চট্টগ্রামে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আঁকা গ্রাফিতি লঙ্কাকান্ড ঘটনা ঘটেছে। নগরীর লালখান বাজার এলাকায় এ নিয়ে উত্তেজনার পর মুছে ফেলা গ্রাফিতি পুনরায় আঁকতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়েছে অঙ্ককারীদের।
এ সময় গ্রাফিতি আকাঁর রঙ ছিটকে পড়ে রঙিন হয়ে উঠে গ্রাফিতি অঙ্কণকারী তরুণ-তরুণী ও পুলিশ সদস্যরাও। পুলিশ এ সময় তিনজনকে আটক করলেও পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন।
সোমবার (১৮ মে) বেলা পৌনে দুইটার দিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর টাইগারপাস এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এর আগে গ্রাফিতি মুছে ফেলা নিয়ে রোববার সন্ধ্যায় টাইহারপাস থেকে লালখান বাজার এলাকায় জুলাই গ্রাফিতি অঙ্কন কর্মসূচি পালন করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগর শাখার নেতা-কর্মীরা।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) পক্ষ থেকে এসব গ্রাফিতি মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দাবি করে মেয়র ও নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন তাঁরা। এনসিপির নেতা-কর্মীরা চসিক কার্যালয়ের প্রবেশমুখের সামনে অবস্থান নিলে বিএনপির নেতা-কর্মীরাও পাল্টা অবস্থান নেন।
এরপর উত্তেজনা দেখা দিলে পুলিশ এসে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেয়। রাতের ঘটনার পর সোমবার সকালে নগরীর জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত সড়ক এবং এর আশপাশের এলাকায় সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলীর সই করা গণবিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়। সিএমপির এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই সোমবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে টাইগারপাসে শহীদ ওয়াসিম আকরাম এক্সপ্রেসওয়ের পিলারে গ্রাফিতি আঁকার জন্য জড়ো হন একদল তরুণ-তরুণী।
তাঁরা নিজেদের সাধারণ শিক্ষার্থী ও জুলাইযোদ্ধা পরিচয় দেন। তাঁরা গ্রাফিতি আঁকার চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। একপর্যায়ে রঙের কৌটা নিয়েও উভয় পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়েছে। এ সময় পুলিশ সদস্য ও গ্রাফিতি আঁকতে যাওয়া তরুণ-তরুণীদের গায়ে রং ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ তিনজনকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে আসা বাকি তরুণ-তরুণীরা পুলিশকে বাধা দেন। একপর্যায়ে আটকের প্রতিবাদে সড়কের ওপর বসে থাকতে দেখা যায় কয়েকজনকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করা হয়েছিল, তবে পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাস্থলে থাকা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক মীর মোহাম্মদ সেলিম বলেন, একদল তরুণ-তরুণী গ্রাফিতি অঙ্কন করতে এসেছিলেন। এ সময় তাঁদের সঙ্গে সামান্য ধস্তাধস্তি হয়েছে। এ সময় পুলিশ সদস্যদের ওপর রং ছোড়েন তাঁরা। সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয়ে গ্রাফিতি আঁকার চেষ্টা করা তরুণ-তরুণীরা এনসিপির রাজনীতিতে যুক্ত।
জানতে চাইলে নগর এনসিপির সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, টাইগারপাসে এনসিপির কোনো কর্মসূচি ছিল না। জুলাই আন্দোলনের পক্ষে থাকা শিক্ষার্থীরা গ্রাফিতি আঁকতে গিয়েছিলেন। পুলিশ তাঁদের বাধা দিয়েছে। রঙের কৌটা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে টানাটানির সময় দুই পক্ষের গায়ে রং পড়েছে। ইচ্ছা করে কেউ রং ছুড়ে মারেনি।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত এনসিপির নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এখন আবার নতুন করে স্বৈরাচারী আচরণের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। আমরা এটা কোনোভাবেই মেনে নেবো না।
তাদের দাবি, গ্রাফিতিগুলো কেবল দেয়ালচিত্র নয়; বরং আন্দোলনের স্মৃতি, তরুণদের প্রতিবাদ এবং আত্নত্যাগের প্রতীক। তাই এসব গ্রাফিতি আঁকতে বাধা দেওয়া বা অপসারণের চেষ্টা সাধারণ মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করছে।
গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগ ডাহা মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেছেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি মহল ঘোলা পানিতে মাছ শিকারর চেষ্টা করছে।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলার জন্য তিনি কখনো কোনো নির্দেশ দেননি এবং ভবিষ্যতেও দেবেন না। তিনি জানান, নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট সময় পর পর বিভিন্ন পিলার ও দেয়াল থেকে পোস্টার-ব্যানার অপসারণ ও রং করার কাজ করে থাকে। টাইগারপাসসহ যেসব স্থানে রং করা হয়েছে, সেখানে মূলত পোস্টার দিয়ে ঢাকা ছিল এবং দৃশ্যমান কোনো গ্রাফিতি ছিল না।
তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের চেতনার বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি নিজে দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে আন্দোলন করেছি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামে প্রথম শহিদ ওয়াসিম আকরাম আমারই অনুসারী ছিল। মেয়র বলেন, কেউ গ্রাফিতি করতে চাইলে আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে শৈল্পিক ও মানসম্মত গ্রাফিতি আঁকতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কিংবা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে অর্থায়নের আশ্বাসও দেন। তিনি বলেন, অপরিচ্ছন্ন হাতের লেখার চেয়ে পরিকল্পিত ও শৈল্পিক গ্রাফিতি শহরের সৌন্দর্য ও ভাবমূর্তি রক্ষা করবে।
আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা সহায়তার প্রসঙ্গ তুলে ধরে ডা. শাহাদাত বলেন, ৪ আগস্ট যখন অনেক হাসপাতাল আহতদের নিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল, তখন তিনি নিজ উদ্যোগে ট্রিটমেন্ট ও হলি হেলথ হাসপাতালে আহতদের ভর্তি করান। এ ছাড়া ৬ আগস্ট চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আহতদের ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। শহিদ পরিবারগুলোকেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহযোগিতা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।