চট্টগ্রাম মহানগরীর কয়েকটি সড়কের মধ্যে ব্যস্ততম একটি সড়ক বহদ্দারহাট-আরাকান সড়কটি। এটি ওয়াপদা কলোনি সড়ক নামেও পরিচিত। কিন্তু সড়কের দু‘পাশজুড়ে প্রতিনিয়ত দাড়িয়ে থাকে সারি সারি মাইক্রোবাস আর কার। দেখে বোঝার উপায় নেই-এটি সড়ক, নাকি কার-মাইক্রো স্টেশন।
বছরের পর বছর ধরে চলা কার-মাইক্রোর অবৈধ দখলে সংকুচিত হয়ে পড়েছে পুরো সড়কটি। স্কুলগামী শিক্ষার্থী থেকে অফিস ফেরত মানুষ-প্রতিদিনই দুর্ভোগ আর ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন এই সড়কে। চান্দগাঁও থানার ফরিদেরপাড়া, শমসের পাড়া, খতিবের হাট ও খতিবপাড়া এলাকার অন্তত ৫০ হাজার মানুষের যাতায়াত এই সড়ক দিয়ে।
বহদ্দারহাট মোড় থেকে সড়ক ধরে এগোলেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয়। বিপরীত পাশে ন্যাশনাল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আর বোর্ড কার্যালয় লাগোয়া ওয়াপদা কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই দুটি প্রতিষ্ঠানে কয়েকশ শিক্ষার্থী এই সড়ক ব্যবহার করে। সেই সড়কটিতে গত ২০ বছর ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে কার-মাইক্রোর স্টেশন হিসেবে।
বহদ্দারহাট কার-মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়ন’ এই স্টেশন গড়ে তোলেন। সংগঠনটির নামে এখান থেকে প্রতিদিন তোলা হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা। চাঁদার ভাগ যায় চান্দগাঁও থানা ও ট্রাফিক পুলিশের কাছে। যার বিনিময়ে নির্বিঘ্নে এই সড়ক দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে কার-মাইক্রো স্টেশন।
শনিবার (১৬ মে) বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের প্রবেশমুখেই ২০-২৫ জনের জটলা। কেউ আড্ডা দিচ্ছেন, কেউ ভাড়ার জন্য হাঁকডাক করছেন, কেউবা যাত্রী নিয়ে তর্কে ব্যস্ত। প্রায় ২০ ফুট প্রশস্ত সড়কের পশ্চিমপাশজুড়ে সারি করে দাঁড়িয়ে আছে কার ও মাইক্রো। প্রবেশমুখ থেকে ওয়াপদা কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেষ সীমানা পর্যন্ত তখন দাঁড়িয়ে ছিল ৩৬টি কার-মাইক্রো।
দুপুর ২টা পর্যন্ত ওই এলাকায় অবস্থান করে দেখা যায়, একের পর এক গাড়ি ঢুকছে, আবার যাত্রী নিয়ে বেরিয়েও যাচ্ছে। একদিকে সড়কের অর্ধেক অংশ স্থায়ীভাবে দখল করে রাখা হয়েছে, অন্যদিকে বাকি অংশে অব্যাহত রয়েছে মাইক্রোবাস ও কার চলাচল।
ফলে সাধারণ যাত্রীবাহী যান চলাচলের জায়গা প্রায় থাকছেই না। সড়কটিতে কোনো ফুটপাতও নেই। তাই শিক্ষার্থী ও পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে সড়কের একপাশ ঘেঁষে চলতে হচ্ছে। এর মধ্যে সড়কের একপাশ ভাঙাচোরা। কিন্তু ভালো অংশজুড়ে কার-মাইক্রো রাখায় বাধ্য হয়ে যানবাহন ও মানুষকে চলতে হচ্ছে ভাঙা অংশ দিয়ে।
ন্যাশনাল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও ওয়াপদা কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়। শিশুরা জানায়, ‘রাস্তার একপাশে সবসময় গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। ছোট রাস্তায় সারাক্ষণ গাড়ি চলাচল করায় সবসময় ভয়ে থাকতে হয় তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সড়কে কার-মাইক্রো স্টেশন গত ১৮-২০ বছর ধরে। ফলে বহদ্দারহাট থেকে পুরো সড়কে যানজট লেগে থাকে সবসময়। বর্তমানে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজের কারণে বহদ্দারহাট মসজিদ সংলগ্ন ব্রিজ, খতিবের হাটের কালারপুলসহ তিনটি পুল ভেঙে সংস্কার করা হচ্ছে। এতে বিকল্প হিসেবে এই সড়কের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। ফলে এই সড়কে দুর্ভোগ বেড়েছে কয়েকগুণ।
স্থানীয় বাসিন্দারা দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে বলেন,‘বহু বছর ধরে সড়কের অর্ধেক অংশ দখল করে স্টেশন বসানো হয়েছে। এতে প্রতিদিন ভয়াবহ যানজট তৈরি হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চলাচল। আবার স্টেশনে থাকা কিছু চালক ও সহকারী রাস্তার ওপর আড্ডা দেন। শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসা যাওয়ার সময় মা ও পোশাক শ্রমিকদের যাতায়াতে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। এতে শিক্ষার্থী ও নারীরা চরম অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।’ এ বিষয়ে বহুবার প্রশাসন ও থানায় অভিযোগ দিয়েও কোনো সমাধান হয়নি। কারণ পুলিশ তাদের কাছ থেকে চাঁদার ভাগ খায়।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয়ের সীমানা দেয়াল ঘেঁষে রাখা হয় কার-মাইক্রোগুলো। এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেয়ালগুলোর ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করতে হচ্ছে। এতে সরকারি অর্থ অপচয় হচ্ছে। চালকেরা বিশ্রাম ও আড্ডার জন্য প্রায়ই কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। তখন সিগারেট, এমনকি গাঁজাও সেবন করে। এতে কার্যালয়ের কাজে যাতায়াতে বড় ধরণের সমস্যা তৈরী হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড, পওর বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, এটা আমাদের ওপর একপ্রকার অত্যাচার। কিন্তু সড়কটি তো আমাদের অধীনে নয়, তাই আমরা চাইলেও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারি না। আগে স্থানীয় কাউন্সিলরকে জানিয়েছিলাম, কিন্তু কোনো সমাধান পাইনি।
তবে নিজেদের বহুবছরের পুরনো নিবন্ধনভুক্ত সংগঠন উল্লেখ করে বহদ্দারহাট কার-মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. আলমগীর বলেন,‘আমাদের সমিতির প্রায় ৫০০ সদস্যের বেশিরভাগই স্থানীয় বাসিন্দা। এলাকার কেউ কেউ হয়তো অভিযোগ করেন, কিন্তু বেশিরভাগই আমাদের পক্ষে। কারণ আমাদের কারণে সড়কটি রাতে সবসময় আলোকিত থাকছে, আমরা না থাকলে তো চুরি-ছিনতাই বেড়ে যাবে।
এ বিষয়ে কথা বলতে চান্দগাঁও থানার ওসির মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করলেও কোন সাড়া মেলেনি। কথা বলতে বহদ্দারহাট পুলিশ বক্সে গিয়ে ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টরকেও পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে স্টেশনটি উচ্ছেদ করা হবে।