পদ্মা রেল সেতুর সংযোগ প্রকল্প, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ব্রডগেজ রেলপথ সম্প্রসারণ প্রকল্পসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্প থেকে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, অনিয়ম ও সরকারি অর্থ লুটের মহাকাব্য এখন যার ঝুলিতে, তিনি হলেন- রেলওয়ের বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আফজাল হোসেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ে ইতিহাসে এমন অনেক কাব্য সৃষ্টি হলে মহাকাব্য সৃষ্টির উদাহরণ শুধুমাত্র ডিজি আফজাল হোসেনের। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেখ পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য শেখ রেহানার 'কালেক্টর' এবং ওবায়দুল কাদেরের 'পোষ্যপুত্র' হিসেবে পরিচিতি এই প্রকৌশলী। যা আর কারও ঝুলিতে নেই।
২৪ এর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদল হলেও সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মধ্যস্থতায় এখনও ডিজি পদে বহালতবিয়তে আছেন আফজল হোসেন। অটুট রেখেছেন দাপট। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ফাইল থেকে শুরু করে নতুন সরকারের নীতিপ্রণেতা—সবখানেই রহস্যজনকভাবে রাতারাতি পরিস্থিতি পাল্টে নিজের করে নেন তিনি।
ক্ষমতার দাপটে দুর্নীতির টাকায় দেশে-বিদেশে গড়েছেন অঢেল সম্পদ। করেছেন বিপুল অর্থপাচার। নৈতিক স্খলনের এসব আদ্যোপান্ত নিয়ে ধারাবহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হলো দৈনিক ঈশানের প্রিন্ট ও অনলাইন ভার্সনে-
লজিং মাষ্টার থেকে ম্যানেজ মাষ্টার
আফজাল হোসেনের বেড়ে ওঠা টাঙ্গাইল সদরের চৌবাড়িয়া গ্রামে। স্থানীয় এলাসিন তারক যোগেন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে এইচএসসি এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) থেকে বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
১৯৯৪ সালের ২৫ এপৃল সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) হয়ে যোগদান করেন বাংলাদেশ রেলওয়েতে। ১৯৬৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর নিভৃতপল্লীতে জন্ম নেয়া এবং অন্যের বাসায় লজিং থাকা আফজাল হোসেন এখন বাংলাদেশ রেলওয়ের শীর্ষ পদ মহাপরিচালক (ডিজি)।
সূত্রমতে, পাউবো থেকে দূর্নীতির হাতেখড়ি প্রকৌশলী আফজাল হোসেনের। বাংলাদেশ রেলওয়েতে যোগদানের পর বিস্তৃত হয় তার এই অপকর্মের পরিধি। ধাপে ধাপে বাগিয়েছেন পদ-পদবী, নানা ইস্যুতে হয়েছেন সমালোচিত।
এর মধ্যে অন্যতম শেখ হাসিনার বাপের টাকায় নির্মিত পদ্মা সেতু রেল-সংযোগ প্রকল্প। এই প্রকল্পের পিডি ছিলেন আফজাল হোসেন। তখন থেকেই আফজাল হোসেন শেখ পরিবারের সদস্য ‘পাওয়ারফুল ওম্যান’ শেখ রেহানার ‘কালেক্টর‘ বনে যান।
আফজাল হোসেন তার ফরিদপুরের শ্বশুরকুলের আত্মীয়, কথিত শ্যালিকাসহ পছন্দের নারী কর্মকর্তাদের পদায়ন করে তারই নিয়ন্ত্রণাধীন প্রকল্পে। এরপর থেকে আসল-নকল কাগজে পদ্মা সেতুতে বরাদ্দের কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে তা দিয়েছেন রেহানার কোষাগারে। নিজের আখের গোছানোতে মনোযোগী ছিলেন তারও আগে থেকেই।
২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার মেন্টর শেখ রেহানা পলায়ন করলেও গরম হাওয়া লাগেনি ম্যানেজ মাস্টার আফজাল হোসেনের গায়ে।
হাওয়া বুঝে ছাতা ঘুরিয়ে ধরেন ড. ইউনূস সরকারের দাপিয়ে বেড়ানো দুই সমন্বয়মুখী। প্রথমে আফজালের কর্মে তেলে-বেগুনে জ্বলেছিলেন তৎকালীন রেলপথ মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। সে পরিস্থিতি অনুকূলে নিতে আফজালকে সহযোগিতা করেছেন চার সমন্বয়কের একজন যিনি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই ১৮০ ডিগৃ ঘুরে যান উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। প্রথমে যত গরম হয়েছিলেন, পরে তত শীতল হন উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান।
গণেশ উল্টে যায় যেভাবে
পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। যাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ, তাদেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে বিভিন্ন সেক্টরে। যার জ্বলন্ত উদাহরণ ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশে উপসচিব উজ্জ্বল কুমার ঘোষের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর থেকে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
ডিজি পদ বাগিয়ে নেন যেভাবে
