চলতি বছরের ২৬ শে জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের দুবাইয়ের জলসীমায় প্রবেশ করেছিল বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন বাণিজ্যিক জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয় ইরানের সাথে আমেরিক ও ইসলাইলের যুদ্ধ।এর মধ্যে কয়েক দফা চেষ্টা করেও হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা। গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে জাহাজটি দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে আটকা পড়েছে।ফলে জাহাজটির নাবিক, ইঞ্জিনিয়ারসহ মোট ৩১ জন ক্রু উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় জীবন কাটাচ্ছেন। একইভাবে চরম উৎকন্ঠায় রয়েছেন নাবিক ও ক্রুদের পরিবারের স্বজনেরা। শুক্রবার (৮ মে) এমন তথ্য জানিয়েছেন বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (বাণিজ্য) মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা। তিনি বলেন, হরমুজে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল বা অনুমোদন না দেয়া পর্যন্ত জাহাজটি ওখান থেকে বের হতে পারছে না। হরমুজ ছাড়া বিকল্প কোন পথও নেই বের হওয়ার। তিনি বলেন, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি হরমুজে কিছু কিছু জাহাজকে চলাচলের অনুমিত দিলেও বাংলার জয়যাত্রার অনুমোদন মিলছে না। এর কারণ কি সেটাও বুঝতে পারছি না। হরমুজ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগে ইতোমধ্যে আইআরজিসি বরাবরে একাধিকবার অনুমতি চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাহাজটির ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম। ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের যুদ্ধবিরতি শুরু হলে গত ৮ই এপৃল হরমুজ প্রণালি পার হতে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল জাহাজটি। কিন্তু পার হতে পারেনি।জাহাজটির চিফ ইঞ্জিনিয়ার রাশেদুল হাসান জানান, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির নৌবাহিনী কেউ যদি হরমুজ ক্রসের চেষ্টা করো, অ্যাটাক করা হবে বলে ক্রমাগত বার্তা প্রচার করছে। ফলে হরমুজে জাহাজ নিয়ে আসা নিরাপদ মনে হচ্ছে না। বিএসসির একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, বাংলার জয়যাত্রা বিএসসির হলেও এটি যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য পরিবহণের কাজে ভাড়ায় নিয়োজিত। সম্ভবত এ কারণে বাংলার জয়যাত্রা ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর এর রোষানলে পড়েছে। বর্তমানে জাহাজটিতে ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল রয়েছে। যা নিয়ে যাওয়া হবে যুক্তরাষ্ট্রে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, জাহাজটিকে বের করে আনার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে ইরানের সাথে আলোচনা করে বাংলাদেশ জাহাজটিকে যখন বের করে আনার পর্যায়ে নিয়ে এসেছিল, ঠিক তখন আবার সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যে কারণে এটি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, জাহাজের নাবিকদের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তাদের ভাতা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। জাহাজে পর্যাপ্ত পানি ও খাদ্য রয়েছে। নাবিকদের সাথে দেশে থাকা পরিবারের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।প্রসঙ্গত, কাতারের একটি বন্দর থেকে গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি প্রায় ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে গিয়েছিল এমভি বাংলার জয়যাত্রা। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পর গত এক মাস ধরে সংযুক্ত আরব আমীরাতের মিনা সাকারের অদূরে গভীর সমুদ্রে অবস্থান করছিল। গত সোমবার জাহাজটি অবস্থান পাল্টে শারজাহর কাছে কিছুটা নিরাপদে গিয়ে অবস্থান করছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
