চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও সিডিএ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে শাহীন সুলতানা নামে এক শিক্ষিকা নিয়োগে চরম অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে অভিযোগ উঠেছে সৈয়দা নিলুফা আক্তার নামে আরেক শিক্ষিকার চাকুরি স্থায়ীকরণ নিয়ে। সেই সাথে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য আসছে সামনে।
সিডিএর গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও এসব অভিযোগের সত্যতা রয়েছে। তবে এই তদন্ত প্রতিবেদনও ফেল। আর এ নিয়ে এলাকা জুড়ে তোলপাড় চলছে অভিবাবক ও সচেতন মহলের মাঝে। তাদের প্রত্যাশা দুদকের মাধ্যমে এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে।
অভিবাবক ও সচেতন মহলের দাবি, আইসিটি বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগকালীন সময়ে কম্পিউটার সায়েন্সে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি এবং ঘঞজঈঅ নিবন্ধনধারী একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও তাঁদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। উল্টো সকল নিয়ম তোয়াক্কা না করে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হতে B.Pharm I M.Pharm ডিগ্রিধারী শাহীন সুলতানাকে। যাঁকে সরাসরি দশম গ্রেডে নিয়োগ প্রদান করা হয়।
কম্পিউটার সায়েন্সের ডিগ্রিধারী ও নিবন্ধিত যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে মাত্র ৬ মাসের কম্পিউটার কোর্স থাকা সত্ত্বেও তাঁকে এ পদে আসীন করার নেপথ্যে স্বজনপ্রীতি কাজ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কারণ তিনি ছিলেন তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সচিবের আপন ভাগিনী।
প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর থেকেই শুরু হয় নানা প্রশাসনিক অসংগতি। নিজ বিষয় বাদ দিয়ে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান বিষয়ে প্রভাব খাটিয়ে রুটিনে ক্লাস অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ফলে মূল আইসিটি বিষয়টিতে শিক্ষকতা করতেন অন্য বিষয়ের অনভিজ্ঞ শিক্ষকরা, আর শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হতো নিয়মিত ল্যাব প্র্যাকটিস থেকে।
পরবর্তীতে তৎকালীন প্রশাসন যোগ্যতা অনুযায়ী রুটিন বণ্টন করলে শিক্ষক মিলনায়তনে শুরু হয় হট্টগোল। প্রতিষ্ঠানটির একাধিক শিক্ষকের লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, শুধু সহকর্মীদের সাথে অসদাচরণ ও শিক্ষকদের নিয়ে গ্রুপিং সৃষ্টিই নয়; পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল, রুটিন পরিবর্তন, ক্লাস পার্টির নাস্তার কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দায়িত্ব অবহেলার মতো একের পর এক ঘটনা ঘটিয়েছেন তিনি।
এসব ধারাবাহিক অব্যবস্থার রেশ ধরে ২০১৯ সালের ৭ই মার্চ শিক্ষক মিলনায়তনে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে প্রতিষ্ঠানের ৩৪ জন শিক্ষক যৌথভাবে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে তৎকালীন সিডিএ চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় ৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্ত কমিটির (তদন্তকালীন পদবি) আহ্বায়ক ছিলেন জনাব মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন শাহ্ (তৎকালীন সদস্য, সিডিএ বোর্ড), সদস্য সচিব ছিলেন জনাব কে. বি. এম শাহজাহান (তৎকালীন সদস্য, সিডিএ বোর্ড) সদস্য ছিলেন জনাব ভূপতি ভূষণ ইমরান (তৎকালীন সদস্য, সিডিএ বোর্ড), জনাবা তাহেরা ফেরদৌস বেগম (তৎকালীন সচিব, সিডিএ) এস. এম. এরশাদ হোসেন (সিনিয়র শিক্ষক-গণিত, সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ) সদস্য সচিব জনাব এ. এস. এম হাবিবুর রহমান (তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-২, সিডিএ)
অডিও রেকর্ড, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে অভিযোগের সত্যতা পায় তদন্ত কমিটি। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় প্রবিধান ভঙ্গের দায়ে সিডিএ ও বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ তাঁকে চূড়ান্ত বরখাস্ত ও অপসারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু রহস্যজনক ও প্রশাসনিকসহ নানা অজুহাতে সেই বরখাস্তের আদেশ আজও কার্যকর হয়নি। অভিযুক্ত এই শিক্ষিকা এখনো পদে বহাল রয়েছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং এসব বিস্ফোরক অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষিকা শাহীন সুলতানার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। পুরো বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি দাবি করেন, নিয়োগের সময় আমার কাছে যেসব কাগজপত্র চাওয়া হয়েছিল, আমি সবই জমা দিয়েছি। শিক্ষকদের অভিযোগ সংক্রান্ত কোনো ঘটনার কথা আমার মনে নেই, আমি সবকিছু ভুলে গেছি।
অন্যদিকে একই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই এক সহকারী শিক্ষকের চাকরি স্থায়ীকরণের অভিযোগ উঠেছে। নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৬ সালের ১৬ এপৃল অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় শিক্ষকদের স্থায়ীকরণ সংক্রান্ত যে রেজুলেশন গৃহীত হয়, সেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের সহকারী শিক্ষক সৈয়দা নিলুফা আক্তারের নাম ছিল না। অথচ একই বছরের ৪ আগস্ট তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নুরুল আলম স্বাক্ষরিত স্থায়ীকরণ পত্রে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বর্তমানে তিনি স্থায়ী শিক্ষক হিসেবে ১০ম গ্রেডে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন।
রেকর্ডপত্র অনুযায়ী, উক্ত পদে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ও রেজুলেশন ব্যতিরেকে কীভাবে এ স্থায়ীকরণ পত্র জারি করা হলো-তা নিয়ে প্রশাসনিক কাঠামো ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যেখানে নোটিশ বোর্ডে ২০১৬ সালের বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা দিয়ে আসা সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৭ জন শিক্ষকের স্থায়ীকরণ নিয়ে দুদকের তদন্ত চলছে এবং একই কারণে সিডিএ গার্লস স্কুলের অন্তত সাতজন অস্থায়ী ও খণ্ডকালীন শিক্ষকের স্থায়ীকরণ আটকে রয়েছে, সেখানে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই সৈয়দা নিলুফা আক্তারের স্থায়ী পদে বহাল থাকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সৈয়দা নিলুফা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি এবং বর্তমানে সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত আছি। পরিচালনা কমিটি আমাকে উক্ত পদে স্থায়ী করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নুরুল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ঘটনা দুটি ২০১৬ সালের হওয়ায় আমার পুরোটা স্পষ্ট মনে নেই। তবে রেজুলেশনে আমার স্বাক্ষর থাকতে পারে, আলাদা কোনো কাগজে স্বাক্ষর থাকার কথা নয়। আমি ঢাকা থেকে ফিরে কাগজপত্র দেখলে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারব।