চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় নিজ ঘরে মা ও মেয়েকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে পাঁচ বছর বয়সী শিশুপুত্রও। নিকটাত্মীয় এক ব্যক্তি খুনের সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তবে সে পলাতক রয়েছে।
শনিবার (১৩ জুন) দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের ০৬নং ওয়ার্ডের চেনামতি বড়ুয়া পাড়া এলাকা থেকে মা-মেয়ের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহতরা হলেন- এনি বড়ুয়া (৪০) ও তার মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়া (১৬)। আহত অবস্থায় এনির ছেলে পিয়াস বড়ুয়াকে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের তথ্য, এনি বড়ুয়ার স্বামী সুজন বড়ুয়া চট্টগ্রাম নগরীর খাতুনগঞ্জে একটি আবাসিক ভবনের নিরাপত্তা প্রহরী। সুজনের চাচাতো ভাই তেজপ্রিয় বড়ুয়ার সঙ্গে তার আর্থিক লেনদেন রয়েছে। এর জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তাকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
পুলিশ আরও জানায়, মা- মেয়ে দুজনকে খুনের সংবাদ পেয়ে রাত ১১টার দিকে পুলিশ বড়ুয়াপাড়ায় যায়। প্রিয়ন্তীর রক্তাক্ত লাশ ঘরের ভেতর থেকে এবং তার মায়ের লাশ ঘরের বাইরে উঠান থেকে উদ্ধার করা হয়। আহত পিয়াসও উঠানেই পড়ে ছিল।
প্রতিবেশীদের বরাতে চট্টগ্রামের আনোয়ারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসান জানালেন, ‘রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রতিবেশীরা সুজন বড়ুয়ার ঘরে চিৎকার শুনতে পেয়ে এগিয়ে যান। সুজন শহরে ছিলেন।
তারা দেখতে পান, রক্তাক্ত অবস্থায় এনি ঘর থেকে বের হয়ে পিয়াসকে কোল থেকে উঠানে ছুঁড়ে ফেলে লুটিয়ে পড়েন। লোকজন তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে সেখানেই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
পরে লোকজন ঘরের ভেতরে ঢুকে প্রিয়ন্তীর রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান।’ এনি ও প্রিয়ন্তীকে ছুরি মেরে খুন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।
প্রতিবেশী সুরভী বড়ুয়ার ভাষ্য, মৃত্যুর আগে এনি তার চাচাতো দেবর তেজপ্রিয় বড়ুয়ার নাম উল্লেখ করেন। ঘটনার পর থেকে তেজপ্রিয়র আর খোঁজ মিলছে না।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদুলের ভাষ্য, মাথায় ছুরিকাঘাতে জখম হওয়া পিয়াস এখন আশঙ্কামুক্ত। নিহত মা-মেয়ের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। মামলার প্রক্রিয়া চলছে।
মাহমুদুল জানান, পরিবারের কর্তা সুজন বড়ুয়া চট্টগ্রাম নগরের খাতুনগঞ্জ এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত। তার দাবি, প্রতিবেশী লিমন বড়ুয়া তেজপ্রিয়র সঙ্গে তার আর্থিক লেনদেন ছিল। তার ধারণা, ওই লেনদেন সংক্রান্ত কাগজপত্রের খোঁজে বাড়িতে এসে হামলার ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকতে পারে।
সুজন বড়ুয়া বলেন, ‘আমি শহরে ছিলাম। রাতে বড় ভাইয়ের ফোন পেয়ে বাড়িতে এসে দেখি সব শেষ হয়ে গেছে।’ মৃত্যুর আগে তার স্ত্রী হামলাকারী হিসেবে লিমন বড়ুয়া তেজপ্রিয়র নাম উল্লেখ করেছিলেন। ঘটনার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
এদিকে খবর পেয়ে রবিবার (১৪ জুন) দুপুরে আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের চেনামতি বড়ুয়া পাড়া এলাকায় ছুটে যান চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম।
তিনি বলেন, আমরা এখানে এসে যা বুঝলাম তা-থেকে হত্যাকারী সম্পর্কে আমাদের ধারণা তৈরি হয়েছে। আশা করি খুব দ্রুত তাকে ধরতে সক্ষম হবো। তারপরই ঘটনার মূল কারণ জানতে পারবো তবে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত কারণে এঘটনা ঘটেছে।
এসময় এএসপি পরিদর্শনের কথা শুনে ঘটনাস্থলে ভীড় জমায় নিহত প্রিয়ন্তী বড়ুয়া (১৬) এর সহপাঠীরা। তারা হত্যাকারীকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে ফাঁসি কার্যকর করার জন্য এএসপির কাছে দাবি জানান।
কান্নারত অবস্থায় উম্মে ফাতিমা নামের এক সহপাঠী জানান, "প্রিয়ন্তী সব সময় হাসিখুশি থাকতো, তার পরিবারের কোনো সমস্যার কথা আমাদের কখনো শেয়ার করেনি। কুরবানির সময় সে তাদের ঘরে গরুর মাংস আনতে বলছিলো আমি আনতে পারিনি এখন আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আমি আমার বান্ধবীর হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।"