২৫ দিন আগে
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর হঠাৎ বদলে গেছে চট্টগ্রাম মহানগরীর তেলের পাম্পগুলোর দৃশ্যপট। গেলেই মিলছে সোনার হরিণ অকটেন-পেট্রোল। গত দেড় মাসের মতো পা¤পগুলোতে এখন নেই যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। প্রায় ফাঁকা পাম্পগুলো।শুক্রবার (২৪ এপৃল) সকাল থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগরীর ষোলশহর, নতুন ব্রিজ, পাঁচলাইশ, অক্সিজেন, ওয়াসা মোড়, লালদীঘি ও গণি বেকারি সংলগ্ন একাধিক ফিলিং স্টেশন ঘুরে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। পা¤প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাম্পগুলোতে বর্তমানে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক। বিশেষ করে অকটেন সরবরাহ বাড়ানো এবং সীমাবদ্ধতা তুলে দেওয়ার কারণে বাজারে চাপ অনেকটাই কমে গেছে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল দেওয়া হতো না, এখন চালকরা ইচ্ছেমতো তেল নিতে পারছেন। এতে ভোগান্তি ছাড়াই দ্রুত সেবা পাচ্ছেন তারা।গ্রাহকদের অভিযোগ, তেলের দাম বাড়াতেই এতদিন জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি করা হয়েছিল। যেভাবে এখন সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে সংকট তৈরী করা হয়েছে। তেলের পাম্পের ভিড় এখন গ্যাস রি-ফুয়েলিং স্টেশনে শুরু হয়েছে।আহসান উল্লাহ নামে এক সিএনজি চালক জানান, তারা নগরীর যে কোন স্টেশনে গ্যাসের জন্য গেলে মাইলেরও অধিক ভিড় দেখছেন। রি-ফুয়েলিং স্টেশনের মালিক ও কর্মচারীরা বলছে, গ্যাস সংকটের কারণে চাপ কম, তাই রিফুয়েলিং করতে সময় লাগছে। এতে গ্যাস চালিত যানবাহনগুলোর ভিড় বাড়ছে। নগরীর টাইগার পাস মোড়ের ইন্ট্রাকো সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশনে গ্যাস রি-ফুয়েলিং করতে আসা প্রাইভেটকার চালক রেজাউল করিম বলেন, শুক্রবার সকাল ৯ টায় গ্যাস নিতে এসে লাইনে দাড়িয়েছি। এখন দুপুর দেড়টা বাজে। এখনো পর্যন্ত গ্যাস নিতে পারিনি। সামনে যে লাইন আছে তাতে মনে হচ্ছে আরও এক ঘন্টা সময় লাগবে। এভাবে নগরীর প্রতিটি গ্যাস রি-ফুয়েলিং স্টেশনে ভিড় জমে আছে বলে জানান গ্যাস নিতে আসা চালকরা। অন্যদিকে স্বস্তির নিংশ্বাস ফেলছেন তেলের পাম্পগুলোর কর্মচারী ও তেল নিতে আসা যানবাহন চালকরা। তারা বলছেন, আগে যেখানে প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি থাকতো এখন সেখানে স্বাভাবিক সময়ের মতোই অল্প কিছু গাড়ি থাকছে। কোন কোন পা¤েপ কর্মরতরা অলস সময় কাটাচ্ছে। নগরীর গণি বেকারি সংলগ্ন কিউ সি ট্রেডিংয়ে অকটেন নিতে আসা মোটরসাইকেল চালক রহিম উল্লাহ বলেন, আমি মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করি। এ কয়েকদিন সীমাহীন কষ্ট করতে হয়েছে। এক ঘণ্টা, কোন সময় দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হয়েছে। হঠাৎ দেখি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এরপরই দেখি পা¤েপর চিত্র পাল্টে গেছে। তেল নেওয়ার কোনো লিমিটেশন নেই। ফুল ট্যাংক লোড করে নিতে পারছি। চট্টগ্রাম মহানগরীর গাড়ির বেশি চাপ থাকা পা¤েপর একটি দামপাড়া এলাকার মেসার্স সিএমপি ফিলিং স্টেশন। দেড় মাস ধরে রাতদিন লাইন থাকতো পা¤পটিতে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে উল্টো চিত্র মিলেছে। শুক্রবার সকালে পা¤পটিতে গাড়ির কোনো লাইন ছিল না।