চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন বিভাগের সাবেক পরিচালক এনামুল করিমের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগে তোলপাড় চলছে বন্দরনগরীসহ সংশ্লিষ্ট মহলে।
ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ আত্মসাৎ, শ্রমিক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দূর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতেই উঠে আসছে এনামুল করিমের নাম।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান সবখানেই এখন টক অব দ্য কান্ট্রি সদ্য এলপিআরে যাওয়া ক্ষমতাধর কর্মকর্তা এনামুল করিম। এমন অভিযোগ বন্দর সংশ্লিষ্টদের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিপিং এজেন্ট মেসার্স ইউনিবেঙ্গল কনটেইনার ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকা সত্ত্বেও সব নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে ছাড়পত্র দেন এনামুল করিম। এর ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাপ্য ১০ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব চরম ঝুঁকিতে পড়ে।
এই বড় অঙ্কের অনিয়ম নজরে এলে তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্টের সঙ্গে অনৈতিক যোগসাজশ করে বন্দরের মাশুল বা রাজস্ব আত্মসাৎ করেছেন এনামুল করিম। আর সেই অর্থ দিয়ে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদের পাহাড়।
গত ৪ জুন দুদকের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয় থেকে বন্দরের চেয়ারম্যানকে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। সেখানে এনামুল করিমের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রায় ১০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও নথিপত্র তলব করা হয়েছে।
আর এই কর্মকর্তার দুর্নীতির খতিয়ান এখানেই শেষ নয়। ২০১৯ সালেও তাঁর বিরুদ্ধে আরও ১১ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু রহস্যজনক ফাইল গায়েবের অলৌকিক ইশারায় তাঁর পদোন্নতির জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায় বন্দর কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করলেও, অদ্যাবধি সেই তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। রহস্যজনকভাবে থমকে আছে সেই ফাইল।
এছাড়া বন্দরের সাধারণ শ্রমিক ও কর্মচারীদের নিয়োগ প্রক্রিয়াও এনামুল করিমের পকেটে বন্দি। প্রতিটি নিয়োগের পেছনে ৫০ হাজার থেকে শুরু করে ১০-১২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ বাণিজ্য হয়। এই বিশাল টাকার খেলা এক হাতে সামলান না তিনি। বন্দরে তাঁর একটি নিজস্ব ক্যাডার ও সহযোগী সিন্ডিকেট রয়েছে।
এই সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা হিসেবে নাম এসেছে-বন্দর শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি মীর নওশাদ, বন্দর শ্রমিক কর্মচারী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর. বন্দর শ্রমিক কর্মচারী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল চৌধুরী। প্রভাবশালী এসব নেতাদের ছত্রছায়ায় বন্দরের সাধারণ শ্রমিকদের খাটিয়ে ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এনামুল করিম।
অভিযোগ অনুযায়ী, এনামুল করিম বর্তমানে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক! এই বিশাল অর্থের একটি বড় অংশ তিনি পাচার করেছেন ইউরোপে। দেশের ভেতরেও বিভিন্ন বেনামে বড় বড় বিনিয়োগ করে রেখেছেন।
বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের ১৮টি প্রধান প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে পরিবহন বিভাগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। পণ্য ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং, জাহাজ বার্থিং (ভেড়ানো), লাইসেন্স প্রদানসহ বন্দরের মূল চালিকাশক্তি এই বিভাগ থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়।
২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে এই বিভাগের প্রধান (পরিচালক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এনামুল করিম। তবে অভিযোগ রয়েছে, শুধু পরিচালক হওয়ার পর থেকেই নয়, বন্দরে যোগদানের পর গত দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এই পরিবহন বিভাগের সব ধরনের অবৈধ লেনদেন ও সিন্ডিকেটের চাবিকাঠি তাঁরই হাতে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, এনামুল করিম অত্যন্ত চতুরতার সাথে রাজনৈতিক পরিচয় বদল করেন। কখনো নিজেকে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ওবায়দুল কাদেরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে জাহির করেন। আবার রাজনৈতিক হাওয়া বদল হলে মুহূর্তেই জামায়াত-বিএনপির কট্টর সমর্থক সেজে যান।
আবার নির্বাচনের পর বিএনপির বড় শুভাকাঙ্খি সেজে যান। রাজনৈতিক ভোলবদল ও প্রভাবশালী মহলের ব্যাকআপের কারণেই বছরের পর বছর সুরক্ষিত থাকে এনামুল করিমের চেয়ার। এমনকি থেকে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
দুদকের সহকারী পরিচালক অংটি চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, বর্তমানে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি করে মোট চারটি দুর্নীতির মামলা চলছে। মামলার প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র আমাদের হাতে এসেছে। বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত কার্যক্রম চলছে।
এই বিষয়ে মতামত নিতে এলপিআরে থাকা এনামুল করিমের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এমনকি ফোন নাম্বারের হুয়্যাটস অ্যাপের মেসেজ অপশনও বন্ধ পাওয়া যায়।