চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে একের পর এক বিদেশি জাহাজে জলদস্যুদের হানা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। গত এক মাসে বিদেশি তিন জাহাজ থেকে কোটি কোটি টাকার মালামাল লুট করা হয়েছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে নাবিকরা।
ফলে বহির্নোঙরে জাহাজে জলদস্যুতা প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে এবার সরাসরি হস্তক্ষেপ চেয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে জরুরি আবেদন করেছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রিজ (সিসিসিআই)।
বুধবার (২২ জুলাই) চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক স্বাক্ষরিত এক জরুরি চিঠিতে এই আবেদন জানানো হয়। প্রেরিত আবেদনে চিটাগাং চেম্বার সভাপতি উল্লেখ করেন-গত এক মাসের ব্যবধানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে তিনটি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজে জলদস্যুতার ঘটনা ঘটেছে।
এসব ঘটনায় কয়েক কোটি টাকার মালামাল, জাহাজের সরঞ্জাম ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ লুট হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজের নিরাপত্তা ও নাবিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এতে বিদেশি জাহাজের মালিক, শিপিং এজেন্ট এবং নাবিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
চিটাগাং চেম্বার জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে বহির্নোঙরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি শিপিং অপারেটরদের মধ্যে ঝুঁকির ধারণা বাড়বে, বীমা ব্যয় বাড়বে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের খরচও বেড়ে যাবে বলে সতর্ক করেছে চেম্বার।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিজিওনাল কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট অন কমব্যাটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রবারি এগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়া (রিক্যাপ)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে জলদস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনা বৃদ্ধির তথ্য উঠে এসেছে। এতে বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আবেদনে চেম্বার সভাপতি উল্লেখ করেন- বর্তমান সরকারের নানামূখী বান্তব উদ্যোগ গ্রহণের ফলে ২০৩৫ সাল নাগাদ চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ক্যাপাসিটি বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গৃহীত পদক্ষেপের কারণে একই সাথে চট্টগ্রাম বন্দর এতদঞ্চলের অন্যতম রিজিওনাল বিনিয়োগ ও ট্রান্সমোডাল লজিস্টিক হাবে পরিণত হবে।
কিন্তু সম্প্রতি ঘটে যাওয়া জলদস্যুতার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের অর্জিত সুনাম ক্ষুন্ন হবে। ফলে বন্দরের বহির্নোঙরে নিরাপত্তাহীনতা শুধু শিপিংশিল্পের জন্য নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও জন্যও মারাত্নক ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব ঘটনার কারণে বিদেশি শিপিং অপারেটরদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়বে, যা ভবিষ্যতে অতিরিক্ত বীমা ব্যয়, জাহাজ পরিচালনায় বিলম্ব এবং বাণিজ্য ব্যয় বৃদ্ধি করতে পারে।
তিনি বলেন-যেখানে সরকার ইজ অব ডুয়িং বিজনেস বাড়ানো এবং কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস কমানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সেখানে এ ধরণের ঘটনা সরকারের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
আমিরুল হক চিঠিতে উল্লেখ করেন-আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা-রিজিওনাল কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট অন কমবেটিং পাইরেসি এন্ড আর্মডরবারি এগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়া এর (রিক্যাপ) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপৃল) চট্টগ্রাম বন্দরে কোনে াপ্রকার দস্যুতা বা চুরির ঘটনা ঘটেনি।
সংস্থাটির দেওয়া তথ্য মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশের জলসীমায় যখন চুরি ও দস্যুতার ঘটনা চলমান, তখন বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা স¤পূর্ণ নিরাপদ ছিল। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের যৌথ তৎপরতা এবং জিরোটলারেন্স নীতির কারণে এই সাফল্য এসেছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক চুরির ঘটনা গুলো রিক্যাপ প্রতিবেদনে প্রভাব ফেলতে পারে। যার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম নষ্ট হতে পারে। তাই দেশে বিনিয়োগ বান্ধব ও নিরাপদ আন্তর্জাতিক ট্রেড পরিবেশ নিশ্চিত কল্পে ঝুঁকিপূর্ণ ¯পটগুলোতে কোস্টগার্ডের টহল আরো জোরদার ও গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধিসহ অপরাধী চক্রের সহযোগি ও চোরাইকৃত মালামাল ক্রয়-বিক্রয়কারীদেও বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য নৌ-পরিবহন মন্ত্রীর প্রতি চেম্বার সভাপতি আহবান জানান।
এই পরিস্থিতিতে চিটাগাং চেম্বার বহির্নোঙরে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর টহল জোরদার, আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু, অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা এবং সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
চিঠিতে চেম্বার সভাপতি মো. আমিরুল হক বলেন, বহির্নোঙরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু শিপিং শিল্পের স্বার্থেই নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি রক্ষার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।