ট্যাক্স দেয় না সরকার। খোদ ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছে আটকে আছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ১৯৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা হোল্ডিং ট্যাক্স। এর মধ্যে রেলওয়ে, গণপূর্ত, শিক্ষা ও সওজে আটকে আছে প্রায় ১৫৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা গৃহকর।
পরিমাণটা আরও ডাবল হত যদি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এ রিপোর্ট লেখার আগের দিন ২৯ জুন সোমবার বকেয়া হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ ১৯৮ কোটি ২৬ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ টাকা পরিশোধ না করত। তাহলে কি শুধু খেটে খাওয়া মানুষের পকেট কাটতেই সরকারি ট্যাক্স?
যার উত্তর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিতে গিয়ে চসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, টাকার অভাবে চসিকও নিয়মিত নাগরিক সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনাা করতে হিমশিম খাচ্ছে। বর্জ্য অপসারণ, মশক নিধন কার্যক্রম ও কর্মচারীদের বেতন ঠিকমত দিতে পারছে না। তবে ১৯৭ কোটি টাকা বকেয়া গৃহকর আদায়ে ২৫ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বরাবর চিঠি দিয়েছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। যার একটি সূরাহা শীঘ্রই মিলবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন চসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
চসিকের রাজস্ব বিভাগের নথির তথ্যমতে, মোট ১৯৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা পাওনার সিংহ ভাগই আটকে আছে মাত্র চারটি বড় মন্ত্রণালয়ের কাছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দেনাদার হলো রেলপথ মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ের কাছে মোট পাওনা ১১৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হোল্ডিং ট্যাক্স আটকে আছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে। পাওনা প্রায় ৩০ কোটি টাকা। তৃতীয় সর্বোচ্চ বকেয়া ট্যাক্স আটকে আছে শিখা খাতে, যা প্রায় ১৫ কোটি টাকা। চতুর্থ বড় ট্যাক্সদাতা হচ্ছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তর। তাদের কাছে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বকেয়া ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
এই বকেয়া পরিশোধের জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ মঞ্জুরির অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বাকি ২১টি মন্ত্রণালয়েও চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, চসিকের আয়ের মূল উৎস পৌরকর। এই টাকা থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, আবর্জনা অপসারণ, সড়ক আলোকায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো বহুমুখী উন্নয়ন কর্মকান্ডের সিংহভাগ ব্যয় নির্বাহ করা হয়।
তবে পৌরকর আটকে থাকা দপ্তরগুলোর কর্মকর্তাদের দাবি, মন্ত্রণালয়গুলো থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় এর অধীন সরকারি দপ্তরগুলো চসিকের এই বিশাল অঙ্কের কর পরিশোধ করতে যাচ্ছে না। বিষয়টি স্বীকার করেছেন
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীনও। তিনি বলেন, চসিক ও রেলওয়ে দুটোই সরকারি প্রতিষ্ঠান। মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ পেলে গৃহকর অবশ্যই পরিশোধ করা হবে।
এদিকে চসিকের সবেচেয়ে বড় অঙ্কের গৃহকর বকেয়ার তালিকায় ছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। যার পরিমাণ ছিল ১৯৮ কোটি ২৬ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ টাকা। যা ২৯ জুন সোমবার চেকের মাধ্যমে এই ট্যাক্স পরিশোধ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চেক গ্রহণ করর পর চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চসিকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একক কোনো খাত থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের নজির স্থাপিত হয়েছে। এটি শুধু একটি রাজস্ব আদায় নয়, বরং চট্টগ্রামবাসীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
মেয়র বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত মূল্যায়নের তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দর অত্যন্ত কম হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি তিনি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন এবং আইন অনুযায়ী ন্যায্য কর আদায়ের উদ্যোগ নেন।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন বন্দরের কাছ থেকে কোনো ধরনের কম্পেনসেশন চার্জ গ্রহণ করে না। অথচ বন্দরের ৪০ থেকে ৫০ টন ধারণক্ষমতার ভারী যানবাহন প্রতিনিয়ত চসিকের নির্মিত সড়ক ব্যবহার করছে। ফলে প্রতিবছর শুধু সড়ক সংস্কারেই অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। তাই বন্দরের কাছে কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়, বরং আইনি ভিত্তিতে নির্ধারিত ন্যায্য হোল্ডিং ট্যাক্সই দাবি করা হয়েছে।
ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপৃল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুরোধে উভয় প্রতিষ্ঠানের তিনজন করে মোট ছয়জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সমন্বয়ে যৌথ মূল্যায়ন (জয়েন্ট অ্যাসেসমেন্ট) পরিচালিত হয়। এতে প্রায় এক কোটি ৯৭ লাখ বর্গফুট স্থাপনার মূল্যায়ন স¤পন্ন হয়। যৌথ মূল্যায়নে উভয় পক্ষের কর্মকর্তারা স্বাক্ষর করায় এটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
তিনি বলেন, বন্দরের পক্ষ থেকে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করা হলেও সিটি করপোরেশন আইনের বিধান অনুযায়ী আপিল গ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে নির্ধারিত করের ৭৫ শতাংশ জমা দিতে হয়। সেই বিধান অনুসারেই ১৯৮ কোটি ২৬ লাখ টাকার চেক সিটি কর্পোরেশনকে প্রদান করা হয়েছে। বাকি ২৫ শতাংশ অর্থও আইনগত প্রক্রিয়া শেষে সিটি কর্পোরেশন পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মেয়র জানান, চট্টগ্রাম বন্দর ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাছে চসিকের মোট প্রায় ১৯৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকার হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে পূর্ববর্তী বছরের বকেয়া প্রায় ১৫৪ কোটি ৬৮ লাখ এবং চলতি অর্থবছরের দাবি প্রায় ৪২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে ইতোমধ্যে ডিও লেটার পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুত বকেয়া পরিশোধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের জাতীয় বাজেট ঘোষণার আগেই আমরা এই চিঠিগুলো পাঠিয়েছি, যাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো তাদের বার্ষিক বাজেটে চসিকের এই পৌরকর পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখতে পারে। যেভাবে আমরা চট্টগ্রাম বন্দরের পেছনে লেগে থেকে ন্যায্য পাওনা আদায় করেছি। একইভাবে এই ২৫টি মন্ত্রণালয়ের বকেয়া টাকা আদায়েও আমি শতভাগ চেষ্টা চালিয়ে যাব।
চসিকের রাজস্ব শাখার মতে, হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া থাকায় আর্থিক সংকটে পড়ে সিটি করপোরেশন তার নাগরিকসেবা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও স্বাভাবিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করতে পারছে না। এতে মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে চট্টগ্রাম নগরবাসী।
এ বিষয়ে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে সরকার শুধু নেয়, দেয় না তেমন কিছুই। হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ না করা তারই প্রম্যাণ বহন করে।
তিনি বলেন, দেশের অন্য সিটি করপোরেশনেও হয়তো সরকারের ট্যাক্স আটকে আছে। এতে বুঝা যায়, সরকার শুধু খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের পকেট কাটার জন্যই ট্যাক্স আরোপ করেছে। খোদ সরকারই ট্যাক্স পরিশোধ করে না। যা অত্যন্ত দূ:খজনক।