চলতি সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য যেখানে লাল গালিচা সংবর্ধনার আয়োজন করবেন, তার থেকে মাত্র কয়েকশ মাইল দূরে একটি রহস্যময় কর্মযজ্ঞ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অর্থনীতিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার জোগান দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে তেহরানকে সচল রাখতে এ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এই চীন।
স্থানটি মূলত চীনের শানডং প্রদেশ এবং এর সীমান্তবর্তী অঞ্চল। এখানকার বন্দর, পাইপলাইন এবং তেল শোধনাগারগুলোর বিশাল সব তেলের ট্যাঙ্ক আর ধোঁয়া নির্গত হওয়া চিমনিগুলো উপকূলীয় মরুভূমির ধূসর প্রান্তরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে রয়েছে তথাকথিত ‘টিপট রিফাইনারি’ বা ছোট ছোট স্বতন্ত্র তেল কোম্পানি, যারা বেইজিংয়ের অনুমতি নিয়ে পরিচালিত হয়।
এই শোধনাগারগুলোই নীরবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ইরানের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করে গ্যাস, ডিজেল ও পেট্রোকেমিক্যালে রূপান্তর করছে, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে। তেহরানের আর্থিক পথ বন্ধ করে দিয়ে তাদের নতি স্বীকারে বাধ্য করতে চাইছে ওয়াশিংটন। আর এ কারণে চীনের সঙ্গে ইরানের এই গোপন বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়টি এখন পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে ট্রাম্প ও শির আলোচনার টেবিলে জায়গা করে নিয়েছে।
এই বাণিজ্য নিয়ে উত্তেজনাও দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। বেইজিং একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের স্থিতিশীলতা চায়, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কও বজায় রাখতে আগ্রহী। ট্রাম্পের চীন সফরের ঠিক আগের দিন মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় চীনে ‘ইরানি তেল বিক্রি ও পরিবহনে’ ভূমিকা রাখার দায়ে ১২ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ওয়াশিংটন যখন নতুন একটি শোধনাগারকে কালো তালিকাভুক্ত করে, তখন বেইজিং তার সংস্থাগুলোকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে কয়েক হাজার মাইল দূরে আরব সাগরে মার্কিন নৌবাহিনী সেই সব ছদ্মনামী জাহাজগুলোকে ধাওয়া করছে, যারা ইরান থেকে তেল নিয়ে পূর্ব চীনের শোধনাগারগুলোতে পৌঁছে দেয়।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, চীন তেল কেনার মাধ্যমে ইরানের ‘সন্ত্রাসী’ নেটওয়ার্কগুলোকে অর্থায়ন করতে সাহায্য করছে। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে শানডং ও হেবেই প্রদেশের সীমান্তের উত্তরে তেল শোধনাগার ঘেরা একটি জনশূন্য রাস্তায় ঘুরতে গিয়ে মনে হলো, বিশ্বব্যাপী আলোচনার সেই আলো এখন এই দুর্গম এলাকাটির ওপর ভালোভাবেই এসে পড়েছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত শোধনাগারে একদিন
এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কালো তালিকাভুক্ত হওয়া হেবেই সিনহাই কেমিক্যাল গ্রুপের শোধনাগারটির চারপাশে কড়া নিরাপত্তা। শিল্পোন্নত বন্দর এলাকায় বেশ কয়েকটি ব্লক জুড়ে বিস্তৃত এই শোধনাগারের প্রবেশপথে মুখোশধারী নিরাপত্তারক্ষীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
একটি সড়ক দিয়ে সিএনএনের কর্মীরা যাওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানের লোগোসম্বলিত একটি গাড়িসহ বেশ কয়েকটি গাড়ি তাদের পিছু নেয়। এমনকি গাড়ির জানালা দিয়েও যাতে কোনো ছবি বা ভিডিও ধারণ করা না যায়, সেজন্য তারা পথরোধ করার চেষ্টা করে। অথচ ওই এলাকার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সামনে এমন কড়াকড়ি দেখা যায়নি।
এই কোম্পানিটি মূলত গ্যাস, ডিজেল ও রাস্তা তৈরির বিটুমিন উৎপাদন করে। গত বছরের মে মাসে ওয়াশিংটন অভিযোগ করে, হেবেই সিনহাই ‘ইরানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট’ তেল ক্রয় করছে। এছাড়া কোম্পানিটি ছদ্মনামী জাহাজের মাধ্যমে ইরান থেকে কোটি কোটি ডলারের অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে বলেও দাবি করে যুক্তরাষ্ট্র।
এই কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান কালো তালিকার একটি অংশ মাত্র। গত বছর থেকে এখন পর্যন্ত চীনের আরও চারটি শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, যার বেশিরভাগই এই উপকূলীয় জ্বালানি কেন্দ্রে একে অপরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। শানডং প্রদেশের এই তেল শিল্প কয়েক দশক আগে ইয়োলো রিভার ডেল্টার শেংলি তেলক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এখন তারা বিদেশের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
চীনের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ জোগান দেয় এই শোধনাগারগুলো। আর বিশ্লেষকদের মতে, তাদের এই আমদানির বড় উৎস হলো বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত তেল।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির সিনিয়র রিসার্চ স্কলার এরিকা ডাউন্স বলেন, ‘এগুলো মূলত ছোট ছোট শোধনাগার, যারা খুব সামান্য লভ্যাংশে কাজ করে। ভেনেজুয়েলা, রাশিয়া ও ইরানের তেল অনেক সস্তায় পাওয়ায় তারা এতদিন টিকে থাকতে পেরেছে।’ তবে এই ছোট ছোট কোম্পানির তালিকায় বড় ব্যতিক্রম হলো ডালিয়ান শহরের হেংলি পেট্রোকেমিক্যাল।
গত মাসে এই বড় কোম্পানিটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা এখন বড় খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় হেংলিকে ‘ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে সরকারি সহায়তায় ডালিয়ানের বাইরে বিশাল অবকাঠামো গড়ে তোলা এই কোম্পানি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বেইজিং মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ মনে করে এবং তাদের কোম্পানিগুলোকে এসব নিষেধাজ্ঞা না মানার নির্দেশ দিয়েছে। সিএনএনের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এ ধরনের ‘অবৈধ একতরফা নিষেধাজ্ঞার’ কড়া বিরোধী। চীনের এই তেল শিল্পের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ছোট ও স্বতন্ত্র শোধনাগারগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারে। কারণ তাদের ব্যবসা মূলত দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ।
অন্যদিকে চীনের বড় বড় রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকায় তারা সাধারণত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে চলে। হেবেই সিনহাই-এর গেটে কড়া নিরাপত্তা আর রাস্তায় তেলের ট্যাঙ্কারের অবিরাম চলাচল দেখে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার, নিষেধাজ্ঞার এক বছর পার হলেও তাদের ব্যবসা থেমে নেই; বরং পুরোদমেই চলছে।