বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে ডিবি পরিচয়ে মারধর ও হেনস্তা করার ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। ক্রিকেটার নাঈম হাসানের বড় ভাই মো. সাব্বির চট্টগ্রামের খুলশী থানার তিন পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। এরপর তিন পুলিশ সদস্যকে ক্লোজড করে দামপাড়া পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চত করেছেন সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণসংযোগ) আমিনুর রশিদ। তিনি বলেন, ঘটনার পর শনিবার সকালে খুলশী থানার এক এসআইসহ তিনজনকে ক্লোজড করা হয়েছে।
তারা হলেন- এসআই শফিক, কনস্টেবল রাসেল ও সোহেল। তাদের দামপাড়া পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে মামলার বাদি ক্রিকেটার নাঈম হাসনের বড় ভাই মো. সাব্বির জানান, তিন পুলিশের বিরুদ্ধে আমরা মামলা করেছি। তাদের বিরুদ্ধে নাঈমকে মারধর এবং হেনস্থার অভিযোগ আনা হয়েছে। আমরা শুধু তাদের প্রত্যাহার বা ক্লোজড না, আইনি প্রক্রিয়ায় যথাযথ শাস্তি চাই।
শ্যালক আবেশ খান জানান, ঘটনার সময় দুই পুলিশের পাাশাপাশি সাধারণ ড্রেসে একজন নাঈমকে মারধর করে। সে পুলিশের সঙ্গে ছিল। কিন্তু পুলিশ নয়। তাকে আমরা পরে থানায় দেখেছি। তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নাঈম হাসান বর্তমানে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।
সূত্র জানায়, ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগ খেলে শুক্রবার রাতে বিমানযোগে চট্টগ্রাম ফিরছিলেন ক্রিকেটার নাঈম হাসান। বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন রাত ১১টায়। এরপর সিএনজিটি লালখান বাজার ফ্লাইওভারের নামার মুখে পৌঁছলে পুলিশ পরিচয়ে তার গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি করা হয়।
একপর্যায়ে সাদা পোশাকের পুলিশ তার গলা টিপে ধরে এবং মারধর করে থানায় নিয়ে যায়। জাতীয় দলের ক্রিকেটার পরিচয় দেওয়ার পরও তাকে হেনস্তা করা হয় বলে অভিযোগ। এ সময় এক ব্যক্তি তাকে পাইপ দিয়ে মারধর করেন। এতে গুরুতর আহত হন ক্রিকেটার নাঈম হাসান।
খবর পেয়ে নাঈমের বড় ভাই সাব্বির, বাবা সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাহবুব আলম, শ্যালক আবেশ খানসহ স্বজনেরা ছুটে যান থানায়। সেখানে পুলিশের সঙ্গে এ নিয়ে বাগবিতন্ডা হয়। পরে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালসহ ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে যোগাযোগের পর পুলিশ নমনীয় হয়। এই ঘটনায় খুলশী থানার এক এসআইসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানের সঙ্গে পুলিশের দুর্ব্যবহার ও নির্যাতনের অভিযোগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে আইনের শাসন ও সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্র্যাকের কর্মকর্তা ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট শরীফুল হাসান।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক হ্যান্ডেলে তিনি বলেছেন, পুলিশের নির্যাতনের শিকার জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈমের কথা শুনছিলাম! ভীষণ বেদনাদায়ক! সাধারণ মানুষের সঙ্গেও হরহামেশাই এমনটি হয়। ঠিক নাঈম হাসানকেও সাধারণ মানুষ মনে করে হয়রানির শিকার করা হয়েছে।
তিনি লিখেছেন, খেয়াল করলে দেখবেন এদেশে কাউকে গাড়ি থেকে নামিয়ে পুলিশ নির্যাতনের ঘটনা সচরাচর ঘটে না। কিন্তু সিএনজি, রিকশা বা বাস থেকে নামিয়ে যাকে-তাকে নির্যাতন করা যায়। সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিয়মিত এ ধরনের ঘটনা ঘটে কিন্তু তারা বিচার পান না।
তিনি মন্তব্য করেন, ঘটনাটিকে কয়েকজন পুলিশ সদস্যের দায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এদেশে সব আমলেই পুলিশ এমন ছিল। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে পুলিশকে সরকারগুলো তার লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করে। দেশে আইনের শাসনের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি লেখেন, গত ৫৫ বছরে বিভিন্ন সরকারের আমলে বাংলাদেশের কমবেশি অবকাঠামো উন্নয়ন অনেক হয়েছে, কিন্তু আইনের শাসন কোনো আমলেই প্রতিষ্ঠা হয়নি। অথচ আইনের শাসন সবচেয়ে জরুরি।
পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে শরীফুল হাসান বলেন, দেশ ঠিক করতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হয়। আইন-আদালত, নির্বাহী বিভাগ থেকে শুরু করে সবকিছুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়তে হয়। পুলিশকে রাজনৈতিক ব্যবহার করা বন্ধ করে পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়তে হয়।
স্ট্যাটাসের শেষাংশে তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের নীতিনির্ধারকরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আরও মনোযোগী হবেন। তার ভাষায়, একটা দেশের পুলিশ যদি মানুষকে মানুষের মর্যাদা না দেয়, রাস্তাঘাট, থানা, পুলিশ, আদালত ও প্রশাসনের সর্বত্র মানুষ যদি হয়রানির শিকার হন, সুশাসন না থাকে, সেই দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।