যথাযথ সম্মান ও বিনম্র শ্রদ্ধায় চট্টগ্রামে পালিত হচ্ছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে দিনটিতে নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফুল নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভে এসে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন সর্বস্তরের মানুষ।
বুধবার (৫ আগস্ট) সকাল থেকেই নগরীর নিউমার্কেট এলাকার রেলওয়ে স্টেশন কম্পাউন্ডে অবস্থিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে মানুষের ঢল নামে। সকাল ১০টায় জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে প্রথম পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।
এ সময় শ্রদ্ধা জানান ভূমি ও পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মো. হেলাল উদ্দীন, বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শ্রদ্ধা জানান।
এরপর বিএনপি, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, শহীদ পরিবার, আহতদের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। একসময় ফুলে ফুলে ভরে যায় স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গন। এর পরপরই বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, শহীদদের পরিবার, আন্দোলন-সংগ্রামের আহত যোদ্ধা এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ সারিবদ্ধভাবে স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
সকাল থেকেই স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে দেখা যায় সর্বস্তরের মানুষের ভিড়। হাতে ফুল, চোখে পানি আর বুকে ক্ষোভ-শ্রদ্ধার সংমিশ্রণ নিয়ে এসেছিলেন সাধারণ নাগরিকেরা। প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে পুরো জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ এলাকা পরিণত হয় এক শোক ও গণচেতনার মিলনমেলায়। সর্বস্তরের মানুষের একটাই প্রত্যাশা, শহীদদের রক্তের মর্যাদা রেখে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
নগরীর আগ্রাবাদ থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসা রেহানা আক্তার বলেন, আজকের এই দিনটি আমাদের নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। যে তরুণদের তাজা রক্তের বিনিময়ে আমরা মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি, তাদের ঋণ কোনো দিন শোধ করা যাবে না। সন্তানদের নিয়ে এসেছি যেন তারা বুঝতে পারে এই স্বাধীনতার ইতিহাস কতটা ত্যাগের।
আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা কলেজ শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, আমরা যে নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি, তা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। ৫ আগস্ট শুধু একটি দিন নয়, এটি অন্যায় ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষের জেগে ওঠার প্রতীক। আমাদের লড়াই শেষ হয়নি, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন না হওয়া পর্যন্ত এই চেতনা আমরা ধারণ করে রাখব।
প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসনের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেন, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশে আসা ঠেকাতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধরে রাখতে হবে।
চব্বিশের আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বললেন, তখন আমাদের ছাত্র জনতা সবার মধ্যে আন্দোলনের যে উদ্যম ছিল আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গুলিবর্ষণ করেও সেটা দমাতে পারেনি। অনেকে প্রত্যক্ষভাবে জুলাই অভ্যুত্থানে ছিলেন না। কিন্তু আমাদের নানাভাবে খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে সহযোগিতা দিয়েছেন। নিউমার্কেট মোড় দখলে নিতে গিয়ে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে যারা আহত হয়েছেন, তামাকমুণ্ডি লেইনের ব্যবসায়ীরা তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন।
তিনি জানান, এই যে আন্দোলনের নানাভাবে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, ঐক্যবদ্ধ থাকা এটাই জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট। এই স্পিরিট আমাদের ধরে রাখতে হবে। তাহলে শেখ হাসিনা জীবনেও আর বাংলাদেশে আসতে পারবে না।’
রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিছু মতানৈক্য দেখতে পাচ্ছি। এটা স্বাভাবিক। পথ চলতে গেলে থাকবেই। সরকারের যৌক্তিক সমালোচনা করুন। কিন্তু দেশের স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থে আমরা সবাই যেন জুলাই-আগস্টের গণভুত্থানের মতো কাঁধে কাধ মিলিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারি। বিনা বিচারে দেশবিরোধী শক্তি যেন আবার রাজনীতি করার দুঃস্বপ্ন না দেখে, সেই দুঃসাহস যেন তাদের না হয় সেজন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
গত বছর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যে জুলাই জাতীয় সনদ ঘোষণা হয়েছে, সেটার আলোকে বিএনপি সরকার সব সংস্কার বাস্তবায়ন করবে বলেও আশ্বাস দেন মীর হেলাল।
