আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মীর মোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে পদোন্নতিতে নজিরবিহীন অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি, সরকারি গাড়ি ও সুবিধার চরম অপব্যবহার এবং ব্যাংকের আর্থিক হিসাবে কারসাজির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত শেষ করে তার বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় মামলা দায়ের ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা হয়েছে। লিখিত অভিযোগে মীর মোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে দ্বৈত সুবিধা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়েছে।
তিনি ব্যাংকের গাড়ি ব্যবহার করার পাশাপাশি সরকারের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা তোয়াক্কা না করে প্রতি মাসে নগদ ৫০ হাজার টাকা পকেটে ভরছেন। এখানেই শেষ নয়, তিনি একই সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ব্যাংকের অপর একটি গাড়ি সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়মিত ব্যবহার করছেন। এই দুর্নীতির সত্যতা নিশ্চিত করতে গাড়ির লগবুক, ওভারটাইম বিল এবং জ্বালানি খরচের নথি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
এছাড়া পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় এই এমডির সুনির্দিষ্ট অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ব্যাংকের একজন নারী কর্মকর্তাকে চরমভাবে হয়রানি ও হেনস্তা করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকটির বিগত কয়েক বছরের আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনা করে অভিযোগপত্রে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী: শ্রেণিকৃত (খেলাপি) ঋণ: ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকটিতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৩২৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩১ কোটি ২৭ লাখ টাকায়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র কয়েক মাসে তা আশঙ্কাজনকভাবে লাফিয়ে বেড়ে ৪৩৪ কোটি ৮০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
মুনাফার মারপ্যাঁচ: ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকটি ৪৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা নিট লোকসান গুনেছিল। অথচ ঠিক পরের অর্থবছরেই (২০২৪-২৫) রহস্যজনকভাবে মাত্র ২ কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই সময়ে যেখানে ব্যাংকের পরিচালনাগত মুনাফা কমেছে এবং খেলাপি ঋণ হু হু করে বেড়েছে, সেখানে নিট মুনাফা দেখানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মূলত হিসাবের খাতায় কারসাজি ও শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়ে ব্যাংকের প্রকৃত ভঙ্গুর আর্থিক চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করেছেন এমডি।
এছাড়া বিপুল পরিমাণ পুনঃতফসিলকৃত ঋণের হিসাবকে আড়ালে রেখে কাগজ-কলমে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর মাধ্যমে ব্যাংকটিকে চরম আর্থিক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের সপক্ষে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, ভিডিও ফুটেজের লিংক এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর নথিও প্রমাণস্বরূপ অভিযোগপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাবেক সরকারের আমলে বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে মীর মোফাজ্জল হোসেন ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি একই পদে বহাল ছিলেন। একইভাবে বর্তমান সরকারের সময়েও বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, ব্যাংকের পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় মীর মোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অনিয়মের অভিযোগটি এরই মধ্যে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি এই জালিয়াতির সত্যতা পেয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয় এখন ওই এমডির বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে।
এসব বিষয়ে জানতে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মীর মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।