১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া অনেক আগে শেষ হলেও এর নেপথ্যের পরিকল্পনা, সহায়তাকারী ব্যক্তি কিংবা সম্ভাব্য বৃহত্তর ষড়যন্ত্র নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে আজও।
সম্প্রতি মামলার পলাতক আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনকে গ্রেফতারের পর তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। সূত্রগুলোর দাবি, তার জিজ্ঞাসাবাদে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসছে, যা শুধু তার ব্যক্তিগত ভূমিকা নয়, বরং হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে সংঘটিত নানা ঘটনার নতুন ব্যাখ্যা এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেতে সহায়ক হতে পারে।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম. সারোয়ার হোসেনের মতে, একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি কীভাবে এত দীর্ঘ সময় পরিচয় গোপন রেখে বিদেশে অবস্থান করতে সক্ষম হন এবং পরবর্তী সময়ে কীভাবে বাংলাদেশে ফিরে প্রায় তিন দশক আত্মগোপনে থাকতে পেরেছিলেন। এই পুরো সময়ে তার যোগাযোগ, আশ্রয়, অর্থায়ন এবং সহযোগীদের পরিচয় উদঘাটন করাই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য, বর্তমানে সেনা হেফাজতে থাকা মোজাফফরের কাছ থেকে তার দীর্ঘ পলাতক জীবন, বিদেশে অবস্থান, সহযোগী নেটওয়ার্ক এবং ঘটনার সময়কার সামরিক যোগাযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের ধারণা, এসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনাপ্রবাহ আরও স্পষ্ট হতে পারে।
জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর মোজাফফর সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যান। সেখানে দীর্ঘ সময় ভিন্ন পরিচয়ে অবস্থান করার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে ভারতীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশেও ভ্রমণ করেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোজাফফর দাবি করেছেন, ১৯৯৮ সালে তিনি গোপনে বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে ছদ্মপরিচয়ে বসবাস করেন। পরে রাজধানীর একটি আবাসিক এলাকায় পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলেও নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখেন। তদন্তকারীরা এখন অনুসন্ধান করছেন, এত বছর তিনি কীভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলেছেন এবং এই সময়ে তাকে কারা সহযোগিতা করেছে।
মোজাফফরের বিরুদ্ধে নতুন করে সামারি অব এভিডেন্স, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং পরবর্তী কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। তার ভাষায়, বিচার চলাকালে অনেক অমীমাংসিত বিষয় সামনে আসতে পারে। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, পলাতক থাকার পেছনের সহযোগিতা, তৎকালীন সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন বিতর্কিত প্রশ্ন আদালতের আলোচনায় উঠে আসার সুযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিলে সুচতুর মোজাফফর কৌশলে ভারতে পালিয়ে যান। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ দীর্ঘদিন ধরে তাকে প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ও নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে আসছিল।
১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতায় আত্মগোপনে ছিলেন। সে সময় ‘বিপ্লব সরকার’ এবং ‘জয় ব্যানার্জি’ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। ১৯৯৬ সালে তিনি অত্যন্ত গোপনে দেশে ফিরে আসেন এবং বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমল থেকে নির্বিঘ্নে জীবন কাটিয়ে যাচ্ছিলেন।
কললিস্টের সূত্র ধরেই দীর্ঘ ৪৫ বছর পর গত বুধবার রাতে ঢাকার বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে পরদিন বৃহস্পতিবার। ওই দিন সন্ধ্যায় তাকে সেনা হেফাজতে দেওয়া হয়।
এরপর গত শুক্রবার মোজাফফরকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে চট্টগ্রাম ক্যান্টমেন্টের সামরিক আদালতের হেফাজতে নেওয়া হয়। যেহেতু চট্টগ্রাম ক্যান্টমেন্টের কয়েকজন বিপথগামী অফিসারের নেতৃত্বে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল এবং সেখানেই ওই ঘটনার বিচার হয়েছিল তৎকালীন সময়ে, তাই নিয়মানুযায়ী তাকে সেখানে পাঠানো হয়।
রোববার (১৯ জুলাই) রাতে মিলিটারি পুলিশ (এমপি) এবং আর্মি সিকিউরিটি ইউনিটের (এএসইউ) তত্ত্বাবধানে সামরিক বাহিনীর বিমানে তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আনা হয়েছে। সেখানে তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
তবে এক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এককভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, নাকি সামরিক বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি, ডিজিএফআই, এনএসআই, ডিবি পুলিশ কিংবা এসবি এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক ব্যক্তিত্বদের সমন্বয়ে কোন টাস্কফোর্সের মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট অনেকে জানিয়েছেন, পলাতক মেজর মোজাফফরকে গ্রেফতারের মাধ্যমে ইতিহাসের দায়মোচনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিদেশি নেপথ্য কুশলী যারা রয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনের অপ্রকাশিত মাস্টারমাইন্ড কারা? টাস্কফোর্স কিংবা কমিশন গঠনের মাধ্যমে মুজাফফরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তা বেরিয়ে আসবে। ফলে দেশের মানুষ জানতে পারবে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ককে কীভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জিয়া হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের এমন একটি অধ্যায়, যার অনেক প্রশ্নের এখনও সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি। ফলে মোজাফফরের গ্রেফতার এবং জিজ্ঞাসাবাদ তদন্তের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া প্রতিটি তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই, প্রমাণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা। কারণ একটি ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উদঘাটন কেবল রাজনৈতিক নয়, রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের স্বার্থেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের মতে, জিয়া হত্যাকাণ্ড ঘিরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা দাবি ও আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সম্ভাব্য ভূমিকা, তৎকালীন সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিভিন্ন লেখক, গবেষক ও বিশ্লেষক ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোজাফফরের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যা করা হয় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। পরে ওই ঘটনায় সামরিক আদালতে বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করা হয়। মোজাফফর হোসেন ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সেনা কর্মকর্তা স্বাধীনতার পর জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে (জেআরবি) কমিশন পান। পরে বিতর্কিত রক্ষীবাহিনী বিলুপ্ত হয়ে সেনাবাহিনীতে একীভূত হলে তিনি সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৮১ সালে তিনি ২৪ পদাতিক ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন।