আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালন ব্যয় এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা উন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হবে ঋণের সুদ পরিশোধে, যা সামগ্রিক আর্থিক চাপ আরও বাড়াবে।
এমন ভোগের বাজেট দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগ প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি।
তিনি বলেন, এ বাজেট হবে ভোগের, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ‘উচ্চভিলাষী’ এবং কাঠামোগতভাবে অনেকাংশে ‘গতানুগতিক’। কেননা বাজেটের আকার, উন্নয়ন ব্যয়, পরিচালন ব্যয় এবং রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ ও পাস করার কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। এবার প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করতে পারে। বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের জন্য ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় যা প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি। বিপরীতে আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা।
অর্থাৎ উন্নয়ন খাতের তুলনায় পরিচালন ব্যয়ই বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। এই বড় ব্যয় মেটাতে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
আসন্ন বাজেটে যে ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা পরিচালন ব্যয় ধরা হচ্ছে, তা মূলত ব্যয় করা হবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা পরিশোধে। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের পেনশন ও গ্র্যাচুইটির টাকা এই পরিচালন ব্যয় থেকেই পরিশোধ করা হয়।
অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি ও প্রণোদনা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, কৃষি (সার, বীজ) এবং রফতানি ও রেমিট্যান্স খাতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি ও নগদ প্রণোদনা দিতে হয়। সরকারি দপ্তরগুলোর জন্য গাড়ি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি খরচ, স্টেশনারি, অফিসের বিদ্যুৎ ও পানির বিল, আপ্যায়ন এবং প্রচার-প্রচারণা বাবদ খরচ, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বিশেষ করে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং দুস্থদের মাঝে ভিজিডি-ভিজিএফের চাল বিতরণসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির নগদ অর্থায়ন করা হয়।
এছাড়াও দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্থায়ী সম্পদ সৃষ্টি এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য যে দীর্ঘমেয়াদি খরচ করা হয়, তাকে উন্নয়ন ব্যয় বলে। বাংলাদেশে এটি মূলত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি নামে পরিচিত। এতে যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন করা হয়। এসব উন্নয়নের ফলে সরকারি-বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ে। বেসরকারি খাতে শিল্পায়ন হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিচালন ব্যয়ের ধারাবাহিক উল্লম্ফনের কারণে উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে অবকাঠামো নির্মাণ, সরকারি বিনিয়োগ এবং উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় সংকুচিত হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তাদের ভাষ্য, একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তারা মনে করছেন, সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ সাধন নীতি কার্যকর না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর, বিলাসবহুল গাড়ি কেনা এবং অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কার এবং এডিপি বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশ বর্তমানে নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেই রয়েছে। স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলপত্র থাকলে নীতি স্পষ্ট হতো, কিন্তু এমন উদ্যোগ নেই। অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও অতিরিক্ত উন্নয়ন ব্যয়ের পরিকল্পনা অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলতে পারে। দেশ বর্তমানে নানা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে।
অথচ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার তিন-চার মাস পার হলেও অর্থনীতিকে কী অবস্থায় পেয়েছে, তার কোনো প্রামাণ্য মূল্যায়ন প্রকাশ করেনি। সরকার ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার্স কার্ড বা খাল খননের মতো কর্মসূচি নিয়ে বেশি আলোচনা করলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার কমানো, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা কিংবা কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়গুলো মনোযোগে আসছে না
তিনি আরও বলেন, সরকার চাইলে স্বল্পমেয়াদি একটি অর্থনৈতিক কৌশলপত্র দিতে পারত, যাতে নীতির ধারাবাহিকতা ও সংকট উত্তরণে করণীয় স্পষ্ট হতো। কিন্তু সে ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এডিপির ৪০-৫০ শতাংশই বাস্তবায়ন করা যায়নি। তাকে আরও ২০ শতাংশ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। দিয়ে বাস্তবায়নের কথা বলছেন। সেখানে যে দেড় হাজার প্রকল্প আছে তার থেকে আপনি নোংরা পরিস্কার করলেন না। এটার মাধ্যমে আপনি পুরোনো পরিস্থিতিকেই আবার নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন। আয়ের জন্য যে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে রাজস্ব বোর্ডকে তা পরিপালন করার সুযোগই তার নেই। সরকারের উচিত ছিল স্থিতিশীলতা কর্মসূচির মধ্যে থেকে যতটুকু আয় হবে, সেই সীমার মধ্যেই ব্যয় নির্ধারণ করা।
অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজ এর নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির এক কঠিন রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে। ২০২৫ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশে নেমে আসা এবং যুব বেকারত্বের হার ১১.৫ শতাংশে পৌঁছানো দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এছাড়া বাজেটের পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধির অনুপাতে রাজস্ব আয় বাড়াতে না পারলে সরকারকে ক্রমাগত ঋণের পরিমান বাড়াতে হবে। যেটি অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী সংকট তৈরি করতে পারে।
উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত আয় হয়েছে মাত্র ৫৭.২৩ শতাংশ। আসন্ন বাজেটের লক্ষ্যপূরণে রাজস্ব আদায়ের দিকে ঝুকতে পারে সরকার। এতে সামগ্রিক আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।