ভুয়া বিল বানিয়ে ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা গায়েব হওয়ার ঘটনায় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অডিটরসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুদক, চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ বাদি হয়ে মামলাটি করেন দুদকের উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন।
মামলার আসামিরা হলেন—রেলওয়ের অস্থায়ী কর্মচারী মো. হাবিবুল্লাহ খান, সাবেক অডিটর পবন কুমার পালিত, জুনিয়র অডিটর মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ও খোকন চন্দ্র দে, হিসাব কর্মকর্তা মো. মামুন হোসেন, হিসাবরক্ষক সৈয়দ মো. সাইফুর রহমান, হিসাব কর্মকর্তা মো. আবু নাছের এবং অফিস সহায়ক মো. মাকসুদুর রহমান।
এছাড়া আসামির তালিকায় আরও আছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্স ও বিজ্ঞাপন পরিদর্শক মুহাম্মদ ইকবাল, সাবেক উপকর কর্মকর্তা এম মনজুর উদ্দিন চৌধুরী ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন এবং সীমান্ত ব্যাংক পিএলসির সাবেক অফিসার মো. পারভেজ, রিলেশনশিপ ম্যানেজার বিদেশ বড়ুয়া এবং সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ার।
এ তথ্য নিশ্চিত করেন চট্টগ্রাম দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২ এর দুদকের উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন। তিনি জানান, আসামিরা পরস্পরের সহযোগিতায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভুয়া বিলের মাধ্যমে রেলওয়ের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে জালিয়াতি, প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে রেলওয়ের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে।
‘মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের চারটি বিলের বাইরে অতিরিক্ত ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার একটি ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ পরিশোধ করা হয়।২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই চেক ইস্যু করা হয়।
পরদিন চেকটি সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় ‘দি কসমোপলিটন করপোরেশন’র নামে খোলা একটি হিসাবে জমা দেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে ওই হিসাব থেকে পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়। অনুসন্ধানে রেলওয়ের হিসাব অধিদপ্তরের বিল রেজিস্টার ও অন্যান্য নথিতে ভুয়া বিলটির বৈধ এন্ট্রি পাওয়া যায়নি।
এজাহারের বিবরণ মতে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া এবং সীমান্ত ব্যাংকে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কোহিনুর আক্তার নামে এক নারীর পরিচয় ব্যবহার করা হয়। তবে ওই নারী একজন শ্রমিক। অনুসন্ধানে কোহিনুর আক্তার ও সোহাগ আলীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তদন্তে তাদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হবে।
২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তার (পূর্ব) কার্যালয়ের (এফএঅ্যান্ডসিএও) ওই সাত কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে প্রথমে বদলি করা হয়। পরে ১১ ফেব্রুয়ারি তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সাত কর্মকর্তা ও কর্মচারী হলেন হিসাব কর্মকর্তা মামুন হোসেন, হিসাবরক্ষক শিমুল বেগম, অডিটর (ডিএফএ) পবন কুমার পালিত, হিসাব কর্মকর্তা (প্রশাসন) মো. আবু নাছের, হিসাবরক্ষক (প্রশাসন ও সংস্থাপন) সৈয়দ সাইফুর রহমান, জুনিয়র অডিটর ইকবাল মো. রেজাউল করিম এবং অফিস সহায়ক মাকসুদুর রহমান।
জানা যায়, রেল পূর্বাঞ্চলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান (সাপ্লাইয়ার) ‘দ্যা কসমোপলিটন কর্পোরেশন’ ৩ কোটি ৬২ লাখ ৬১ হাজার টাকার কাজের বিল পায়। তাদের গত ১৮ ডিসেম্বর ৯৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ১৯ ডিসেম্বর ৯০ লাখ ৪৪ হাজার টাকা এবং ২০ ডিসেম্বর ৯৬ লাখ ৯০ হাজার ও ৭৭ লাখ ৫২ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়। চেকগুলো নগদায়ন করা হয় ২১ ডিসেম্বর। এসব চেকের নম্বর ছিল যথাক্রমে আরএ-১১৩৯৩০৪, ১১৩৯৩০৬, ১১৩৯৩০৫ এবং ১১৩৯৩০৭।
কিন্তু আরএ-১১৩৯০৮৫ নম্বরের আরেক চেক দিয়ে গত ৩১ ডিসেম্বর ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার একটি বিল আগ্রাবাদের সীমান্ত ব্যাংক থেকে নগদায়ন করা হয়। বিলটি উত্তোলন করেন সোহাগ আলী নামের এক ব্যক্তি। এই বিলটি নগদায়ন করার জন্য ওই ব্রাঞ্চে কসমোপলিটনের নামের একটি নতুন অ্যাকাউন্টও খোলা হয়। যেটিতে শুধুমাত্র ওই পঞ্চম চেকটি নগদায়ন করা হয়।
এদিকে দেখা গেছে, ৩১ ডিসেম্বর উত্তোলন করা চেকের নম্বরটি আগে দেওয়া বিলের চারটি চেকেরও আগের সিরিয়ালের। অথচ চেকের নম্বরের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী চারটি চেকের পরের সিরিয়াল অনুযায়ী হওয়ার কথা পঞ্চম চেকটি।
এছাড়া পঞ্চম চেকের বিষয়টি রেলের খাতায় রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ নেই, এমনকি প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পূর্ব) দপ্তর থেকেও কোনো বিলের কপি ডিভিশনাল ফাইন্যান্স অফিসে (ডিএফও) ফরোয়ার্ড করা হয়নি।
এ ঘটনার পর বিষয়টি জানাজানি হলে ২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রেল কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক বরাবরে ওই পঞ্চম চেকটি ফেরত চেয়ে চিঠি ইস্যু করে। এরপর এ ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেই চেক এখনো ফেরত দেয়নি।