চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এখন থেকে আর শুধু দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত কনটেইনার টার্মিনালগুলোর একটি নয়, এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনার নতুন মডেলের পরীক্ষাগার।
১৫ বছরের জন্য এর পরিচালনা ও আধুনিকায়নের দায়িত্ব নিয়েছে দুবাই-ভিত্তিক গ্লোবাল অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড। বিনিময়ে শুরুতেই প্রায় ৬০০ কোটি টাকা দেবে প্রতিষ্ঠানটি, প্রথম ১০ বছরে বিনিয়োগ করবে এক হাজার কোটি টাকার বেশি। আর কনটেইনার হ্যান্ডলিং থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে রাজস্বের সর্বোচ্চ ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তি সইয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ আলোচিত প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক পর্দা নামল।
তবে এর মধ্য দিয়েই আরেকটি প্রশ্নের শুরু, বিদেশি অপারেটরের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ কি সত্যিই চট্টগ্রাম বন্দরের গতি বাড়াবে, নাকি এরই মধ্যে আয় করা চুক্তির আর্থিক কাঠামোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রায় ৬০০ কোটি টাকা (৫০ মিলিয়ন ডলার) অগ্রিম দেবে। এর ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ কার্যক্রম শুরুর আগে দেয়ার কথা। এর বাইরে প্রথম ১০ বছরে নতুন যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, ইয়ার্ড পুনর্বিন্যাস, ডিজিটাল ব্যবস্থা ও আধুনিকায়নে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের হিসাবে মোট নতুন বিনিয়োগের অঙ্ক প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার বা এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সরকারের দৃষ্টিতে এটি শুধু পরিচালনা হস্তান্তরের চুক্তি নয়; পুরনো অবকাঠামোর ওপর নতুন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বসিয়ে টার্মিনালের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ।
কিন্তু এখানেই আসে আসল হিসাব। চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় কনটেইনার স্থাপনা এনসিটি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডল করেছে। বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশই আসে এই টার্মিনাল থেকে। পাচটি জেটি এবং বন্দরের ১৮টি কুইসাইড গ্যান্ট ক্রেনের ১৪টি রয়েছে এনসিটিতে।
২০০৭ সালে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টার্মিনাল এখন দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। তাই এনসিটির দক্ষতা বাড়া মানে শুধু একটি টার্মিনালের আয় বাড়া নয়। জাহাজ দ্রুত ভেড়ানো, কনটেইনার দ্রুত ওঠানামা, পণ্য দ্রুত খালাস এবং আমদানি-রফতানির পণ্য নির্দিষ্ট সময়ে বাজারে পৌঁছানো- সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়বে।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংকও দক্ষিণ এশিয়ার বন্দরগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে বলেছে, বন্দরের অদক্ষতা শুধু জাহাজের অপেক্ষার সময় বাড়ায় না; এর প্রভাব পড়ে বাণিজ্য ব্যয়, বাজার হারানো এবং ব্যবসায়িক আস্থার ওপরও।
সংস্থাটির সুপারিশের মধ্যে রয়েছে সুশাসনের আওতায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ প্রতিযোগিতামূলক কনসেশন এবং 'ল্যান্ডলর্ড পোর্ট' মডেলের কার্যকর প্রয়োগ। সেই অর্থে এনসিটির নতুন ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বন্দর পরিচালনা চুক্তি নয়; এটি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সুপারিশ করা বন্দর সংস্কারের একটি বাস্তব প্রয়োগও বটে।
লাভের অঙ্ক বনাম দক্ষতার অঙ্ক
চুক্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য প্রতি টিইইউ কনটেইনারে ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব ভাগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গড় হ্যান্ডলিং আয় ১৪০ থেকে ১৫০ ডলার হলে বন্দরের অংশ প্রায় ৯৩ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এর সঙ্গে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার একটি নির্ধারিত ফিও পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চুক্তিতে বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের নিশ্চয়তাও রয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন টার্মিনাল চালু হলে এই লক্ষ্যমাত্রা ১০ লাখ টিইইউতে সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ, এনসিটির ওপর অন্য টার্মিনাল চালু হওয়ার পর সম্ভাব্য চাপ বা কনটেইনার প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টিও চুক্তিতে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
নৌ পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের ভাষ্য, চুক্তিতে বাংলাদেশের আর্থিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় একাধিক সুরক্ষা রাখা হয়েছে। তার দাবি, এটি বন্দর 'লিজ' দেয়া নয়; নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি টার্মিনাল পরিচালনা ও আধুনিকায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সরকার আশা করছে, আধুনিক যন্ত্রপাতি, অটোমেশন ও ডিজিটাল ব্যবস্থায় কনটেইনারের ডুয়েল টাইম এবং জাহাজের টার্নএরাউন্ড টাইম কমবে।
সরকারের হিসাবে অপারেশনাল দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানের প্রায় ৯৩ শতাংশে নেয়ার লক্ষ্য রয়েছে। কাগজপত্রের ব্যবহার কমিয়ে পণ্য, কনটেইনার ও জাহাজের গতিবিধি রিয়েল টাইমে অনুসরণের ব্যবস্থাও চালুর কথা বলা হয়েছে। কাস্টমস ও অন্যান্য সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে ডিজিটাল সংযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে পণ্য খালাসের দীর্ঘসূত্রতা কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে।
