ওমানের আল মিলিদ্দা আল মোছানা স্টেট অফ আল বাতিনাহ এলাকায় গাড়ির ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস আক্রান্ত হয়ে নিহত রাঙ্গুনিয়ার চার ভাইয়ের লাশ মঙ্গলবার (১৯ মে) দেশে আসতে পারে।
রবিবার (১৭ মে) এমন তথ্য জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সমিতি ওমানের সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন চৌধুরী। তিনি জানান, আগামী মঙ্গলবার বিকেলে একটি ফ্লাইটে একসঙ্গে চার ভাইয়ের মরদেহ দেশে পাঠানো হবে। বাংলাদেশ দূতাবাস, চট্টগ্রাম সমিতি ওমান এবং স্বজনেরা মিলে এই প্রক্রিয়া প্রায় স¤পন্ন করেছে।
তিনি বলেন, এটি যেহেতু সড়ক দুর্ঘটনা নয়, তাই লাশ পাঠানোর ব্যয় ওমান সরকার নেবে না। সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন স্বজন ও সমিতির নেতারা। লাশগুলো বর্তমানে ওমানের স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
নিহত চার ভাই হলেন, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের বন্দাররাজা পাড়ার প্রয়াত মোহাম্মদ হাসানের ছেলে রাশেদুল ইসলাম, সাহেদুল ইসলাম, মো. সিরাজ ও মো. শহিদ। তাদের লাশ পাঠাতে পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছে রয়্যাল ওমান পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবারের মধ্যে রিপোর্ট পুলিশের হাতে আসতে পারে। রিপোর্ট পেলেই ভাইদের লাশ দেশে পাঠানো হবে।
এনাম আরও জানান, বড় ভাই মো. রাশেদ (৩৫) বিবাহিত, তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মো. শাহেদ (৩২) বিবাহিত, ছোট দুই ভাই মো. সিরাজ (২৭) ও মো. শহিদ (২৪) দেশে এসে বিয়ে করার কথা ছিল। এজন্য তারা কেনাকাটা করতে গিয়েছিলেন। ১৩ মে রাতের ফ্লাইটে তারা দেশে ফিরতেন।
এনাম জানান, ঘটনার দিন রাত তখন আটটা পেরিয়ে গেছে। এ সময় এক ভাই কাঁপা হাতে ভয়েস মেসেজ পাঠালেন এক আত্নীয়কে। গলার স্বর ভারী, শ্বাস আটকে আসছে। বললেন, শরীর আর সায় দিচ্ছে না। গাড়ি থেকে বের হওয়ার মতো শক্তি নেই। নাকে-মুখে ফেনা আসছে। এরপর মায়ের কাছে ফোন করলেন। দোয়া চাইলেন।
সেই দোয়া আর কাজে লাগেনি। ওই রাতেই একটি ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা গাড়িতে চারজনকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় মানুষ পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে দরজা খোলেন। ভেতরে শুধু নি¯পন্দ চারটি শরীর।
রয়্যাল ওমান পুলিশ তদন্তে নেমে জানিয়েছে, গাড়ি চালু রেখে ঘুমিয়ে পড়ায় এসির এগজস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে চার ভাইয়ের। কার্বন মনোক্সাইড এক নির্মম ঘাতক। এই গ্যাসের কোনো রঙ নেই, কোনো গন্ধ নেই। মানুষ বুঝতেই পারে না কখন সে ঘরে ঢুকে গেছে। আবদ্ধ জায়গায় জমতে থাকে, নিঃশব্দে রক্তের অক্সিজেন কেড়ে নেয়, আর মানুষ ঘুমের মধ্যেই ঢলে পড়েন চিরঘুমে।
বুধবার সন্ধ্যায় চার ভাই ওমানের বারকা এলাকা থেকে রওনা হয়েছিলেন মুলাদ্দাহর উদ্দেশে। পথে হয়তো ক্লান্তি এসেছিল। ওমানের গরমে এসি চালু রেখে গাড়িতেই হয়তো একটু জিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই বিশ্রামই নিয়ে গেল তাদের চিরবিশ্রামে।
স্বপ্নের সংসার, হঠাৎ ধুলো
খালাতো ভাই এমরান হোসেন বলেন, পরিবারটি এক সময় দরিদ্র ছিল। চার ভাই ওমানে গিয়ে কাজ শুরু করার পর ধীরে ধীরে সচ্ছলতার মুখ দেখেছিল সংসারটি। মায়ের মুখে হাসি ফুটেছিল। বাড়িতে একটু স্বস্তি এসেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত রোদে পরিশ্রম করে যাওয়া সেই চার ভাইয়ের বয়স ছিল পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে। জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম বয়স। স্বপ্ন দেখার বয়স। দেশে ফিরে মায়ের পাশে বসার বয়স। সব শেষ হয়ে গেল এক রাতে। একটি বন্ধ গাড়িতে।
তিনি বলেন, চার ভাইয়ের দাফনের জন্য রাঙ্গুনিয়ায় পারিবারিক কবরস্থানে খোড়া হবে চারটি কবর। চার ভাই একসঙ্গে বেঁচেছিলেন, একসঙ্গে মারাও গেলেন, পাশাপাশি শুয়েও থাকবেন চিরকাল। হৃদয়বিধারক এমন দৃশ্য কিভাবে সহ্য করবে আপনজনেরা।