রেলের যে কয়েকজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক ছিলেন, তার মধ্যে কনিষ্ঠ ছিলেন মো. আফজাল হোসেন। তার সিনিয়র মার্কেটিং অ্যান্ড করপোরেট প্ল্যানিং বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক পার্থ সরকার, ট্রেনিং অ্যাকাডেমির প্রধান কর্মকর্তা এসএম সলিমুল্লাহ ওরফে বাহার এবং রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) আহমেদ মাহবুব চৌধুরীদের ডিঙিয়ে ডিজি করা হয়েছে তাকে। তখনই রেলওয়েসহ মন্ত্রণালয়ে চাউর হয় ‘চড়া দামে বিক্রি’ হলো ডিজি পদটি। আর তাতে খরিদদার মো. আফজাল হোসেন। মধ্যস্থতায় ছিলেন ড. ইউনূস সরকারের আমলের প্রভাবশালী দুই সমন্বয়ক ও একজন আমলা। এরপর থেকে আর কোনো সমস্যা হয়নি এ প্রকৌশলীর।
পদ্মা রেল সেতু সংযোগ প্রকল্পে লুটপাটের মহাকাব্য
রেলওয়ে সূত্র জানায়, পদ্মা রেল সেতু সংযোগ প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। সরকারের অডিট বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের প্রায় এক তৃতীয়াংশ অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে।
সরকারি সূত্র বলছে, প্রকল্পটির বাস্তবিক প্রয়োজন ছিল না। পদ্মা সেতু নির্মাণের পর রেল সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা ছিল অপ্রয়োজনীয়। ফলে ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকার ব্যয় মূলত উধাও হয়ে গেছে। পদ্মা সেতুর চেয়েও বড় মাত্রায় দুর্নীতি-লুটপাট হয়েছে পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পে। শুরুতেই এই প্রকল্পের অস্বাভাবিক হিসাব-নিকাশ দেখিয়ে প্রকল্পের ব্যয় কয়েকগুণ বাড়িয়ে ধরা হয়েছে।
এরপরও একনেকে অনুমোদনের মাত্র দু’বছরের মাথায় একবারেই ব্যয় ৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যন্ত সবকিছুই করছে চীনারা। এরসঙ্গে রেলেরও একাধিক কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
তাদের অন্যতম হলেন মো. আফজাল হোসেন। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট লুটেরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার বোন শেখ রেহানার পছন্দের কর্মকর্তা এই আফজাল হোসেন পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পদের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
এই আফজাল হোসেনের হাত দিয়েই প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয় ও ভুয়া হিসাব-নিকাশ দেখিয়ে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। আফজাল হোসেন নিজেও চীনা ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে প্রতিটি বিল পরিশোধের ওপর বড় অংকের কমিশন পেয়েছেন। এছাড়া সাব-কন্ট্রাক্টদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে হাতিয়ে নিয়েছেন সরকারি অর্থ।
এ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান তখন পদ্মা রেল সেতু এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে অত্যন্ত হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি পদ্মা সেতু নির্মাণের পর পদ্মা রেল সেতু নির্মাণের কোনোই প্রয়োজনীয়তা ছিল না বলে মন্তব্যও করেন। তিনি বলেন, প্রকল্প ব্যয়ের পুরো ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকাই জলে গেছে। প্রকল্পটি মূলত হাতে নেয়া হয়েছিল লুটপাটের ধান্দাকে সামনে রেখেই।
এর প্রমাণ পাওয়া যায় প্রকল্পের অধীন একটি রেল স্টেশন নির্মাণের চিত্র থেকেই। চিত্রে দেখা যায়, ফরিদপুরের ভাঙ্গা রেলস্টেশন, যেখানে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা ব্যয়ই যথেষ্ট ছিল সেই রেল স্টেশনে ব্যয় করা হয়েছে ১৫০ কোটি টাকারও বেশি। মূল প্রকল্পে এখানে বিপুল ব্যয়ে রেল স্টেশন নির্মাণের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। প্রকল্প পরিচালক আফজাল হোসেনই অন্য কৌশলে এটিকে প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অবাক করা ব্যাপার হলো, প্রকল্পটির অপব্যয়, দুর্নীতি-লুটপাট হলেও প্রকল্প পরিচালক, দুর্নীতির মূল হোতা আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির নজিরবিহীন উচ্চ ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, দুর্নীতি-লুটপাট সবকিছুই হয়েছে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেনের পরিকল্পনায়। এই প্রকল্পের সুবাদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার বোন শেখ রেহানার সঙ্গেও আফজাল হোসেনের যোগাযোগের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। প্রকল্পের ওপর পুরো প্রভাব তাঁর বরাবরই বজায় ছিল। প্রকল্পের সাব-কন্ট্রাক্টররা প্রায় সবাই ছিল তাঁর নিয়োজিত। প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ২০২১ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি পিডি পদে ছিলেন।
আরও যেসব প্রকল্পে লুটপাট
শুধু পদ্মা নয়, যমুনা রেলওয়ে সেতু ডাবল লাইনের সমান্তরাল সেতু হিসেবে ১২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচলের সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে আধুনিকায়ন। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ-চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ব্রডগেজ লাইনটি পুরোপুরি সচল করা, রেলওয়ে লাইন উন্নয়ন (পশ্চিম ও পূর্ব অঞ্চল) ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুনর্বাসন প্রকল্প (প্রথম পর্যায়), লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ সংগ্রহ করাসহ বহু কাজ হয়েছে টেন্ডারে। প্রায় ৫৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকার কাজের বেশিরভাগই হয়েছে এবং হচ্ছে আফজালের টেবিলে ঘোরা ফাইলের মাধ্যমে। রেলের পিয়ন থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত জানেন, ডিজির আফজালের পিসি ৫%। এ ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রয়েছে বেনামি যৌথ ব্যবসা।
একইভাবে ২১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। সেখান থেকেও এক তৃতীয়াংশ সরকারি বরাদ্দ লুটপাট করা হয়। আর প্রকল্প কাজে নিম্নমানের পাথর ব্যবহার করে পুরো রেলপথকে ঝুঁকিতে ফেলা হয়। বলতে গেলে এটিও ছিল সরকারের অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প। প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজে এ পর্যন্ত তিন কর্মকর্তা পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। যারা প্রকল্পের অর্থ লুটেপুটে পাহাড়সম সম্পদ গড়েছেন। পেয়েছেন পদোন্নতিও।
জানা গেছে, এই গুরুতর অনিয়মও এখন ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে। এটি মহাপরিচালক আফজাল হোসেনের তত্ত্বাবধানেই হচ্ছে। এতো অপকর্মের পরও অন্তর্বর্তী সরকার তাকে প্রকল্প পরিচালক থেকে কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে সরাসরি ডিজি পদে পদোন্নতি দিয়েছেন। অথচ রেল কর্মকর্তারা বলছেন, দুদক যদি যথাযথ তদন্ত চালাত, আফজাল হোসেন ফেঁসে যেতেন এবং এতে উপদেষ্টা-সচিবও সমস্যায় পড়তে পারতেন। কিন্তু তারা তখনকার ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন।
সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অংশের প্রচেষ্টায় হাসিনা-রেহানার হাজার কোটি টাকার মেগা দুর্নীতির খতিয়ান ধামাচাপা দেয়ার তৎপরতা চলে। এ লক্ষ্যে রেল বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার সমন্বয়ে আনঅফিসিয়ালি একটি টিম গঠন করা হয়, যারা ডিজি আফজাল হোসেনের নেতৃত্বে কাজ করছে।
অডিট প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে
রেলওয়ের মেগা প্রকল্পে কতটা দুর্নীতি-লুটপাট হয়েছে তা সর্বশেষ সরকারের অডিট বিভাগের প্রতিবেদনেই কিছুটা বেরিয়ে এসেছে। দুর্নীতি-লুটপাটের কারণে পদ্মা সেতু রেল প্রকল্পে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকা সরকারের আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে মর্মে মহাপরিচালক, অডিট অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মীমাংসা যোগ্য নয় এমন গুরুতর অনিয়মগুলোর মাধ্যমে সরকারের অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে। ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে মূল চুক্তির বাইরে ৫৫৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ দেখিয়ে তা আত্মসাত করা হয়েছে। ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত রেল লাইন নির্মাণে মূল নকশার তুলনায় গড়ে ১.৭ মিটার কম উচ্চতায় মাটি ভরাট ও অন্যান্য আইটেম কম হলেও ঠিকাদারদের অতিরিক্ত বিল দেয়া হয়েছে। এ ধরনের অনিয়মে ২ হাজার ১৩০ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। রেল লাইন নির্মাণে বালির স্তরও মূল স্পেসিফিকেশনের তুলনায় গড়ে ২০০ মিমি কম হলেও ঠিকাদারকে অতিরিক্ত বিল দেয়া হয়েছে ২১৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
এ ছাড়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রগ্রেস রিপোর্টের তুলনায় কাজ বেশি দেখিয়ে ১ হাজার ১১ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পকে ‘বিশেষায়িত’ কাজ হিসেবে দেখিয়ে চুক্তি করা হয়েছে প্রাক্কলনের ১৭.১৫% উচ্চমূল্যে (ইপিসি/টার্নকি), যার মাধ্যমে আত্মসাত হয়েছে ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এভাবে নানা অনিয়ম ও অসঙ্গতির কারণে সরকারের ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা ক্ষতি ও অর্থ আত্মসাত হয়েছে।
জানা গেছে, দুদকের এক কর্মকর্তাকে আফজাল হোসেনের অলিখিত ব্যবসায়িক পার্টনারও বলা হয়ে থাকে। আফজাল হোসেন এখন একেতো অগাধ অবৈধ অর্থের মালিক, তার ওপর আবার মহাপরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে। তার ছাতা হিসেবে রয়েছেন খোদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিব। আর দুর্নীতি ধামাচাপা দেয়ার সরাসরি দায়িত্বে রয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অডিট বিভাগ এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা। এ কাজের জন্য তাদের হাতে বরাদ্দ আছে বড় অংকের ফান্ডও।
শুধু ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই প্রতিবেদনই নয়, ইতিপূর্বে প্রকল্পটির শুরু থেকেই প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তি হয়েছে। যার অনেকাংশই মো. আফজাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের সদস্যরা ধামাচাপা দিতে সক্ষম হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পদ্মা সেতু নির্মাণের পর একই পথে আবার পদ্মা রেল সেতু নির্মাণের প্রয়োজন ছিল না। তারপরও প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে শুধুমাত্র সরকারি অর্থ আত্মাসাতের লক্ষ্যকে সামনে রেখেই। বাস্তবে হয়েছেও তাই। চীনা দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে এবং তাদের পরামর্শে অনেকটা হঠাৎ করেই এ প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছিল। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, ডিপিপি তৈরি, একনেক অনুমোদন প্রভৃতি কাজগুলো হয়েছে অত্যন্ত দ্রুততা এবং গোপনীয়তার সঙ্গে। এমনকি একনেক অনুমোদনের পরও অনেক কিছুতে রাখঢাক ছিল।
দুর্নীতিবাজ বলে চিহ্নিত চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে এটা আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। চীন সরকারের উচ্চহার সুদের ঋণে এ প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছিল। যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের যেসব ভুয়া হিসাবকে সামনে রেখে এই বৃহৎ প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছে তা আদৌ কখনো বাস্তবায়িত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ সক্ষমতা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত যাত্রী ও মালামাল পরিবহন কখনোই সম্ভব হবে না। তাও রেল পরিচালনা বাবদ প্রতি মাসে বড় অংকের লোকসান দিতে হচ্ছে রেল কর্তৃপক্ষকে। পদ্মা সেতুর কারণে সড়ক পথেই এখন সবাই মালামাল পরিবহনে আগ্রহী। একেতো অস্বাভাবিক ব্যয় দেখিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। তারওপর যা কিছু নির্মাণ হয়েছে সেটাও সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
যত সম্পদের মালিক আফজাল
টাঙ্গাইলের নিরেট পল্লীতে অন্যের বাসায় লজিং থেকে পড়ালেখা করা আফজাল হোসেন এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। ঝামেলা এড়াতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের নাম। গ্রামের বাড়িতে দুর্নীতির নিশানা না থাকলেও রাজধানীর বনানীতে কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। দেশে দুর্নীতির টাকা পাচার করেছেন অস্ট্রেলিয়াতে। সেখানে কেনা বাড়িসহ রয়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে তার সম্পদের খোঁজে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
আফজাল হোসেনের দূর্নীতির ছায়া পুরো রেলে
রেলওয়ে লুটেপুটে খাচ্ছে রেল কর্মকর্তারাই। এদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেন। যিনি লুটপাটের টাকায় ফুলে ফেঁপে উঠছেন প্রতিনিয়ত। গড়েছেন পাহাড়সম সম্পদ। নিজে দূর্নীতিবাজ হওয়ায় রেলওয়ের অন্য দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাও নেন না ডিজি আফজাল। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে দূর্নীতির মহোৎসব চললেও একেবারে নীরব আফজাল হোসেন।
এসব বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আফজাল হোসেনের বক্তব্যের জন্য তাঁর সরকারি মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করে এবং তাঁর
এ ব্যাপারে জানতে রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আফজাল হোসেনের মুঠোফোন ও অফিসফোন নাম্বারে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হুয়্যাটস অ্যাপ মেসেজ অপশনে খুদে বার্তা লিখে পাঠালেও তিনি কোনরকম সাড়া দেননি। তাঁর দপ্তরে গেলেও তিনি নেই বলে জানান। তবে রেল ভবন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, তিনি সাধারণত সাংবাদিকদের সাক্ষাৎ দেন না, ফোনও রিসিভ করেন না।