এখানে সাফল্যের মাপকাঠি হবে খুব বাস্তব, বন্দরে জাহাজ কতক্ষণ দাড়াল, কনটেইনার কত দ্রুত উঠল-নামল, আমদানিকারক কত দ্রুত পণ্য পেল এবং রফতানিকারকের পণ্য জাহাজ ধরতে কতটা কম অপেক্ষা করল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান এসা কাজিম বলেন, এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক বন্দর ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সংযোগ আরও সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন হবে বলে জানান তিনি।
এনসিটির সামনে শুধু ডিপি ওয়ার্ল্ড নয়
চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ অবশ্য শুধু এনসিটিকে ঘিরে নেই। বর্তমানে বন্দরে চারটি স্থাপনা কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে- এনসিটি, চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। এর মধ্যে এনসিটি একাই মোট কনটেইনারের প্রায় ৪৪ শতাংশ সামলায়।
সামনে আসছে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালও। নেদারল্যান্ডস-ভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসকে ৩০ বছরের কনসেশনে লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্ল্যান রয়েছে সেখানে এবং বছরে আট লাখের বেশি টিইইউ হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
অর্থাৎ, আগামী কয়েক বছরে চট্টগ্রাম বন্দরে একাধিক আন্তর্জাতিক অপারেটরের উপস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে একদিকে প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে; অন্যদিকে একাধিক কনসেশনের শর্ত, রাজস্ব কাঠামো, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি একই মানদণ্ডে রাখা না গেলে নতুন জটিলতাও তৈরি হতে পারে। এ কারণেই এনসিটি চুক্তির গুরুত্ব শুধু ১৫ বছরের হিসাবের মধ্যে আটকে নেই। এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বন্দর খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ও বেসরকারি পরিচালনার জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
আপত্তির জায়গাটিও কম নয়
চুক্তির আগে থেকেই এনসিটি নিয়ে বিরোধিতা ছিল। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন বিদেশি অপারেটরের কাছে টার্মিনালের পরিচালনা দেয়ার বিরোধিতা করেছে। ৫ অক্টোবর বন্দর প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে তারা। বন্দর অচল করে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়েছিল।
বিরোধিতার কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি প্রশ্ন, একটি লাভজনক ও কৌশলগত সম্পদের পরিচালনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেয়ার প্রয়োজন কতটা, ভবিষ্যতের আয় থেকে দেশ কতটা লাভবান হবে এবং শ্রমিকদের কর্ম সংস্থান ও অধিকার কিভাবে সুরক্ষিত থাকবে।
তবে এসব অভিযোগের বিপরীতে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট। সরকারের দাবি, মালিকানা ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের কাছেই থাকছে। বিদ্যমান কর্মীদের চাকরি, বেতন ও সুযোগ-সুবিধা সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাও চুক্তিতে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে বিতর্কটি শেষ পর্যন্ত 'বিদেশি না দেশি' এই সরল বিভাজনে আটকে থাকলে আসল প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যাবে। আসল প্রশ্ন হচ্ছে, চুক্তির শর্তে বাংলাদেশ কি পেল, ভবিষ্যতে কতটা পাবে এবং সেই সুবিধার বিনিময়ে কি ছাড় দিল।
চুক্তির পরীক্ষা হবে বন্দরের জেটিতে
এনসিটি পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর আনার উদ্যোগটি অবশ্য এক দিনের সিদ্ধান্ত নয়। প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। ২০২৩ সালের মার্চে পিপিপি কাঠামোয় আন্তর্জাতিক বেসরকারি অপারেটর নিয়োগের নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। পরে প্রক্রিয়াটি এগোলেও শ্রমিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিরোধিতায় কয়েক দফা গতি হারায়। শেষ পর্যন্ত নতুন সরকার আলোচনা পুনরায় শুরু করে এবং ৮ অক্টোবর চুক্তি সই হলো। এখন ডিপি ওয়ার্ল্ড ছয় মাসের মধ্যে কাজ শুরু করার কথা জানিয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমে যেতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এটি তাই একটি নতুন অধ্যায়। কিন্তু অধ্যায়ের সাফল্য নির্ধারিত হবে চুক্তির অনুষ্ঠানে নয়, জেটিতে। কনটেইনারের সারি ছোট হয় কি না, জাহাজ কম সময় দাড়িয়ে থাকে কি না, আমদানিকারকের পণ্য দ্রুত হাতে আসে কি না, রফতানিকারকের পণ্য নির্ধারিত সময়ে জাহাজে ওঠে কি না- এসবই হবে নতুন ব্যবস্থার আসল রিপোর্ট কার্ড। কারণ বন্দরের দক্ষতা শেষ পর্যন্ত কোনো কাগজের অঙ্ক নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি কারখানার উৎপাদন, একজন রফতানিকারকের সময়, একজন আমদানিকারকের খরচ এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এনসিটির ১৫ বছরের দায়িত্ব তাই নিছক ব্যবস্থাপনা বদল নয়; এটি বাংলাদেশের বন্দর অর্থনীতির সামনে রাখা এক বড় পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সাফল্য মানে শুধু বেশি কনটেইনার নয়, কম অপেক্ষা, কম অনিশ্চয়তা, কম বাণিজ্য ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যবসার জন্য একটু বেশি গতি।
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক লজিস্টিক সংযোগের মাধ্যমে এনসিটির সক্ষমতা বাড়ানো সরকারের লক্ষ্য। বিভিন্ন টার্মিনালে আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করে সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।