দেশে নকল ও অবৈধ সিগারেট কারণে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। পাড়া-মহল্লা, গ্রামগঞ্জ, হাটবাজার-সবখানেই বিদেশি, নকল, নিম্নমানের ভ্যাট ফাঁকি দেয়া অবৈধ সিগারেট ছড়িয়ে পড়েছে।
এর মধ্যে উচ্চ স্তরের নকল ও বিদেশি সিগারেটের উপস্থিতি বেশি। বিভিন্ন জরিপে অবৈধ সিগারেটের পরিমাণ ১৮-২০ বিলিয়ন শলাকা বলা হলেও সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।
গত ছয় মাসে অবৈধ সিগারেটের বাজার প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। ফলে নিয়মিত ভ্যাট প্রদানকারী দেশীয় বৈধ উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) প্রাক-বাজেট আলোচনায় অবৈধ সিগারেটের ভয়াবহ বিস্তার নিয়ে অভিযোগ করেছে দেশের বড় উৎপাদক প্রতিষ্ঠান বিএটিবি, জেটিআই ও আবুল খায়ের টোবাকোর প্রতিনিধিরা।
তাদের বক্তব্য, অবৈধ সিগারেটের বাজার দখল রোধ করা না গেলে সিগারেট খাতে বৈধ ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে দক্ষিণ আফৃকা, পাকিস্তান, ব্রাজিল, মালয়শিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বাংলাদেশের সিগারেট খাতও এক সময় চোরাকারবারি ও অবৈধ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।
অবৈধ সিগারেট ঠেকানোর দাবি
বৈধ কারখানা মালিকদের দাবি, ইলিসিট বা অবৈধ সিগারেট ঠেকাতে এনবিআরকে আরো কঠোর ও ধারাবাহিক হতে হবে। যথাযথ নীতিমালা তৈরি করতে হবে। কারণ অবৈধ সিগারেটের বিস্তার শুধু বৈধ উৎপাদকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
তাদের মতে, বাজারে অবৈধ সিগারেটের সরবরাহ বন্ধ করা গেলে বৈধ সিগারেটের বিক্রি বাড়ে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। গত বছর এ ধরনের কঠোর নজরদারি ও অভিযান চালিয়ে বাস্তব প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রয়োজন এনবিআরের কঠোর পদক্ষেপ
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে ভ্যাট কর্মকর্তাদের কড়া নজরদারি, তল্লাশি, ধরপাকড় এবং লাগাতার অভিযানের কারণে অবৈধ সিগারেট কেনাবেচা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় সরকারের রাজস্ব আদায়ে ব্যাপক উন্নতি দেখা যায়।
একই সঙ্গে দেশীয় বৈধ সিগারেট কারখানাগুলোও রেকর্ড ব্যবসা করে। জুলাই ২০২৫ মাসে বিএটিবির প্রদেয় রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭০১ শতাংশ। একই সময় জেটিআই প্রায় ২০০ শতাংশ এবং আবুল খায়ের টোবাকো প্রায় ১০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে।
মূলত দুই মাস ধরে সারা দেশে লাগাতার প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার তল্লাশি ও অভিযান পরিচালনার ফলে এই সাফল্য আসে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তৎকালীন মেম্বার, ভ্যাট বাস্তবায়ন ও আইটি, বেলাল হোসাইন চৌধুরী অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। জুলাই মাসকে এনবিআর ভ্যাট আদায়ের এনফোর্সমেন্ট মাস ঘোষণা করে।
সিগারেটের অবৈধ সিন্ডিকেট ও ভ্যাট ফাকির মহোৎসব রুখতে সারা দেশের মাঠ পর্যায়ের ১২টি ভ্যাট কমিশনারেটের প্রায় আড়াই হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারি দিন-রাত অভিযান পরিচালনা করে। এই সময় মোট ১৩ হাজার ৪০৯টি অভিযান চালানো হয়। অবৈধ সিগারেট বাজারে প্রবেশ করতে না পারায় বৈধ সিগারেটের বিক্রি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে এনবিআর সিগারেট খাত থেকে রেকর্ড ১৫ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় হয়। গত বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় এটি পাচ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা বা ৬১.৮১ শতাংশ বেশি।
বিশেষ অফারের ফাঁদে দোকানদাররা
বাজার দখলে রাখতে সিগারেট মাফিয়া চক্র খুচরা বিক্রেতা ও দোকানদারদের জন্য বিশেষ 'অফার'-এর ফাঁদ পেতেছে। মাঠ পর্যায়ের জরিপে দেখা গেছে, অতিরিক্ত কমিশন, ফৃ পণ্য, বিশেষ ছাড় ও নগদ ইনসেনটিভ দিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
ফলে বৈধ পণ্যের তুলনায় অবৈধ পণ্য বাজারে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। জরিপে আরো দেখা গেছে, প্রায় ৮২ শতাংশ দোকানদার এই অবৈধ পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাচ্ছে।
দোকানদারদের ভাষ্য, মূলত তিনটি উপায়ে এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। দেশের ভেতরের অবৈধ কারখানায় জাল বা পুরনো ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল দিয়ে তৈরি সিগারেট। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিমানবন্দর ও সীমান্ত দিয়ে আনা নামি ব্র্যান্ডের সিগারেট।