এরপর প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল বুধবার (৫ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সেমিনার ও আলোচনা সভায়ও বক্তব্য রাখেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এখানে দেশবিরোধী, রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা সরকারবিরোধী কোনো পক্ষকে আপনারা প্রশয় দেবেন না। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিকভাবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে একবার মার্চে, একবার এপ্রিলে, একবার মে মাসে, আবার একবার ডিসেম্বরে আসার নানা ধরনের গুঞ্জন ছড়ানো হয়। এই অবৈধ স্বৈরাচারিণী জীবদ্দশায় আত্মসমর্পণ ও সাজা ভোগ না করে বাংলাদেশে ঢুকতে পারবে না, যতদিন একজন দেশপ্রেমিক বাংলাদেশি জীবিত আছে, অবশ্যই তাকে বাংলাদেশে ফেরত আনা হবে। আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
এ সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে সকলের জন্য সমতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সমঅধিকারের বিষয়ে কথা বলতে পারার একটি ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তুলতে বর্তমান প্রশাসন কাজ করছে। একইসাথে শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত ১৭ বছরে বিভিন্নভাবে অবহেলিত হওয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সেই অবস্থান থেকে বের করে আনতে শিক্ষা, গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে প্রশাসন কাজ করছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইতিহাসের আয়নায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান : ভাবাদর্শের রুপান্তর ও বাস্তবতার অভিঘাত’ শীর্ষক এই আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন।
এতে বক্তব্য দেন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম, চাকসুর সাধারণ সম্পাদক সাঈদ বিন হাবিব, সহ-সাধারণ সম্পাদক আইয়ুবুর রহমান তৌফিক প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক জাহিদুর রহমান। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন অনুষদের ডিন, আবাসিক হলগুলোর প্রভোস্ট, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
চসিক :
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও রাজপথের আন্দোলনকে বেগবান করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষ্যে চট্টগ্রাম নগরীর নিউ মার্কেট মোড় এলাকার জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে তিনি এসব কথা বলেন। মেয়র বলেন, জুলাই-আগস্টের শহীদরা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক চেতনা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা আগামী প্রজন্মের পথচলার দিকনির্দেশনা হয়ে থাকবে। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো কেবল কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, তাদের আদর্শ ও স্বপ্নের বাংলাদেশ তৈরি করাই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো।’
মেয়র বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা একক রাজনৈতিক দলের সাফল্য নয়; এটি ছাত্র, শ্রমিক, রাজনৈতিক কর্মী, সুশীল সমাজ ও সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের ফল। তাই একে কোনো সংকীর্ণ কোণ থেকে মূল্যায়ন না করে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখতে হবে।
চসিক মেয়র বলেন, দীর্ঘদিনের লড়াই, মামলা-হামলা, কারাবরণ ও নির্যাতনের মধ্য দিয়েই জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে উঠেছিল। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, শত প্রতিকূলতা ও কারাভোগ সত্ত্বেও তিনি দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের পথ থেকে সরেননি। একই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমান আন্দোলন-সংগ্রামকে সুসংগঠিত করতে ভূমিকা রেখেছেন।
বক্তব্যকালে মেয়র জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের সদস্য শহীদ ওয়াসিম আকরাম, আবু সাঈদ, মুগ্ধ, রাব্বি, ফারুক, তানভীরসহ সব শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমাজের বিত্তবান ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান।
‘জুলাই চেতনায় গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’-এই প্রত্যয় ব্যক্ত করে চসিক মেয়র দেশের সব নাগরিককে বিভেদ ভুলে সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা করার আহ্বান জানান। স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের সময় চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিনসহ চসিকের বিভাগীয় ও শাখা প্রধানরা, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা ও রাজনৈতিক নেতারা জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
চউক :
জুলাই শহীদ পরিবারের আর্তনাদ এবং স্বজন হারানোর বেদনার কথা শুনলে নিজেকে স্থির রাখতে পারি না। শহীদদের আত্মত্যাগ ও আহতদের ত্যাগ জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন।
বুধবার (৫ আগস্ট) জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। দিবসটি উপলক্ষে সকালে চউক চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের তাৎপর্যবিষয়ক আলোচনা সভা এবং জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি।
আলোচনা সভায় চউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল এই জুলাই গণঅভ্যুত্থান। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ে আমি আমার অসংখ্য সহযোদ্ধা ও রাজপথের ভাইকে হারিয়েছি। জুলাই শহীদ পরিবারের আর্তনাদ এবং স্বজন হারানোর বেদনার কথা শুনলে নিজেকে স্থির রাখতে পারি না।
তিনি বলেম, আমি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সব শহীদ, আহত এবং তাদের পরিবারের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানাই। শহীদদের আত্মত্যাগ ও আহতদের ত্যাগ জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ :
চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবুর রহমান শামীম বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একদিনের ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, গুম, হত্যা, কারাবরণ ও নির্যাতনের ধারাবাহিক ফল। তিনি দাবি করেন, ছাত্রদের আন্দোলনের সময় বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমান নিয়মিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে রাজপথে থাকার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তার নেতৃত্ব ও ছাত্র-জনতার সম্মিলিত আন্দোলনের মধ্য দিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছিল।
বুধবার (৫ আগস্ট) চট্টগ্রাম নগরের জেমিসন রেড ক্রিসেন্ট মাতৃসদন হাসপাতালের সেমিনার হলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে শহীদদের স্মরণে আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি চট্টগ্রাম জেলা ইউনিট ও জেমিসন রেড ক্রিসেন্ট মাতৃসদন হাসপাতালের উদ্যোগে মানবতা, আত্মত্যাগ ও জাতীয় চেতনায় শহীদদের অবদান প্রতিপাদ্যে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ, জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুস্বাস্থ্য কামনায়ও দোয়া করা হয়।
মাহবুবুর রহমান শামীম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বিভক্তি বা বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই। এটি ছাত্র, জনতা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত আন্দোলনের ফসল। তবে শুরু থেকেই বিএনপির নেতাকর্মীরা ছাত্রদের পাশে থেকে সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের পুনর্বাসন এবং আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জেমিসন রেড ক্রিসেন্ট মাতৃসদন হাসপাতালের চেয়ারম্যান হিসেবে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার প্রসঙ্গ তুলে শামীম বলেন, এক সময় এ হাসপাতালের সেবার মান অনেক সরকারি হাসপাতালের চেয়েও উন্নত ছিল। সেই হারানো গুণগত মান ফিরিয়ে আনতে চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। আন্দরকিল্লার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে নগরবাসী আরও বেশি উপকৃত হবে।
জেমিসন রেড ক্রিসেন্ট মাতৃসদন হাসপাতালের চিফ মেডিকেল অফিসার ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নাজ সোহানী সুলতানার সভাপতিত্বে এবং পরিচালনা কমিটির সদস্য রায়হানুল আনোয়ার রাহীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় বোর্ড সদস্য ডা. সারওয়ার আলম।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন জেমিসন রেড ক্রিসেন্ট মাতৃসদন হাসপাতালের পরিচালনা কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর আলম বাবর, নার্সিং ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মর্জিনা আক্তার, হাসপাতালের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা আশরাফ উদ্দৌলা সুজন, রেড ক্রিসেন্টের ইউনিট লেভেল অফিসার জিয়াউল হক জিয়া, যুব রেড ক্রিসেন্ট চট্টগ্রাম ইউনিটের যুবপ্রধান সিরাজুল করিম হিরু এবং নার্সিং ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস জুঁইসহ অন্যরা।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল :
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬ উপলক্ষে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জনাব মোঃ সুবক্তগীন। এ সময় পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় প্রধানগণসহ অন্যান্য কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
চুয়েট :
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ পালিত হয়েছে। বুধবার (৫ আগস্ট) দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে ছিল আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, প্রামাণ্যচিত্র প্রতিযোগিতা, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা এবং দোয়া মাহফিল।
সকালে চুয়েটের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল কক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম বলেন, আমাদের মাঝে বিভাজনের চেষ্টা চলছে। আমাদের একতা বজায় রেখে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব অধ্যায়। এই আন্দোলনে শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ ওয়াসিমসহ সব শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং আহতদের প্রতি সমবেদনা জানান।
চুয়েট ভিসি বলেন, যার যার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সত্য, বাস্তবতা, ভালো-মন্দ স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। প্রশংসার মাধ্যমে কাউকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়, যাতে তিনি প্রকৃত সত্য জানতে না পারেন এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বুঝতে ব্যর্থ হন।
