসে দুই মাসে একবার আসেন তাঁরা। কনসালটেন্টের আগমন উপলক্ষে প্রতিবারই লক্ষ টাকার খরচ দেখিয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তা, কর্মচারীর নামে নিয়ে পকেট ভারী করায় ছিলো আবদুল গফুরের সরকারি অর্থ আত্মসাৎের কৌশল। মাষ্টারপ্ল্যান ফাইলের ৩৮নং পৃষ্ঠায় দেখা যায় একজন কর্মচারী নিশান চাকমার নামে সিপিআরসি মিটিং নামে নেওয়া হয় ২ লাখ ৬৫ হাজার পাঁচ শত টাকা। আব্দুল হকের নামে ২ লক্ষ ৩৯ হাজার পাঁচ শত পঞ্চাশ টাকা। দপ্তরের মনজুরুল ইসলামের নামে অগৃম নেওয়া হয়েছে অনেক বেশি, তাঁর মধ্যে বেশ কিছু ফাইলে তাঁর স্বাক্ষরও নেই।রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রস্তাব বিস্তার:নিজের অযোগ্যতা ও দুর্নীতি ডাকতে ৫ই আগস্ট ২০২৪ এর পর আওয়ামী লীগ হতে সার্বিক সুবিধাভোগী পিডি আবদুল গফুর রাতারাতি বনে যান বিএনপি। আওয়ামী এমপি,মন্ত্রী কিংবা নেতাদের সাথে শত শত ছবি তোলা কিংবা আওয়ামী পন্থী উপাচার্যের সব সুবিধাভোগী গফুর এখন বিএনপির কথিত বড় নেতা। নিজেকে বিএনপি'র বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় দাবি করলেও ছাত্রজীবনে ছাত্রদল কিংবা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তাঁর বেড়ে উঠা খাগড়াছড়ির মহালছড়িতেও বিএনপির রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টতা ছিলোনা বলে জানা যায়। অথচ অর্থ লেনদেনে মাধ্যমে রাবিপ্রবি ছাত্রদলের আহবায়ক ও সদস্য সচিবকে ব্যবহার করে অনৈতিক প্রস্তাব ও প্রভাব বিস্তার করছেন আবদুল গফুর। যদিও এর সাথে ছাত্রদলের সম্পৃক্ততা নেই বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। অনিয়ম-দূর্নীতিসহ শৃঙ্খলা বিরোধী নানা কাজের সংশ্লিষ্ট থাকায় চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি সাময়িক বহিষ্কার হন পিডি আবদুল গফুর। এরপর থেকে অর্থ খরচের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাব বিস্তারসহ বিএনপি নেতাদের ব্যবহার করে আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে পিডি আবদুল গফুর।এ বিষয়ে জানতে রাবিপ্রবির বরখাস্ত হওয়া পিডি আবদুল গফুরের মুঠোফেনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এমনকি হোয়াটস্ অ্যাপ অপশনে কথা বলার বিষয়ে মেসেজ লিখে পাঠালেও তিনি কোন সাড়া দেননি।
১৩ দিন আগে

বউয়ের নামে কিনেছেন জমি। যেখানে নির্মাণ করেছেন বিলাস বহুল ৭ তলা বাড়ি। ব্যবহার করেন প্রিমিও গাড়ি। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা ভাইসহ পরিবারের সদস্যদের নামে চট্টগ্রাম মহানগর ও নিজ জন্মস্থান আনোয়ারায় কিনেছেন সারি সারি জমি। বিভিন্ন ব্যাংকে জমা রেখেছেন কাড়ি কাড়ি টাকা। এসব কিছুই যেন মনে করিয়ে দেয় সেই স্বৈরাচারি শেখ হাসিনার আলোচিত দূর্নীতিবাজ ড্রাইভার জাবেদ আলীর অঢেল সম্পদের কথা। মনে করিয়ে দেয় এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর রহমানের দূর্নীতির কথা। যাদের মতো অঢেল সম্পদের মালিক চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সাধারণ শাখার উপ-সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং ভুমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার প্রাক্তণ উচ্চমান সহকারি এইচ এম আলী আযম খান। তার কথায় এসব সম্পদের হিসাব-নিকাশ চললেও যেন নিজের কিছুই নেই। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের শোলকাটা গ্রামের মৃত মোজাম্মেল হক চৌধুরীর ছেলে এইচ এম আলী আযম খান এতটাই চতুর যে, নিজের নামে কেনা অঢেল সম্পদের অনেকটাই আড়াল করে রেখেছেন। ধন-সম্পদের শক্তিতে নিজ এলাকার মানুষকে মানুষ বলেও মনে করেননা তিনি। দখল করেছেন মানুষের জমি-পুকুরসহ নানা সম্পদ। পুলিশ দিয়ে হয়রানিসহ নানাভাবে করছেন জুলুম ও নির্যাতন। এমন একাধিক ভুক্তভোগীর সাথে কথা বলে তার অঢেল সম্পদের কিছু তথ্য সামনে আনা সম্ভব হয়েছে। ভুক্তভোগীদের একজন হলেন আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের শোলকাটা গ্রামের মো. আবদুল্লাহর ছেলে সমির উদ্দিন। তার প্রায় ১২ গন্ডা জায়গা জোরপূর্বক অবৈধভাবে দখল করে দেয়াল ও পিলার নির্মাণ করেছেন এইচ এম আলী আযম খান। এ নিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন তিনি। জেলা প্রশাসনের প্রভাব বিস্তার করায় তার সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে সমির উদ্দিন অঢেল সম্পদের কিয়দাংশের বিবরণ দিয়ে দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের বরাবরে পৃথক অভিযোগ দায়ের করেন। ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর দায়ের করা পৃথক অভিযোগে সমির উদ্দিন উল্লেখ করেন, এইচ এম আলী আযম খান বায়েজীদ থানার পূর্ব নাছিরাবাদ পলিটেকনিক মোজাফফর নগর আবাসিক এলাকার হাজী মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী সড়কে বিশাল জায়গায় ৭ তলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। বাড়িটির নাম ড্যাফোডিল ভবন। বর্তমানে জমিসহ এই বাড়ির বাজার মূল্য ২০ কোটি টাকারও বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এছাড়া তার রয়েছে ৩৭ লাখ ২৩ হাজার টাকা মূল্যের প্রিমিও কার। নম্বর চট্ট-মেট্রো-গ-১২-০৯০৮। অভিযোগে দাবি করা হয়, কর্মস্থলে সাধারণ মানুষের ভুমি অধিগ্রহণ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া ঘুষের অবৈধ অর্থে পেশায় গৃহিনী স্ত্রী মোহছেনা আক্তারের নামে কেনা বিশাল এই জায়গায় ৭ তলা ড্যাফোডিল ভবন নির্মাণ করেন। এই ভবনের বিদ্যুতের মিটারও স্ত্রী মোহছেনার নামে। মিটারের নম্বর হচ্ছে ০১০৪১০০৯৫৯২০, ০১০৪১০০৯৪৮৪৮। বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ভূমির ক্রয়কৃত মালিকানা ছাড়া বিদ্যুৎ মিটার প্রদান করেন না। এভাবে তিনি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা আপন ভাইসহ পরিবারের সদস্যদের নামে জমি ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ কিনেছেন। নগরীর বিভিন্ন ব্যাংকে স্বজনদের হিসাবে জমা রেখেছেন কাড়ি কাড়ি টাকা। দূর্নীতি আড়াল করতে তিনি এই উপায় অবলম্বন করেছেন। এর মধ্যেও তিনি নিজের নামে অনেক সম্পদ কিনেছেন। দূর্নীতি আড়াল করতে তিনি এসব গোপন রেখেছেন। এমন একটি জমি কেনার তথ্য মিলেছে আনোয়ারা সাব রেজিষ্ট্রার অফিসে। অফিসের দলিলমুলে দেখা যায়, এইচ এম আলী আযম খান গত ২০১৮ সালের ১২ এপৃল ৫,২৩,২০,০০০/-(পাঁচ কোটি তেইশ লক্ষ বিশ হাজার) টাকা মূল্যে ১০ একর জমি কিনেছেন। জমির দলিল নং ১৬৫৩। যেখানে তিনি নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সাধারণ শাখায় উপ-সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের সাথে আলী আযম খান। ছবি : দৈনিক ঈশানএর আগে ২০২০ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকায় এইচ এম আলী আযম খানের দুর্নীতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যার শিরোনাম ছিল 'কমিশন' চেক উড়ে এলএ শাখায়। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভূমি অধিগ্রহণে ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত 'কমিশন' নেওয়া হয়। আর অধিগ্রহণের চেক গ্রহণের আগেই কমিশনের চেক প্রদান করতে হয়।অনিয়মের এই চক্রে জড়িত সার্ভেয়ার কানুনগো, অফিস সহকারী, অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, ব্যাংক ও হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মকর্তা ছাড়াও ডজনখানেক সাংবাদিক রয়েছে। রয়েছে অর্ধশতাধিক দালালচক্র। যার মধ্যে নজরুল নামে এক চেইনম্যানকে গ্রেপ্তার করে দুদক। ওই সময় তার কাছ থেকে ৫৮ লাখ টাকাসহ কয়েকটি চেক উদ্ধার করে দুদক কর্মকর্তারা। আর এই দূর্নীতির মূল হোতা ছিলেন এইচ এম আলী আযম খান। তিনি তখন এলএ শাখার উচ্চমান সহকারী ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রামে অন্তত সরকারের ১৩১টি প্রকল্প থেকে ভুমি অধিগ্রহণে হাজার হাজার ভুমির মালিক থেকে ১০-১৫% কমিশনে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এইচ এম আলী আযম খান। যা এখনো চলমান। ভাগবোটায়ারায় তুষ্ট জেলা প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নেক নজরে ফ্যাসিবাদের দোসর এইচ এম আলী আযম খান পদোন্নতি পেয়ে বসে যান ১০ম গ্রেডে উপ-সহকারী প্রশাসনকি কর্মকর্তা হিসেবেও। এরপর তার দূর্নীতির গতি আরও বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, তার বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি জেলা প্রশাসন। তবে বিষয়টি তদন্ত করতে দূর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি গত এপৃল আনোয়ারায় আলী আযম খানের গ্রামের বাড়ি পরিদর্শন করেন। চট্টগ্রাম মহানগরসহ তার সম্পদের খোঁজে সক্রিয় রয়েছে দুদক টিম। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এইচ এম আলী আযম খান জেলা প্রশাসনে শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তোলেছেন। তার মাথার ওপর আশীর্বাদের হাত রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের দূর্নীতিবাজ সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. ইউনুচের। যার মাধ্যমে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এলএ পর্যন্ত পৌছে যায় ভুমি অধিগ্রহণের ভাগ-বাটোয়ারার অর্থ। এর সত্যতা মিলেছে জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তার মুখে। এইচ এম আলী আযম খান সম্পর্কে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, এইচ এম আলী আযম খান তো আপাদমস্তক একজন দূর্নীতিবাজ। জেলা প্রশাসনের এলএ শাখা সম্পূর্ণ তার কথা মতো চলে। তার এখন যে সম্পদ রয়েছে তার কানাকড়িও জেলা প্রশাসনের অনেক এডিসি-ডিসিরও নেই। জেলা প্রশাসনের সংস্থাপন শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবুদুর রহিম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তার এত সম্পদ কল্পনা করা যায় না। অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. ইউনুচ তো এইচ এম আলী আযম খানের প্রিয় মানুষ। দু‘জনের বাড়িও এক এলাকায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এইচ এম আলী আযম খান মুঠোফোনে বলেন, আমার কোন জমি ও ভবন নেই। আরেকজনের ভবনের ছবি এনে আমার বললে তো হবে না। আর আমার নিজস্ব কোন গাড়িও নেই। আরেকজনের গাড়িতে চড়ি। গাড়িটি আমার আত্নীয়ের। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ভাই এসব বিষয়ে কথা বলতে আমার ভাল লাগছে না। অন্য বিষয়ে কথা বললে আপনার সাথে আমার বন্ধুত্ব হতে পারে। সমির নামে এক প্রতিবেশিকে এসব অভিযোগের জন্য দায়ী করে তিনি বলেন, তার সাথে জায়গা-জমি নিয়ে আমার ঝামেলা আছে। এ কারণে গত ৭-৮ বছর ধরে সে এসব করছে। এ কারণে তাকে আমি থানায়ও দিয়েছি। জেলও খেটেছে। এসব কাজ আর না করার জন্য মুচলেকাও দিয়েছে। এরপর কিছুদিন সে নিরব ছিল, এখন আবার শুরু করেছে। অন্য আরেক প্রশ্ন করা হলে এইচ এম আলী আযম খান বলেন, ভাই এখন আমি ব্যস্ত আছি, আপনার সাথে পরে কথা বলব বলে নিজেই ফোনের সংযোগ কেটে দেন তিনি। কিন্তু পরে তিনি আর কোন ফোনকল রিসিভ করেননি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভুমি অধিগ্রহণ শাখার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কামরুজ্জামানের মুঠোফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। ব্যস্ততা দেখিয়ে তিনি একটি টেক্সট মেসেজে জানান, তিনি নিজেই ফোন করে কথা বলবেন। কিন্তু তিনি ফোন আর করেননি। ফলে কথা বলতে রবিবার দুপুরে দপ্তরে গেলেও তিনি ছিলেন না। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত না। এমন কোন অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। আমি আসার পর কোন অভিযোগ থাকলে বলেন। বিষয়টির খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। (দ্বিতীয় পর্ব আসছে শীঘ্রই)
২২ দিন আগে