একই চিত্র দেখা গেছে নগরীর নাছিরাবাদ ও কাতালগঞ্জ এলাকার পা¤পগুলোতেও। আগে যেখানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লম্বা লাইন থাকতো, সেখানে এখন স্বাভাবিক বিক্রি হচ্ছে। কিছু পা¤েপ একসময় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ির লাইন থাকলেও বর্তমানে সেই দৃশ্য একেবারেই অনুপস্থিত।পা¤প মালিকদের ভাষ্য, ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে অকটেনের ক্ষেত্রে সরবরাহ উন্মুক্ত করে দেওয়ায় বাজারে স্থিতিশীলতা এসেছে। এতে একদিকে যেমন গাড়ির চাপ কমেছে, অন্যদিকে মানুষের মধ্যে থাকা আতঙ্কও অনেকটাই দূর হয়েছে।কিউ সি পা¤েপর কর্মচারী মো. আলমগীর বলেন, তেলের দাম বাড়ানোর পর বুধবার একটু চাপ ছিল। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে চাপ একদম কমে গেছে। অনেকে আগে অকটেন-পেট্রোল মজুত করেছিল, দাম বাড়ানোর পর এখন সেগুলো ব্যবহার করছে। এজন্য পা¤েপ চাপ কমে গেছে।তিনি বলেন, দুইদিন আগেও সবাই ট্যাংকি ভরে অকটেন নিতে চাইতো। এখন নিচ্ছে তিনশ থেকে পাঁচশ টাকার মতো। এখন কেউ আর অতিরিক্ত তেল কিনছেন না। আতঙ্ক প্রায় কেটে গেছে। জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাম বৃদ্ধির আগে বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছিল। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, সামনে তেলের দাম বাড়বে কিংবা সরবরাহ কমে যাবে। সেই আশঙ্কা থেকে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুত করা হয়েছিল। কিন্তু দাম সমন্বয়ের পর এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ফলে সেই মজুত তেল এখন বাজারে ব্যবহার হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ সীমাবদ্ধ না রেখে উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। এতে পা¤পগুলোতে অস্বাভাবিক ভিড় কমেছে এবং সার্বিক বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে। মানুষের মধ্যে যে 'প্যানিক' তৈরি হয়েছিল, সেটিও কেটে গেছে।সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, অকটেন ও পেট্রোলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ডিজেলের ক্ষেত্রে এখনো কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে কৃষি ও পরিবহন খাতে ডিজেলের চাহিদা বেশি থাকায় এই সংকট পুরোপুরি কাটেনি। তবে সংকট কাটাতে সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে ডিজেল আমদানির চেষ্টা করছে। প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ডিজেল ও অপরিশোধিত ক্রুড অয়েলবাহী জাহাজ দেশে আসতে পারেনি। তবে অকটেন ও পেট্টোল দেশে তৈরী হত। এরপরও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট দেখা দেয়ার কথা বলেন ডিলার ও পাম্প মালিকরা। ফলে আতঙ্কিত হয়ে জ্বালানি তেল নির্ভর যানবাহনের চালক ও মালিকরা অকটেন ও পে্েট্রালের জন্য দেশের সবগুলো পেট্রোল পাম্পে ভিড় জমাতে শুরু করে। যা একপর্যায়ে দীর্ঘ হতে থাকে। এ সময় সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) দেশে অকটেন ও পেট্রোলের কোন সংকট নেই বলে দাবি করেন। তবে ডিপো ও পাম্প মালিকরা তেল মজুত করছে বলে স্বীকার করেন বিপিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। যা সত্যে পরিণত হল সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর। তেলের মূল্য বাড়ার ঘোষণার পরপরই উধাও হয়ে গেল সরবরাহ সংকট।
৩৯ দিন আগে