চট্টগ্রাম মহানগরীর গণপরিবহনে গতি আনতে এমআরটি (মাস র্যাপিড ট্রানজিট) বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে টানাহেঁচড়া চলছে। এর মধ্যে মেট্রোরেল চাইছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।
আর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) চাইছে মনোরেল। চসিক এরই মধ্যে ৩০ হাজার কোটি টাকার ‘মনোরেল’ প্রকল্প নিয়ে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকও (এমওইউ) সই করে ফেলেছে।
আর গত তিন বছর ধরে মহানগরে মেট্রোরেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে ডিটিসিএ। এই টানাপড়েনের মধ্যে এক পক্ষের দাবি— অবকাঠামোগত কারণে মেট্রোরেল বাস্তবায়নের জন্য চট্টগ্রাম উপযোগী নয়।
পাল্টা জবাবে বলা হচ্ছে, নগরের বিপুল যাত্রীর চাপ নিরসনে মনোরেল কোনো কাজে আসবে না। মনোরেল যেখানে দিনে ১৮ হাজার যাত্রী বহন করবে, সেখানে মেট্রোরেল যাত্রী পরিবহন করবে সাড়ে ৬ লাখ থেকে ১১ লাখ যাত্রী।
দুই সংস্থার এই টানাটানির মধ্যে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা অবশ্য একে ‘মেগা প্রকল্প বিলাস’ বলে অভিহিত করছেন। তাদের স্পষ্ট মত, চট্টগ্রামে ৩০-৫০ হাজার কোটি টাকা ঢেলে মেট্রোরেল বা মনোরেল কোনোটিরই প্রয়োজন নেই। তার বদলে মাত্র হাজার কোটি টাকা খরচ করে নগরের ট্রাফিক ও বিদ্যমান বাস রুট ব্যবস্থা ঢেলে সাজালেই যানজটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
অতীতের গবেষণার তথ্য দিয়ে এমনটাই জানালেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান।
তিনি বলেন, ‘ঘণ্টায় ৫০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করলে মেট্রোরেল বা মনোরেল প্রয়োজন। চট্টগ্রামে বর্তমানে ঘণ্টায় ১৭ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। এ অবস্থায় নগরীতে মেট্রোরেল বা মনোরেলের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা খুবই কম।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যেও মিলছে বিজ্ঞজনের মিল। ২০১৮ সালে চট্টগ্রামের কৌশলগত নগর পরিবহন মহাপরিকল্পনায় (মাস্টারপ্ল্যান) স্পষ্ট বলা হয়েছে, নগরের যানজটের মূল কারণ রাস্তার অপর্যাপ্ততা নয়; বরং রাস্তার ভুল ব্যবহার, যত্রতত্র পার্কিং, সিগন্যালবিহীন মোড় এবং ফুটপাতের অভাব।
যদি এখনই এ বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ২০৩০ সাল নাগাদ চট্টগ্রাম নগরীর গড় গতিবেগ ঘণ্টায় ১১ কিলোমিটার থেকে কমে মাত্র ৭ কিলোমিটারে নেমে আসবে, যা মানুষের হাঁটার গতির প্রায় সমান।
এ জন্য মেগা প্রকল্পের পেছনে না ছুটে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) বা বাসের জন্য অগ্রাধিকার লেন চালু, নগরে পথচারীবান্ধব ফুটপাত তৈরি, ৪৯টি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা জংশন আধুনিকায়ন এবং বিচ্ছিন্ন বাস মালিকদের বড় কোম্পানির অধীনে এনে একটি স্বাধীন ‘পাবলিক ট্রান্সপোর্ট অথরিটি’ (পিটিএ) গঠনের ওপর জোর দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
ডিটিসিএর পরিকল্পনায় মেট্রোরেল
বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম শহরে মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা করে সরকার। মেট্রোরেল চালুর আগে প্রাথমিক সমীক্ষা করতে ৭০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়। কোরিয়ান সাহায্য সংস্থা ‘কইকা’র অর্থায়নে ২০২২ সালের নভেম্বরে অনুমোদিত এই প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
ডিটিসিএ নগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সংযোগ তৈরি করতে মোট ছয়টি রুট নির্ধারণ করেছে, যার অন্যতম প্রধান রুট হলো কালুরঘাট থেকে বিমানবন্দর। প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রধান সড়কে ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ৪০ হাজার যানবাহন চলাচল করত, যা বহন করত ২ লাখ ৯০ হাজার যাত্রী।