বাজারে প্রচলিত জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর প্যাকেট হুবহু নকল করে নিম্নমানের তামাক দিয়ে তৈরি করা সিগারেট। এই কারসাজির সাথে জড়িত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র আবদুস সবুর লিটন সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণকর্তা হিসেবে পরিচিত চসিকের সাবেক মেয়র, প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর বড় ছেলে ও ফ্যাসিষ্ট সরকারের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।
বিদেশ থেকে অবৈধ সিগারেট আমদানির সাথে জড়িত থাকার দায়ে এই সিন্ডিকেটের অনেকের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম কাস্টমস মামলা দায়ের করলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে সাবেক প্যানেল মেয়র আবদুস সবুর লিটন ও শিক্ষামন্ত্রী নওফেল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিষ্ট সরকারের পতনের পর উভয়েই পলাতক থাকার কারণে তাদের কারও বক্তব্য বা মতামত নেওয়া সম্ভব হয়নি।
হেনস্তার শিকার সৎ কর্মকর্তারা
অবৈধ তামাক ও সিগারেট সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে অতীতে অনেক সৎ কর্মকর্তা হেনস্তার শিকার হয়েছেন।
এমনকি তৎকালীন সদস্য, ভ্যাট বাস্তবায়ন, বেলাল হোসাইন চৌধুরীকে ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর ২০২৫ বদলি করা হয়। একই তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশন তার বিরুদ্ধে তিন বছর ধরে অনুসন্ধানাধীন একটি বেনামি অভিযোগের ভিত্তিতে আকস্মিক মামলা দায়ের করে।
এ বিষয়ে এনবিআরের কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, মামলাটি ইচ্ছাকৃত তথ্য বিকৃতির ভিত্তিতে দায়ের করা হয়েছে। পরে ৯ অক্টোবর তাকে ওএসডি করা হয়। তিনি অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে দুই মাসে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার অভিযানে নেতৃত্ব দেন।
ওই অর্থ বছরের প্রথম চার মাসে শুধু সিগারেট খাত থেকেই ছয় হাজার ১৫২ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়। এ ঘটনার পর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাহস ও মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এর পর আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় অভিযান। ফলে ‘অবৈধ সিগারেট সিন্ডিকেট’ দ্বিগুণ গতিতে বাজারে ফিরে। এ কারণে চলতি বছরের মে মাসে ভ্যাট আদায় কমেছে ১ হাজার ৫২১ কোটি টাকা, গত বছরের একই মাসের তুলনায়।
প্রথম চার মাসের বিশাল প্রবৃদ্ধির পর পরবর্তী মাসগুলোতে ভ্যাট আদায়ের গতি মন্থর হয়ে ৪২২ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়। চলতি অর্থবছরের মে পর্যন্ত ১১ মাসে আদায় হয়েছে ৪০ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৭ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা।
রাজস্ব সুরক্ষা ও অবৈধ সিগারেট নিয়ন্ত্রণে করণীয়
তামাক খাতের অবৈধ সিন্ডিকেটগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত। তারা আধুনিক প্রযুক্তি, ভুয়া নথি ও জাল ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে দ্রুত কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফলে শুধু এনবিআরের ম্যানুয়াল পদ্ধতি দিয়ে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
এ খাত নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের মতে, ম্যানুয়াল পদ্ধতি দিয়ে এই আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সিন্ডিকেট দমন সম্ভব নয়। অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সাতটি আধুনিক সংস্কার প্রস্তাব করেছেন তারা।
এর মধ্যে রয়েছে, উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণ করা। প্রতিটি সিগারেট প্যাকেটে বাধ্যতামূলক কিউআর কোড সংযোজন। ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জাল ব্যান্ডরোল শনাক্তকরণ।
এনবিআর, কাস্টমস ও পুলিশের সমন্বয়ে সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন। এআই ভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালু করা। নিম্ন আয়ের ধূমপায়ীরা যাতে সস্তা অবৈধ সিগারেটের দিকে না ঝুঁকে, সেজন্য কর কাঠামোর যৌক্তিক সংস্কার। অভিযানে অংশ নেওয়া সৎ কর্মকর্তাদের আইনি ও প্রশাসনিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা।
অর্থনীতিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবৈধ সিগারেট শুধু বিপুল রাজস্ব ক্ষতির কারণ নয়, বরং মাননিয়ন্ত্রণহীন ও ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত উপাদান ব্যবহার করায় জনস্বাস্থ্যের জন্যও এক চরম হুমকিও বটে।