চট্টগ্রাম মহানগরে পানি সংকট নিরসনে ‘পানির ব্যবহার ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা’ বিষয়ক সুয়ারেজ প্রকল্প ঘিরে ১৪ দিনের প্রশিক্ষণের নামে বিলাসী ভ্রমণে চীনে রয়েছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার দুই প্রকৌশলী।
বিস্ময়ের বিষয়, ৫ হাজার ২১৯ কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে দক্ষিণ কোরিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অথচ প্রশিক্ষণের জন্য সফরে রয়েছেন চীনে।
আরও বিস্ময়ের ব্যাপার, প্রকল্প কাজও প্রায় শেষের সংশ্লিষ্ট সুয়ারেজ প্রকৌশলীদের কাউকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এই প্রশিক্ষণে। এমনকি প্রকল্প কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি এখনও। প্রায় অর্ধেক কাজ বাকি রয়েছে।
আর এমন সময়েই চীনে প্রশিক্ষণে গেছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম এবং কর্ণফুলী পানি শোধানাগার প্রকল্প-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম রবিউল হোসেন। তালিকায় মড-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ইউসুফের নাম থাকলেও শেষ মুহূর্তে তিনি বাদ পড়েন।
ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রশিক্ষণকে ‘বিলাস সফর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
চলতি বছরের ৭ মে জারি করা এক অফিস আদেশে চট্টগ্রাম ওয়াসার তিন কর্মকর্তাকে ওই প্রশিক্ষণের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়। আদেশে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে চীন সরকারের সহায়তায় ৪ থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত ১৪ দিনের এই প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হবে।
ওই আদেশে আরও বলা হয়, ট্রানজিটসহ পুরো সফরকাল ‘দায়িত্ব পালন’ হিসেবে গণ্য হবে। সফরসংক্রান্ত সব ব্যয় বহন করবে চীন সরকার এবং এতে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আর্থিক সম্পৃক্ততা থাকবে না। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তারা পানির ব্যবহার ও স্যানিটেশন প্রযুক্তি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করবেন।
তবে দুই দিন পর, ৯ মে জারি করা আরেক আদেশে মুহাম্মদ ইউসুফকে বাদ দিয়ে মাকসুদ আলম ও এস এম রবিউল হোসেনকে চূড়ান্ত করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, আগামী ১১ জুন থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত তারা চীনে প্রশিক্ষণ নিবেন।
প্রশ্ন উঠেছে, পানির ব্যবহার ও স্যানিটেশন বিষয়ে প্রশিক্ষণে কর্মকর্তাদের পাঠানো হলেও সুয়ারেজ প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কোনো প্রকৌশলীকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
প্রকল্পের সূত্রমতে, বর্তমানে দুই ভাগে এগোচ্ছে সুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ। একদিকে পাইপলাইন স্থাপন, অন্যদিকে হালিশহরে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ। প্রকল্পের আওতায় মোট ২০০ কিলোমিটার পয়োনিষ্কাশন পাইপলাইন বসানোর কথা রয়েছে। এর মধ্যে ১৮১ কিলোমিটার অগভীর পাইপলাইন, যার ৯৭ কিলোমিটার ইতিমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। এসব পাইপলাইন সর্বোচ্চ চার মিটার গভীরে বসানো হচ্ছে।
বাকি ১৯ কিলোমিটার গভীর পাইপলাইনের মধ্যে এখন পর্যন্ত নয় কিলোমিটার স্থাপন করা হয়েছে। এসব পাইপলাইন ছয় থেকে ১৪ মিটার গভীরে বসানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে বিভিন্ন আকারের ১০৬ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে, যা পাইপলাইন কাজের ৫০ শতাংশ অগ্রগতি।
অন্যদিকে হালিশহরের পয়োঃশোধনাগার ও ফিক্যাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণে সিভিল কাজের অগ্রগতি ৮৫ শতাংশ এবং ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল কাজের অগ্রগতি ৪০ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় ২৮ হাজার গৃহে পয়োঃসংযোগ দেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও এখন পর্যন্ত সংযোগ দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার গৃহে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্পটির সামগ্রিক অগ্রগতি ৬৯ শতাংশ। চলতি বছরের শেষ নাগাদ কাজ শেষ হওয়ার আশা করছে ওয়াসা।
এই সুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ করছে দক্ষিণ কোরিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘তায়ং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড’। আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘সেমিনার অন আরবান ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন সিস্টেম টেকনোলোজি ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়েছে চীনের ফুজয়ান প্রদেশের ফুজু সিটিতে।
প্রশিক্ষণ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম ও নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম রবিউল হোসেনের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানে আলম বলেন, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের আগেই প্রশিক্ষণের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছিল। পরে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি বাতিল করার সুযোগ ছিল না। বিদেশে প্রশিক্ষণ, নগরে পানির হাহাকার
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম মহানগরে প্রতিদিন প্রায় ১১ কোটি লিটার সুপেয় পানির ঘাটতি রয়েছে। গ্রীষ্মকাল ও রমজানে পানির চাহিদা আরও বেড়ে যায়। বর্তমানে সংস্থাটির দৈনিক পানি উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ থেকে ৫১ কোটি লিটার। তবে উৎপাদন হচ্ছে ৪৫ থেকে ৪৬ কোটি লিটার।
এর মধ্যে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প-১ ও ২ থেকে ২৮ কোটি লিটার, মদুনাঘাট পানি শোধনাগার থেকে ৯ কোটি লিটার, মোহরা পানি শোধনাগার থেকে ৯ কোটি লিটার এবং গভীর নলকূপ থেকে ৪ থেকে ৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদিত হচ্ছে। তবে নগরীর সুয়ারেজ ব্যবস্থা চরম নাজুক অবস্থায় রয়েছে।