মা এখনো জানেন না ছেলেদের মৃত্যুর খবর
বাইরের পৃথিবী জেনে গেছে, কিন্তু মা খাদিজা বেগম এখনো জানেন না তার চার ছেলের মৃত্যুর খবর। মা জানেন, তাঁর চার ছেলে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছে।
স্থানীয়রা জানান, বেঁচে থাকা একমাত্র ছেলে মো. এনাম নিজেই মায়ের ঘরের দরজায় তালা দিয়ে রেখেছেন। যাতে প্রতিবেশী বা আত্নীয় কেউ মুখ ফসকে বলে না ফেলেন। মায়ের শরীর আগে থেকেই ভালো নেই। এই ধাক্কা তিনি সামলাতে পারবেন না, এই ভয়ে ছেলে নিজের বুকে পাথর চাপা দিয়ে মায়ের মুখে হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
কতটা কষ্ট বুকে নিলে একজন মানুষ মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক থাকতে পারেন, তা কল্পনা করতে গেলেও বুকটা ভারী হয়ে যায়। এনামের বয়স মাত্র বত্রিশ। এই বয়সে চার ভাইকে হারিয়ে মাকে আগলে রাখার এই একাকী লড়াই, এই যন্ত্রণার কোনো ভাষা নেই।
আর সেই ঘরে মা খাদিজা বেগম এখনো অপেক্ষায় আছেন। ছেলেরা হাসপাতালে সুস্থ হচ্ছেন, একদিন ফিরবেন। এই বিশ্বাসটুকু নিয়েই হয়তো প্রতিটি ভোর পার করছেন তিনি। কিন্তু মঙ্গলবার ছেলেরা ফিরবেন, সেদিন তাঁরা আসবেন কাঠের বাক্সে। আর সেই সত্য বুকে লুকিয়ে রাখা এনামের জন্য প্রতিটি মুহূর্ত এখন এক নিঃশব্দ কান্নার নাম।
বন্ধৃু ফোরকানের আহাজারি
স্বজনদের আহাজারির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বইছে শোকের মাতম। নিহতদের পরিবার, আত্নীয়স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে গভীর শোক। এরই মধ্যে নিহত চার ভাইয়ের মধ্যে মো. শহীদের বন্ধু ফোরকানের আবেগঘন একটি ফেসবুক পোস্ট হৃদয় ছুঁয়ে গেছে সবার।
চার ভাইয়ের মধ্যে নিহত মো. শহীদের বন্ধু ফোরকান নিজের ফেসবুক পোস্টে আবেগঘন স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, আমি পারছি না আর বন্ধু, নিজেকে সামলাতে... তোর সঙ্গে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। আজ তুই বেঁচে থাকলে হয়তো তোকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতাম। আফসোস, সেই সময়টা আর কখনো আসবে না।
তিনি আরও লেখেন, আমাদের মেসেজগুলো তোর আইডিতে হাজার বছর ধরে রয়ে যাবে। ২০২১ ব্যাচের বন্ধুদের স্মৃতিগুলোও থাকবে। তোকে সাদ্দাম বলে আর ডাকা হবে না। আজ তোর চেয়ে তোর মায়ের জন্য বেশি কষ্ট হয়। হতভাগা মা তোদের সুখ আর দেখল না। ভালো থাকিস ওপারে বন্ধু, আল্লাহ তোকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চ মাকাম দান করুন।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস সূত্রে জানা গেছে, নিহত চার ভাইয়ের মধ্যে শহীদ ও সিরাজের ১৫ মে দেশে আসার কথা ছিল। মাস্কাট থেকে চট্টগ্রামগামী ফ্লাইটের টিকিটও নিশ্চিত করা হয়েছিল। এছাড়া আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর পুনরায় ওমানে ফেরার টিকিটও কাটা ছিল তাদের।
ওমানে বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর রাফিউল ইসলাম জানান, চার ভাইয়ের মরদেহ স্থানীয় পুলিশের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। ¯পন্সরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ শেষ হলে আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
ওমান পুলিশের সতর্কবার্তা জারি
লেবার কাউন্সিলর রাফিউল ইসলাম জানান, এই র্ট্যাজেডির পর রয়্যাল ওমান পুলিশ সবার উদ্দেশে সতর্কবার্তা জারি করেছে। গাড়ি চালু রেখে আবদ্ধ অবস্থায় ঘুমানো থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এই সতর্কতা বিশেষভাবে জরুরি।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের প্রচন্ড গরমে গাড়িতে এসি চালিয়ে ঘুমানো অনেকের অভ্যাস। কিন্তু গাড়ির কোনো ত্রুটি বা বায়ু চলাচলের সমস্যা থাকলে এই অভ্যাসই হয়ে উঠতে পারে মরণফাঁদ। রাশেদুল, শাহেদুল, সিরাজুল ও শহিদুলের মৃত্যু যেন অন্তত আরও একটি পরিবারকে এই অন্ধকারে পড়তে না দেয়।