এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি! এ খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ, ক্ষুদ্র সঞ্চয় সংগ্রহ এবং সহজ আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থার কারণে এই খাত দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৫৬২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এই আমানত প্রবৃদ্ধি গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক অগ্রগতিরই প্রতিফলন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় আমানত বেড়েছে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ গত ডিসেম্বরে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪৯ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। প্রায় ২.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র তিন মাসে।
একইভাবে ২০২৫ সালের মার্চের তুলনায় এক বছরে আমানত বেড়েছে প্রায় ৭,৯২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত বছরের মার্চে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। সে হিসেবে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১৮.৬ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট আমানতের প্রায় ৮২.৫ শতাংশ এসেছে প্রন্তিক এলাকা থেকে। ২০২৬ সালের মার্চ মাস শেষে গ্রামীণ অঞ্চলে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় প্রায় ৪১ হাজার ৬৯৫ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এক বছরে এই খাতে গ্রামীণ আমানত বেড়েছে প্রায় ২০.৯ শতাংশ, যা গ্রামীণ অর্থনীতির দ্রুত আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি শক্তিশালী সূচক। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৮৬৭ কোটি ২০ লাখ টাকা।
তথ্যমতে, হিসাব সংখ্যার দিক থেকেও এজেন্ট ব্যাংকিং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মার্চ ২০২৬ শেষে মোট হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার ২০৩টি। এটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় ৬ লাখ ৩১ হাজার বেশি এবং ২০২৫ সালের মার্চের তুলনায় প্রায় ১৭ লাখ ৯৬ হাজার বেশি। এই প্রবৃদ্ধি স্পষ্টভাবে দেখায় যে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দ্রুত আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং নগদ নির্ভর অর্থনীতি ধীরে ধীরে ডিজিটাল ও ব্যাংকনির্ভর ব্যবস্থায় রূপ নিচ্ছে।
এছাড়াও ঋণ প্রবাহের ক্ষেত্রেও এজেন্ট ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। মার্চ ২০২৬ শেষে এই চ্যানেলের মাধ্যমে মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৯০৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এক বছরে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৩.৭ শতাংশ এবং তিন মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১.৩ শতাংশ। একই সঙ্গে ঋণ হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার ২৮৬টি।
তবে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আউটলেট ও এজেন্ট সংখ্যায় সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমেছে। মার্চ ২০২৬ শেষে মোট আউটলেটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০,৩৩৯টি, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় সামান্য কম। একইভাবে মোট এজেন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫,১৮৪ জন, যা এক বছর আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি বড় ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই পরিসংখ্যানে প্রভাব পড়েছে। তবে বিদ্যমান আউটলেটগুলোর মাধ্যমে লেনদেন ও সেবা কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। যার মাধ্যমে বিপুল বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হয়েছে।
এদিকে নারী অংশগ্রহণ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মোট হিসাবের প্রায় ৪৯.৭ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ ৪৩ হাজার হিসাব নারীদের নামে খোলা হয়েছে। এক বছরে নারীদের হিসাব সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি, যা নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। পাশাপাশি এজেন্ট পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ১,৫৭০ জন নারী এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন, যা মোট এজেন্টের প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমানতের দিক থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও প্রবৃদ্ধির দিক থেকে ময়মনসিংহ বিভাগ সবচেয়ে এগিয়ে, যেখানে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৩.৮ শতাংশ। অন্যদিকে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা পতন দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা রয়েছে। ঋণ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সিলেট বিভাগ সবচেয়ে দ্রুত অগ্রসরমান, যেখানে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৩.৫ শতাংশ।
এজেন্ট ব্যাংকিং খাতে বরাবরের মতো শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির আমানত ছাড়িয়েছে ২২ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। হিসাব সংখ্যা রয়েছে ৬০ লাখেরও বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসি, এরপর ব্যাংক এশিয়া, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এবং ব্র্যাক ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক। বিশেষ করে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়া আউটলেট বিস্তারে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, এজেন্ট ব্যাংকিং খাতে আমানত ও ঋণ উভয় ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, যদিও আউটলেট ও এজেন্ট সংখ্যায় সামান্য হ্রাস একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবুও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর গভীর প্রভাব স্পষ্ট। ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত করা, নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং প্রান্তিক অঞ্চলে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং এখন দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত অতিক্রম করা শুধু একটি পরিসংখ্যানগত অর্জন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের রেকর্ড ভঙ্গ কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে আর্থিক সেবা পৌঁছে দিতে বিপ্লব বয়ে এনেছে। এজেন্ট ব্যাংকিং এখন প্রবাসী আয় বিতরণ অন্যতম চ্যানেলে পরিণত হয়েছে। এটি প্রত্যন্ত এলাকার পরিবারগুলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নে যুক্ত করেছে।’
উল্লেখ্য, ইউএনডিপির সহায়তায় বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর উদ্যোগ শুরু হয় ২০১৩ সালে। ওই বছর পরীক্ষামূলকভাবে বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবা হিসেবে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর অনুমোদন পায় বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া। এরপর ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর একটি নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া। যে কারণে দিনটি এখন এজেন্ট ব্যাংকিং দিবস হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী মুন্সীগঞ্জ জেলার জৈনসার ইউনিয়নে প্রথম এজেন্ট আউটলেট খোলা হয়। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর গ্রামীণ ভিত্তি।