ডিটিসিএর প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আগাম ধারণায় বলা হচ্ছে, ২০৪১ সালে এই রুটে যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার। দৈনিক যাত্রীসংখ্যা হবে ৫ লাখ ১২ হাজার। এটি বর্তমান সড়কে যান, যাত্রী ও পণ্য চলাচলের ধারণক্ষমতার চেয়েও ৬৬ শতাংশ বেশি।
ফলে কোনো মেগা প্রকল্প ছাড়া ২০৪১ সালে পুরো সড়কটি অচল (সড়কের ধারণক্ষমতা ও গাড়ির সংখ্যার অনুপাত ১ দশমিক ৬৬) হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের প্রতিবেদন বলছে, এই তীব্র ট্রাফিক জট কাটাতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এমআরটি বা মেট্রোরেল।
সমীক্ষায় আরও তুলে ধরা হয়, মেট্রোরেল চালু হলে প্রধান সড়কে যানবাহনের চাপ ৫৮ শতাংশ কমে আসবে। ফলে যানজটের সূচক ১ দশমিক ৬৬ থেকে নেমে আসবে মাত্র শূন্য দশমিক ৭০-এ। এর মাধ্যমে সড়ক থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার যানবাহন কমে যাবে এবং সেসব যানবাহনের ২ লাখ ৯ হাজার যাত্রী (মোট যাত্রীর ৪২ শতাংশ) মাটির ওপর বা নিচ দিয়ে দ্রুতগতিতে যাতায়াত করতে পারবে।
প্রস্তাবিত ‘মনোরেল’ এই সংকট সমাধানে পুরোপুরি ব্যর্থ হবে বলে দাবি করেছেন প্রকল্পের পরিচালক ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার মীর মোহাম্মদ কামরুল হাসান। তিনি বলেন, সম্প্রতি বৈঠকে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছি চট্টগ্রামে মনোরেল কার্যকর নয়। তা ছাড়া নগরের প্রধান সড়কে ফ্লাইওভার করার কারণে মনোরেল করার জায়গাও নেই। এ জন্য মেট্রোরেল মাটির নিচে করা যায় কিনা, সেটি সমীক্ষা করে দেখছি।’
তাদের হিসাব অনুযায়ী, ৩০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে মনোরেল চালু করলেও তা যানজটের সূচককে অচলাবস্থার সর্বনিম্ন সীমা, অর্থাৎ ১ দশমিক শূন্যের নিচে নামাতে পারবে না। ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নিয়মে সূচক ১ দশমিক শূন্য বা তার বেশি হওয়া মানেই রাস্তা অচল।
চসিকের পরিকল্পনায় মনোরেল
চট্টগ্রাম মহানগরে মনোরেল বাস্তবায়ন করতে গত বছরের ১ জুন আরব কন্ট্রাক্টরস ও ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক চুক্তি সই করে চসিক। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), সড়ক পরিবহন ও সেতু, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়।
বিডা ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমোদন দিলেও অন্য দুই মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সাড়া পায়নি চসিক। গত ৫ মে দুই মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চেয়ে ফের চিঠি দিয়েছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। সর্বশেষ গত ৭ জুন ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মশিউর রহমান চট্টগ্রাম এসে চসিক ও সিডিএর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
চসিক বলছে, চট্টগ্রাম একটি পুরনো ও ঘনবসতিপূর্ণ শহর। যেখানে পর্যাপ্ত জায়গা নেই। শহরে পাহাড়, খাল, বন্দর এলাকা এবং মাটির নিচে ও ওপরে প্রচুর ইউটিলিটি লাইন (গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ) রয়েছে। মেট্রোরেলের জন্য বড় আকারে জমি অধিগ্রহণ করতে হবে, যা কঠিন এবং সামাজিকভাবে সংবেদনশীল। এ কারণে চট্টগ্রামের জন্য হালকা, নমনীয় এবং দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য রেল ব্যবস্থা প্রয়োজন।
প্রকল্পের মুখপাত্র চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু সাদাত মোহাম্মদ তৈয়ব বলেছেন, ‘মেট্রোরেলের জন্য প্রশস্ত করিডর, ভারী নির্মাণকাজ ও গভীর ফাউন্ডেশন দরকার, যেটির কোনো সুযোগ চট্টগ্রামে নেই। কারণ মূল সড়কের নিচে ফ্লাইওভারের ফাউন্ডেশন রয়েছে। এর নিচে মেট্রো করতে গেলে পুরো ফ্লাইওভার ভেঙে পড়বে। এটি অকল্পনীয়। মনোরেলে সরু পিলার ব্যবহার হয়। রাস্তার জায়গা খুব কম লাগে। সরু রাস্তা, খাল ও পাহাড়ের ওপর দিয়ে সহজে নির্মাণ করা যায়। এটিই বাস্তবসম্মত প্রকল্প।