চট্টগ্রামের ফুসফুসখ্যাত রূপসী কর্ণফুলী নদীর পাড় হতে যাচ্ছে যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত। এই পাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে দীর্ঘ সাড়ে ৮ কিলোমিটার আউটার রিং রোড। যা মূলত জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
এই আউটার রিং রোড চালু হতে আর মাত্র ১০ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে। যা চলতি বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন।
প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্যই ছিল চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো প্রকল্পের মূল কাজ শেষ করা। ইনশাআল্লাহ, আমরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তা সম্পন্ন করতে পারব।
জমি অধিগ্রহণের অর্থায়ন নিয়ে কিছু প্রশাসনিক জটিলতা ছিল, যা আমাদের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে আলোচনা করে দ্রুত সমাধান করে ফেলেছি।
সিডিএর তথ্যমতে, চট্টগ্রাম মহানগরীর শাহ আমানত সেতু থেকে মোহরা পর্যন্ত বিস্তৃত সাড়ে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের দৃষ্টিনন্দন এই সড়কটি চলতি ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
এই মেগা প্রকল্পের সমাপ্তি বন্দরনগরীর আবাসন, পর্যটন ও শিল্পখাতে বিনিয়োগের এক অভূতপূর্ব দুয়ার খুলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। সড়কটির নির্মাণশৈলী ও নান্দনিক রূপ দেখতে এখনই প্রতিদিন শত শত ভ্রমণপিপাসু মানুষ ভিড় করছেন নদীর পাড়ে।
সড়কের বাস্তব চিত্রে দেখা যায়, একপাশে কর্ণফুলী নদীতে ভেসে চলা ছোট-বড় নৌকা ও বিশালাকার বাণিজ্যিক জাহাজের সারি, আর অন্যপাশে চিরসবুজ প্রকৃতির বুক চিরে চলে গেছে মসৃণ পিচঢালা পথ। শীতল হাওয়া আর নদীর কলতানের এই মেলবন্ধন চট্টগ্রামবাসীর জন্য এক নতুন বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ ভৌত অবকাঠামোর কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সড়কটি চালু হলে চট্টগ্রামের ট্রাফিক ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।
বর্তমানে কালুরঘাট এলাকা থেকে কর্ণফুলী সেতুতে পৌঁছাতে যেখানে তীব্র যানজটের কারণে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগে যায়, এই রিং রোড ব্যবহার করে সেই দূরত্ব মাত্র ১০ মিনিটে নেমে আসবে। এছাড়া কাপ্তাই রাস্তার মাথা হয়ে সড়কটি উত্তর চট্টগ্রামের সাথে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সরাসরি ও দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করবে।
যোগাযোগের পাশাপাশি এই রিং রোডকে ঘিরে পর্যটনের এক বিশাল ক্যানভাস তৈরি করছে সিডিএ। নদীর তীরবর্তী ৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে 'কর্ণফুলী রিভারভিউ পার্ক'। যেখানে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য থাকছে আধুনিক ওয়াকওয়ে বা হাঁটার পথ, ডেডিকেটেড সাইকেল লেন এবং নদী দেখার জন্য বিশেষ বসার গ্যালারি।
অন্যদিকে নদীপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫ ফুট উঁচু করে নির্মিত এই শক্তিশালী সড়কটি চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের অভিশাপ 'জলাবদ্ধতা'র বিরুদ্ধে একটি প্রাকৃতিক বাঁধ বা প্রতিরোধক দেয়াল হিসেবে কাজ করবে। ফলে জোয়ারের পানি ও বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে নগরীর বাকলিয়া, চান্দগাঁও ও মোহরার মতো নিম্নাঞ্চলগুলো। সড়কটির কল্যাণে একসময়ের অবহেলিত ও অনুন্নত এই বিশাল অঞ্চলটি এখন আধুনিক বাণিজ্যিক ও আবাসন জোনে পরিণত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।
তবে সড়কটির বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক কামাল মোস্তফা চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামে দূরপাল্লার ভারী যানবাহন যেমন ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান রাখার জন্য পর্যাপ্ত ও সুনির্দিষ্ট কোনো টার্মিনাল নেই। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত, যেমন বেনাপোল থেকে আসা চালকদের বিশ্রামের জন্য এবং পণ্যবাহী গাড়িগুলো সুশৃঙ্খলভাবে পার্কিং করার জন্য এই রিং রোডের পাশে যদি সরকার একটি আধুনিক ও বড় টার্মিনাল স্থাপন করে, তবে এটি দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে ২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরে এই মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু করে সিডিএ। দীর্ঘ ৯ বছরের আইনি, আর্থিক ও কাঠামোগত অপেক্ষা শেষে চার লেনের এই দৃষ্টিনন্দন আউটার রিং রোডটি চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি ও আধুনিক যাতায়াতের প্রধান লাইফলাইনে পরিণত হতে যাচ্ছে। একইসাথে রূপসী কর্ণফুলীর পাড়ে যোগ করবে এক নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতা।