দূর্নীতি যেখানে গেড়ে বসে, সেখানে পরতে পরতে বাসা বাঁধে দূর্নীতি। এরপরও দূর্নীতি চোখে পড়ে না সংশ্লিষ্টদের। নিজেদের মনে করা হয় নিরেট স্বচ্ছ। বাকী সব বোকা। দূর্নীতির এমন ফাটল দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে ভিজে সয়লাব বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সদ্য নির্মিত নতুন সদর দপ্তরের পাঁচতলা ভবন।
৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটির অফিস কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিনেই দেয়াল চুঁইয়ে বৃষ্টির পানি কক্ষের ভেতরে ঢুকে ভিজে গেল গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। আর পরিস্থিতি সামাল দিতে ত্রিপল দিয়ে বাইরের অংশ ঢেকে রাখতে হল সংস্থাটিকে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে ভবনটির নির্মাণ কাজের কারসাজি নিয়ে।
সূত্র মতে, চট্টগ্রাম মহানগরীর সার্সন রোডের জয়পাহাড় কেটে শুরু করা হয় পাঁচতলা এই ভবন। নবনির্মিত এই ভবনে রোববার (১২ জুলাই) থেকে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম দিনেই বিভিন্ন কক্ষে পানি ঢুকে কিছু কাগজপত্র নষ্ট হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা ভবনের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এর আগে গত ৮ জুলাই সল্টগোলার বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) ভবন থেকে এই ভবনে অফিস স্থানান্তর করা হয়। শুক্রবার (১০ জুলাই) মিলাদ আয়োজনের পর রোববার থেকে সেখানে দাপ্তরিক কাজ শুরু হয়। সেদিনেই নামে ঝুম বৃষ্টি। ফলে ভবনটির দেয়াল চুঁইয়ে পানি ঢুকে দূর্নীতি ও অনিয়মের ফাটলে।
বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিপিসির সদর দপ্তর নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ও সংস্থাটির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম-পরিকল্পনা) মো. আপেল মামুন। তিনি নিজের অফিস কক্ষে পানি ঢোকার বিষয়টিও সরেজমিনে দেখান।
তবে কাজে কোন কারসাজি হয়নি দাবি করে তিনি জানান, জানালায় একপ্রকার গাম না দেওয়ায় ভবনে পানি ঢুকেছে। এর আগে ভবনটির কয়েকটি জায়গায় ফাটল দেখা দিলে পুটিং দিয়ে তা মেরামত করা হয়। তবে এগুলো বড় ধরনের কোনো ফাটল নয় এবং নির্মাণকাজের সময় ছোটখাটো ফাটল দেখা দিতেই পারে বলে জানা আপেল মামুন।
ভবনের নির্মাণসামগ্রী ও কাজের মান নিয়ে কোনো সমস্যা নেই দাবি করে তিনি বলেন, গত বছর জয়পাহাড় এলাকায় স্টিল স্ট্রাকচারের পাঁচতলা এই ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড করপোরেশন। শুরুর দিকে পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠলেও পরে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।
বিপিসি সূত্র জানায়, দেশের জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ ও বিপণনের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯০ সাল থেকে চট্টগ্রামে ভাড়া ভবনে সদর দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। প্রথমে আগ্রাবাদের হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের ভবন এবং পরে ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ভবনে কার্যক্রম চলছিল।
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর নিজস্ব স্থায়ী সদর দপ্তর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছর জয়পাহাড় এলাকায় স্টিল স্ট্রাকচারে নির্মিত পাঁচতলা ভবনের কাজ শুরু হয় এবং নির্মাণের দায়িত্ব পায় ইউনাইটেড করপোরেশন। নির্মাণের শুরুতে পাহাড় কাটার অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়।
নতুন এই ভবন থেকেই বিপিসির সব প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা। প্রায় ১৮০ জন কর্মকর্তা–কর্মচারী এখানে দাপ্তরিক কাজ করবেন। কিন্তু উদ্বোধনের পরদিনই ভবনে পানি প্রবেশের ঘটনায় শুধু কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মধ্যেই নয়, সংশ্লিষ্ট মহলেও ভবনটির নির্মাণমান, তদারকি এবং কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তারা বলেন, বিপুল সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনায় কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিনেই এ ধরনের সমস্যা দেখা দেওয়া উদ্বেগজনক এবং বিষয়টি নিরপেক্ষ কারিগরি তদন্তের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলেও তারা মন্তব্য করেন।
প্রসঙ্গত, বিপিসি বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। সংস্থাটির নিয়ন্ত্রণাধীন পদ্মা অয়েল কোম্পানি, যমুনা অয়েল কোম্পানি ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম, স্টান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েলের মাধ্যমে এসব তেল বাজারজাত করা হয় এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি তা পরিশোধন করে।
সম্প্রতি বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের আলোচনা শুরু হলে বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। তবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি জানিয়েছেন, বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামেই থাকবে।