তিনি আরও বলেন, আমি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী। সততা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে গেলে সফলতা অনিবার্য। হিংসা, বিদ্বেষ ও আক্রোশ পরিহার করে সমাজে শান্তি ও স্থিতি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সব ধরনের অবিচার ও নির্মমতার বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অধ্যাপক সায়েম বলেন, বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেশের প্রতি চুয়েটের দায়িত্ব অনেক বেশি। তাই সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজে মনোনিবেশ করে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় চুয়েটের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, রেজিস্ট্রার, প্রভোস্ট, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা বক্তব্য দেন।
জামায়াত ইসলামি :
জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম মহানগরের সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান হেলালী বলেছেন, জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নের অন্যতম দাবি হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিক, দুর্নীতিমুক্ত ও জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। বন্দরকে ঘিরে সব ধরনের ষড়যন্ত্র, দুর্নীতি ও শ্রমিকবিরোধী অপতৎপরতা প্রতিহত করে শ্রমিকদের অধিকার এবং দেশের সার্বভৌম স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে।
বুধবার (৫ আগস্ট) নগরের বন্দর এলাকায় বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘ আয়োজিত জুলাই র্যালি-পরবর্তী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শামসুজ্জামান হেলালী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল বৈষম্য, স্বৈরাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণমানুষের আন্দোলন। এ আন্দোলনে শ্রমিকদের আত্মত্যাগ জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। জুলাই যোদ্ধাদের ওপর হামলা, হয়রানি এবং তাদের অবদানকে খাটো করার যেকোনো অপচেষ্টা বন্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সফল করতে শ্রমিক সমাজের আত্মত্যাগ ছিল অবিস্মরণীয়। সেই আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন, জুলাই যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং শ্রমিকবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো সম্ভব।
চট্টগ্রাম বন্দর প্রসঙ্গে জামায়াতের এ নেতা বলেন, দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে কোনো ষড়যন্ত্র জনগণ মেনে নেবে না। বন্দরের শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, কর্মসংস্থান ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের যেকোনো অপতৎপরতা প্রতিহত করে বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি এস এম লুৎফর রহমান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সফল করতে শ্রমিকরা রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু এখনো অনেক জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের ন্যায্য স্বীকৃতি ও পুনর্বাসন নিশ্চিত হয়নি। তাদের মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা, জাতীয় স্বার্থ ও শ্রমিকদের অধিকার কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। বন্দরকে কেন্দ্র করে যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, ন্যায্য অধিকার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
সংগঠনের সভাপতি মুহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ ইয়াছিনের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের চট্টগ্রাম মহানগরের সহসভাপতি মকবুল আহমদ ভূঁইয়া, সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব চৌধুরী।
এনসিপির গণভোজ আয়োজন
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ দিবসে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) চট্টগ্রামে আয়োজন করেছে গণভোজ কর্মসূচির। এনসিপি নেতারা জানালেন, এতে পাঁচ হাজার মানুষকে ‘চিকেন বিরিয়ানি’ রান্না করে খাওয়ানো হয়েছে। বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের লালদিঘী মাঠে এ গণভোজ কর্মসূচি হয়েছে। মাঠজুড়ে সামিয়ানা টানিয়ে চেয়ার-টেবিল পেতে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হয়।
নগরের বিভিন্ন এতিমখানা ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, ভিক্ষুক, ভাসমান লোকজন, আন্দোলনকারী ও আহতরাসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং এনসিপির নেতাকর্মীরা গণভোজে অংশ নেন। দুপুর ১২টায় দোয়া-মোনাজাতের মাধ্যমে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইব।
নগর এনসিপির দপ্তর সম্পাদক রিদুয়ান হৃদয় বলেন, ‘পাঁচ হাজার মানুষের জন্য গণভোজের আয়োজন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির পক্ষ থেকে এ আয়োজন। সবার জন্য চিকেন বিরিয়ানি। গণভোজ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাধারণ মানুষ আমাদের গণভোজে শরিক হয়েছেন।’
এনসিপির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরির জন্য আনন্দমুখর এ আয়োজন করা হয়েছে বলে জানালেন রিদুয়ান হৃদয়। পুরো আয়োজনে কত খরচ হয়েছে সেটা এখনও হিসাব করা হয়নি বলে জানালেন রিদুয়ান হৃদয়। তবে নগর এনসিপির আরেক নেতা বলছিলেন, গণভোজের জন্য সাত লাখ টাকা বাজেট করা হয়।
মহানগর এনসিপি খরচের পুরো টাকা তাদের দলীয় তহবিল থেকে বহন করছে বলে জানালেন রিদুয়ান হৃদয়। এছাড়া চট্টগ্রামের লাভলেইনে মেরিটাইম মিউজিয়াম সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে নৌবাহিনী।