বিনা টিকিটে রেল ভ্রমণ ও টেন্ডার কার্যক্রমসহ সরকারি নানা কাজে রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাঁধা-হেনস্তা ও হামলার ঘটনা বাড়ছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একাধিক হামলার প্রতিবাদ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে চট্টগ্রামে মানববন্ধন কর্মসুচি পালন করেছেন উদ্ধিগ্ন ও আতঙ্কিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রামের সিআরবি রেলভবন এলাকায় এই মানববন্ধন কর্মসুচিতে অংশ নেন বাংলাদেশ রেলওয়ে ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সোমবার দিনগত রাতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের গণসংযোগ কর্মকর্তার দপ্তর থেকে প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেন, আন্ত:নগর ট্রেনগুলোতে বিনা টিকিটের চিহ্নিত কিছু যাত্রী এসি শ্রেণির কোচ ও কেবিনে ভ্রমণ করে বৈধ টিকিটধারী যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ভ্রমণে বিঘ্ন সৃষ্টি করছেন। তারা কখনোই টিকিট কেটে ট্রেনে ভ্রমণ করেন না।
টিকিট দেখতে চাইলে ৮-১০ জন একত্র হয়ে হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে টিকিট চেকিংয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দেয়া হয়। সংঘবদ্ধ এই চক্র বিনা টিকিটে ভ্রমণ ছাড়াও অফিসিয়াল টেন্ডার কার্যক্রমসহ সরকারি নানা কাজে বাধা ও চলন্ত ট্রেনে হামলার মতো ফৌজদারি অপরাধ করছে নিয়মিত।
অভিযোগে বলা হয়, গত ৭ আগস্ট তারিখে ৭৫৩ নম্বর সিল্কসিটি ট্রেন আব্দুলপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে আসার পর এসি কোচে কয়েকজন বিনা টিকিটের যাত্রী পাওয়া যায়। তাদের ন্যুনতম ভাড়া ও জরিমানা আদায় করে নন-এসি কোচে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন।
পরবর্তীতে ট্রেনটি স্টেশনে পৌঁছানোর পর সংঘবদ্ধ চক্রটি রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর অতর্কিতভাবে সন্ত্রাসী কায়দায় হামলা করে। এর আগে ৪ আগস্ট ৭৯২ নম্বর বনলতা এক্সপ্রেস এবং ২৫ জুলাই ৭২৬ নম্বর সুন্দরবন ট্রেনে বিনা টিকিটের যাত্রীরা সন্ত্রাসী হামলা করে।
মানববন্ধনে আরও বলা হয়, এসব ঘটনার ফলে টিকিট চেকিং কার্যক্রমের সঙ্গে স¤পৃক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এর কারণে টিকিট চেকিং কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং সরকারি রাজস্ব আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
মানববন্ধনে বলা হয়, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর এ ধরনের অতর্কিত সন্ত্রাসী হামলা এবং সরকারি কাজে বাধাদান একটি ফৌজদারি অপরাধ। গত ৭ আগস্টসহ বিভিন্ন সময়ে রেলওয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন দপ্তরের অফিস কক্ষেও কিছু সন্ত্রাসী দ্বারা হেনন্তা-হুমকি ও হামলার শিকার হয়েছেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী বিভাগীয় কার্যালয় ডিইএন-১ কার্যালয়েও হামলার ঘটনা ঘটে।
শুধু তাই নয়, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম থেকে প্রধান প্রকৌশল কার্যালয়সহ সবকটি প্রকৌশল কার্যালয়ের টেন্ডার কর্মসুচিতেও বাঁধা-হেনস্থা ও হামলার হুমকি চলছে প্রতিনিয়ত। পাহাড়তলী সরঞ্জাম ক্রয় দপ্তরের অবস্থা আরও শোচনীয়। এতে হুমকির মুখে পড়েছে নিরাপদ কর্মপরিবেশ। ফলে সরঞ্জাম ক্রয় দপ্তরসহ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সবকটি দপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হেনস্তা ও হামলার ভয়ে নিয়মিত অফিস করতেও ভয় পাচ্ছেন।
এসব ঘটনায় চট্টগ্রামের পাহাড়তলী বিভাগীয় কার্যালয়ে এর আগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও) তৌষিয়া আহমেদের নেতৃত্বে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভাগীয় কার্যালয়ের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন। কিন্তু এরপরও সন্ত্রাসীদের স্বভাবের কোন পরিবর্তন হয়নি। কারণ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে সন্ত্রাসীরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। যা এর আগে কোন সময় ঘটেনি।
মানববন্ধনে অংশ গ্রহণকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি বিনা টিকেটে রেল ভ্রমণ, টেন্ডার কার্যক্রমসহ সরকারি বিভিন্ন কাজে বাঁধা ও হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে সরকারি দায়িত্ব পালনে নিরাপত্তা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচির হুশিয়ারী দেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
মানববন্ধন পরিচালনায় মূখ্য ভুমিকা রাখেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চীফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মো. সফিকুর রহমান, প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক সুজিত কুমার বিশ্বাস, প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভিরুল ইসলাম, প্রধান বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক শওকত জামিল মোহসী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান, যন্ত্র প্রকৌশলী আমীর উদ্দিন, ডেপুটি সিওপিএস তারেক মুহাম্মদ ইমরান, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুরসালীন রহমান, টিএসও আহসান উদ্দিন, ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ার রিয়াসাদ ইসলাম, ডেপুটি সিসিএম মো. হারুনুর রশিদ প্রমুখ।
ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলীয় নেতা-কর্মী পরিচয়ে সংঘবদ্ধ কিছু সন্ত্রাসী বিনা টিকিটে রেল ভ্রমণ, টেন্ডার কার্যক্রমসহ সরকারি নানা কাজে রেল কর্মকর্তাদের হেনস্থা ও হামলার ঘটনায় লিপ্ত হয়েছেন। তাদের সাথে কিছু ঠিকাদারও জড়িত। যারা নানাভাবে উস্কানি দিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের এসব অপরাধমূলক কর্মকান্ড ঘটাতে উৎসাহ যোগাচ্ছে। রেলওয়েকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।